মো. রিদওয়ান আল হাসান
মানবসভ্যতার সবচেয়ে সুরক্ষিত এবং প্রশ্নাতীত প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘পরিবার’। শৈশব থেকে আমাদের সামাজিক অবচেতনে এই বিশ্বাসটি পাথর খোদাইয়ের মতো গেঁথে দেওয়া হয় যে, “রক্তের সম্পর্ক চিরপবিত্র, পরিবার পরম ভালোবাসার একমাত্র নিরাপদ দুর্গ এবং সমাজের স্বীকৃতি ছাড়া একজন মানুষের অস্তিত্ব নিছক অর্থহীন।“ কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে, আমাদের মতো সমাজে এই তথাকথিত পবিত্রতার আড়ালেই রচিত হয় সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং নৃশংস মনস্তাত্ত্বিক বন্দিশালা। ড্রয়িংরুমের পরিপাটি সোফায় বসে ‘অন্যের ভালো-মন্দ’ কিংবা সোজা ভাষায় গীবতের চরম পুলকিত হাস্যরসের আড়ালে আমাদের পরিবার কাঠামো তৈরি করছে নীরব দীর্ঘশ্বাস, অবদমন, অবিরত অবমূল্যায়ন এবং আত্মহননের ক্রমশ অন্ধকার পথ। পরিবার ও সমাজকে কোনো সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা স্বতঃসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান ভাবার এই মারাত্মক ভ্রান্তি ভাঙতে হলে আমাদের সমাজতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব এবং মনস্তত্ত্বের এক দীর্ঘ ও আপসহীন ব্যবচ্ছেদ প্রয়োজন।
সন্তানের ওপর মালিকানাবোধ বনাম স্বকীয় সত্তা
আমাদের সমাজ পরিবারকে কাঠামো এক ধরনের সামন্ততান্ত্রিক মালিকানা প্রতিষ্ঠান। সন্তানকে অভিভাবকেরা ভাবেন নিজেদের অপূর্ণ আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের জীবন্ত হাতিয়ার, একটা কয়েন কিংবা কার্ড, যা দিয়ে সমাজে নিজেদের মর্যাদা প্রদর্শন করা যাবে।
খলিল জিবরান তাঁর The Prophet- এ সন্তানের ওপর এই অন্ধ কর্তৃত্বের মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন:
“তোমাদের সন্তান তোমাদের সন্তান নয়। তারা জীবনের নিজের প্রতি তীব্র আকুলতারই ফসল। তারা তোমাদের মাধ্যমে এসেছে বটে, কিন্তু তোমাদের থেকে নয়; এবং যদিও তারা তোমাদের সাথেই থাকে, তবুও তারা তোমাদের সম্পত্তি নয়। তোমরা তাদের ভালোবাসা দিতে পারো, কিন্তু তোমাদের চিন্তা চাপিয়ে দিতে পারো না; কারণ তাদের নিজস্ব চিন্তা রয়েছে। তাদের শরীরকে তোমরা ঘরে রাখতে পারো, কিন্তু তাদের আত্মাকে নয়; কেননা তাদের আত্মা বাস করে আগামীর সেই প্রাসাদে, যেখানে পৌঁছানোর ক্ষমতা তোমাদের স্বপ্নেও নেই।”
মাওলানা জালালুদ্দীন রুমি মানুষকে আহ্বান জানিয়েছিলেন তার ভেতরের অসীম ঐশ্বরিক সম্ভাবনার ডানা মেলতে। রুমি আক্ষেপ করে বলেছিলেন:
“তোমার জন্ম হয়েছে ডানার শক্তি নিয়ে, তবে কেন তুমি সারাজীবন মাটির বুকে হামাগুড়ি দিয়ে মরবে?”
অথচ আমাদের পরিবারগুলো সেই ডানা কেটে দিয়ে সন্তানকে বাধ্য করে সমাজের মেকি মানদণ্ডে হামাগুড়ি দিতে। একজন স্বতন্ত্র মানুষের অনন্য মেধা ও রুচিকে অস্বীকার করে তাকে অন্যের মতো হতে বাধ্য করার এই অপচেষ্টা মূলত এক ধরনের অস্তিত্ববাদী হত্যা।
ঘরোয়া কাঠগড়া ও বিষাক্ত তুলনা: সামাজিক ফ্যাসিজমের প্রজননক্ষেত্র
আমাদের পরিবার ও সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যাধি হলো এই অবিরত ‘অসম তুলনা এবং প্রতিযোগিতা’। জন্মের পর থেকেই শিশুর আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতার এক বিষাক্ত রসায়নে: “অমুকের ছেলে বিসিএস ক্যাডার হয়ে গেল, তমুকের মেয়ে অমুক মেডিকেলে পড়ল, আর তুই কী করলি? অমুকের মেয়ে কত সুন্দর পর্দা করে, অমুকের ছেলে কত কোটি টাকা আয় করে!”
ব্যক্তিকে তার অভ্যন্তরীণ শুচিবোধ, নান্দনিকতা, মানবিক গুণ, সততা বা শিল্পের তৃষ্ণা দিয়ে মাপা হয় না। মাপা হয় কেবল বাহ্যিক সামাজিক প্রদর্শন দিয়ে। এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক রেসিজম ও ফ্যাসিজম। ফ্যাসিবাদের মূল নীতি যেমন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য মুছে ফেলে সবাইকে একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় ছাঁচে বন্দি করা, আমাদের সমাজও ঠিক তাই করে। শুধু নিজেদের সদস্যদের সাথে করে তা নয়, এক পরিবার অন্য পরিবারকে আক্রান্ত করে, এভাবে ব্যাধি এবং হতাশা যুগপৎ ছড়িয়ে যায়। অনেক ‘শান্ত’ অভিভাবকও ‘অশান্ত’ হয়ে যান।
সমাজবিজ্ঞানী চার্লস হর্টন কুলির Looking-Glass Self তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ নিজেকে যেভাবে দেখে, তা মূলত তার চারপাশের মানুষের প্রতিক্রিয়ারই প্রতিফলন। পরিবার যখন আয়না হিসেবে শিশুর দিকে কেবল ব্যর্থতা, তিরস্কার আর অপূর্ণতার ছবি তুলে ধরে, তখন সেই শিশুর নিজস্ব সত্তা ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়।
মনোবিজ্ঞানী এলিস মিলার তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Drama of the Gifted Child-এ দেখিয়েছেন—পিতা-মাতা যখন শর্তহীন স্নেহের বদলে ‘সাফল্যের বিনিময়ে ভালোবাসা’ বিতরণ করেন, তখন সন্তানের ভেতরের মৌলিক সত্য সত্তা (True Self) আতঙ্কে লুকিয়ে পড়ে এবং সে কেবল মা-বাবাকে খুশি করার জন্য একটি মুখোশ পরা মিথ্যা সত্তা (False Self) ধারণ করে। এই কৃত্রিম সত্তার ভার বইতে না পেরে একসময় মানুষের ভেতরে চরম একাকীত্ব, বিষাদ এবং আত্মবিদ্বেষ জন্ম নেয়। আর, অর্থনীতির ভাষায়, “Everything in life is a trade-off’’, পরিবার যে আমাদের ভরণ পোষণ করে, দায়িত্ব পালন করে, তা তাদের ইউটিলিটির কারণেই। এখানে রেসিপ্রোকাল একটা ব্যাপার আছে। যা সহজেই উন্নত বিশ্ব এডপ্ট করতে পেরেছে, আমরা পারি নি।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অন্তত আমাদের সমাজে যদি সন্তান বেছে নেয়ার সুযোগ থাকতো, তবে, মা-বাবা কালোর বদলে ফর্সা সন্তান এবং গরীব দার্শনিকের বদলে প্রচুর ধনসম্পদ উপার্জন করবে এমন সন্তানকেই বেছে নিতেন। আমাদের মনস্তাত্ত্বিক নোংরামি অত্যন্ত অশ্লীল এবং জঘন্য।
ঘরোয়া সহিংসতা, নীরব ট্রমা ও আত্মহত্যার পরিসংখ্যান
বাইরে সুখী পরিবারের যে বিজ্ঞাপন আমরা দেখি, তার অভ্যন্তরে চলে মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নের এক ভয়াবহ অধ্যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে এবং সমসাময়িক প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী এ দেশের অর্ধেকেরও বেশি নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে পরিবারের আপনজনদের দ্বারাই মানসিক কিংবা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ইউনিসেফের তথ্যমতে, সিংহভাগ শিশু নিজ ঘরেই নিয়মিত মানসিক অবমূল্যায়ন ও শারীরিক শাস্তির ট্রমার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে।
এই পারিবারিক ও সামাজিক অবদমনই আজ তরুণদের আত্মহত্যার মিছিলকে দীর্ঘায়িত করছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার কারণগুলোর শীর্ষে রয়েছে ‘পারিবারিক চাপ’, ‘পড়াশোনায় আশানুরূপ ফল না পাওয়া নিয়ে মানসিক অত্যাচার’ এবং ‘অভিভাবকের সাথে তীব্র সম্পর্কের টানাপোড়েন’। ব্যর্থতা কোনো মানুষকে মারে না; মেরে ফেলে ব্যর্থ হলে পরিবার অ সমাজের চোখে নেমে আসা সেই চরম ঘৃণা ও অবজ্ঞার দৃষ্টি।
পবিত্রতার বিভ্রান্তি
ধর্মকে আমাদের সমাজে পারিবারিক একনায়কত্ব কায়েম রাখার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু, পবিত্র কুরআন অত্যন্ত কঠোর ও নির্মোহ ভাষায় রক্তের সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছে। পরিবার ও রক্তের মোহকে কুরআন মানুষের জন্য চরম পরীক্ষা:
“জেনে রেখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি কেবল এক পরীক্ষা...” (সূরা আল-আনফাল, ৮:২৮)।
ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ রয়েছে। এটাই সভ্য সমাজের প্রিন্সিপল। কিন্তু, বিবেক ও সত্যের জায়গায় পরিবারের অন্ধ আনুগত্য সরাসরি নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এক বৈশ্বিক মূলনীতি ঘোষণা করেছেন:
“স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১০৯৫; সহীহ আল-জামে, হাদিস নং ৭৫২০)।
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে কোনো নবীই তাঁর পরিবারের অন্ধ প্রথাকে মেনে নেননি। নূহ (আ.)-এর পরিবারে রক্তের সম্পর্কের চেয়ে বিশ্বাসের মর্যাদা ছিল বড় (সূরা হূদ, ১১:৪৬)। আসিয়া (আ.) স্বৈরাচারী রাজপ্রাসাদের ভেতরে থেকেও নিজের আত্মিক স্বাধীনতা রক্ষা করেছিলেন। ইসলামে মতবাদ, বিশ্বাস, পছন্দ, পেশা বা জীবনধারা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সম্মতিকে চূড়ান্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং উৎসাহিতও করা হয়েছে (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫১৩৬; সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৮৭৪)। পরিবার যখন এই সীমানা অতিক্রম করে, তখন তা আর পরিবার থাকে না, তা পরিণত হয় জুলুমের হাতিয়ারে।
আমাদের দেশের দিকে তাকালে দেখা যায় ছেলে-মেয়ে বড় হলে অনেক বাবা-মাই সন্তানদের, বিশেষ করে নারীদের সম্পত্তি দেয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য করেন। পিতা-মাতার মৃত্যু পরবর্তী অধিকারহীনতা, অন্যায্য বন্টন, দখলদারিত্ব এবং সামাজিক ট্রমা তো আছেই! আর, এই সামাজিক কাঠামোর অনেকে তো কন্যা শিশু জন্ম হলে 'অসন্তুষ্ট' হন! পুরুষতন্ত্রের নানান দিক তো আছেই! আচরণে, চিন্তায়, মননে! অথচ ইসলাম এসেছিল এধরনের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি থেকে মুক্তি দিতে! তাহলে কোন দিক থেকে পরিবার 'পবিত্র' হিসেবে বিবেচিত হতে পারে যেখানে "স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত" অতি প্রিয় এবং প্রচলিত উক্তি! যদিও, এর কোনো ভিত্তি নেই, কিন্তু, পরিবারগুলোর বিশ্বাসের চিত্র এর থেকে ভিন্ন নয়।
আল্লাহর ওলীগণের উন্মুক্ত মানবিক দরবার
রক্তের সম্পর্কই যে মানুষের চূড়ান্ত শ্রদ্ধাবোধের একমাত্র ভিত্তি নয়, তার সবচেয়ে নিখুঁত ও বাস্তব প্রমাণ হলেন সুফি-সাধক ও আল্লাহর ওলীগণ। তাত্ত্বিক ধর্মতত্ত্ব যখন কেবল কিতাবের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল, ওলীগণ তখন তাকে রূপ দিয়েছিলেন জীবন্ত মানবিক ভালোবাসায়। রক্তের কোনো টান না থাকা সত্ত্বেও শত শত বছর ধরে তাঁরা কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে পরম শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার আশ্রয় হয়ে আছেন কেবল তাঁদের শর্তহীন মমত্ববোধের কারণে।
যেখানে রক্তভিত্তিক পরিবার ব্যর্থতার দায়ে সন্তানকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয় বা সমাজ কাউকে ভুলের কারণে একঘরে করে ছুঁড়ে ফেলে, সেখানে ওলীদের দরবার কোনোদিন কারও জন্য বন্ধ হয়নি।
খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.)-এর আজমিরের দরবার ছিল হিন্দু, মুসলিম, উচ্চবর্ণ, নিম্নবর্ণ—সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত। তাঁর লঙ্গরখানায় কখনো জাতপাত, পদবি বা পাপ-পুণ্যের বিচার করে খাবার দেওয়া হতো না। সুলতান বা ভিক্ষুক—সবাই বসত একই মেঝেতে।
হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর চিশতিয়া ভাবাদর্শ ছিল: সৃষ্টির প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা (সুলহ-ই কুল)। তাঁর খানকায় আশ্রয় নেওয়া কোনো মানুষকে জিজ্ঞাসা করা হতো না সে কতটা ধর্মপ্রাণ বা কতটা সামাজিক স্ট্যাটাসের অধিকারী।
বাংলায় হযরত শাহজালাল (রহ.), শাহ পরান (রহ.) সহ অন্যান্য সাধকদের প্রভাব বিস্তার সম্ভব হয়েছিল কারণ তাঁরা মানুষকে কোনো ছাঁচে ফেলে বিচার করেননি। ঐতিহাসিক রিচার্ড ইটন তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণাশ্রম ও সামাজিক বৈষম্যের জাঁতাকলে পিষ্ট নিম্নবর্গের মানুষ সুফিদের খানকাতেই প্রথম মানুষের মর্যাদা পেয়েছিল।
পরিবার যেখানে রক্তের সম্পর্কের দোহাই দিয়ে ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইল করে, নিজের স্বপ্নের দাস বানায়, ওলীগণ সেখানে রক্তহীন সম্পর্কের ভেতর দিয়েই মানুষকে পরম মুক্তি ও আত্মিক প্রশান্তি উপহার দিয়েছেন। তাঁরা মানুষকে বিচারকের চোখে দেখেননি, দেখেছেন শর্তহীন অভিভাবকের মমতায়। এই অনন্যসাধারণ অন্তর্ভুক্তিমূলক আচরণই প্রমাণ করে যে রক্ত নয়, নিঃশর্ত সহমর্মিতা, দয়া এবং ভালোবাসাই মানুষের চূড়ান্ত আত্মিক আশ্রয়।
অনধিকার চর্চা ও মোরাল পুলিশিং
ড্রয়িংরুমে বসে কিংবা পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে অন্যের জীবনযাত্রায় উঁকি দেওয়া, কে কী পরল, কার মেয়ে পর্দা করল আর কার ছেলে কী চাকরি পেল—এই নীচ নজরদারিকে পৃথিবীর প্রতিটি ধর্ম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে:
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি: কুরআন মানুষের ঘরের ভেতরের গোপনীয়তাকে পবিত্র ঘোষণা করে ‘তাজাসসুস’ বা গোয়েন্দাগিরিকে স্পষ্টভাবে হারাম করেছে (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২)। অনুমতি ছাড়া অন্যের ঘরে উঁকি মারার শাস্তি হিসেবে প্রতিরোধ করার পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছে (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬৮৮৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি দিতে গিয়ে বলেছেন: “মানুষের ইসলাম পালনের অন্যতম সৌন্দর্য হলো যা তার সাথে সম্পর্কিত নয়, তা বর্জন করা।” (জামে আত-তিরমিযী, হাদিস নং ২৩১৭)। তিনি আরও সাবধান করেছেন যে, যে ব্যক্তি অন্যের ঘরের খুঁত খুঁজে বেড়ায়, আল্লাহ তাকে তার নিজের ঘরেই সবার সামনে অপদস্থ করবেন (জামে আত-তিরমিযী, হাদিস নং ২০৩২)।
খ্রিস্টধর্মের বাণী: যিশু খ্রিস্ট তাঁর বিখ্যাত ‘পর্বতোপদেশে’ ভণ্ড নীতিপুলিশদের মুখোশ খুলে দিয়ে বলেছিলেন:
“বিচার করো না, যেন তোমাদেরও বিচার করা না হয়... নিজের চোখে থাকা গুঁড়িটি না দেখে কেন তুমি তোমার ভাইয়ের চোখের ধূলিকণা নিয়ে ব্যস্ত হও?” (মথি ৭:১-৫)।
বৌদ্ধ ও সনাতন দর্শন: গৌতম বুদ্ধ ধম্মপদে বলেছিলেন—বিজ্ঞ মানুষ কখনো অন্যের ত্রুটি বা তারা কী করল আর না করল তা নিয়ে পড়ে থাকে না; সে কেবল লক্ষ্য রাখে নিজের আচরণ সংযত ও সতর্ক রয়েছে কি না (ধম্মপদ, পুপ্ফবর্গ)। একইভাবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় অর্জুনকে দেওয়া শ্রীকৃষ্ণের মূল উপদেশ ছিল:
“শ্রেয়ান স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ”—অর্থাৎ অন্যের নিখুঁত পথ অন্ধভাবে অনুকরণ করার চেয়ে নিজের স্বভাবজাত অসম্পূর্ণ পথ ধরে চলা অনেক শ্রেয়; অন্যের ছাঁচ অনুকরণ কেবল আত্মার ভয়ের কারণ হয় (গীতা, ৩:৩৫)।
পরিবার তখনই পরম আশ্রয় হয়ে ওঠে, যখন তা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে লালন করে, ব্যর্থতায় বুকে টেনে নেয় এবং ভিন্নতাকে গ্রহণ করার উদারতা দেখায়। কিন্তু যখন পরিবার হয়ে ওঠে সমাজের অন্ধ মানদণ্ড বাস্তবায়নকারী এক ঘাতক সেল, তখন সেখানে ব্যক্তির আত্মাহুতি দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
বিচারকের এই অহংকারী আসন থেকে পরিবার ও সমাজকে নামতেই হবে। যুগের পর যুগ পরিবারগুলোর এমন অশ্লীলতাই পরবর্তী প্রজন্মকেও একই দিকে পরিচালিত করেছে। একটা দুধের শিশুও শিখে যায় অন্যকে 'কালো,' 'পচা' কিংবা 'ছোট' ভাবতে। আবার, সে বড় হয়ে তার সন্তানকেও একই শিক্ষা প্রদান করে। এভাবে একটা চেইন সৃষ্টি হয়।
অন্যের জীবনে নাক না গলানো, কাউকে অহেতুক জাজ না করা এবং মানুষকে তার নিজস্ব সততা ও রুচি নিয়ে বাঁচতে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করাই একটি সভ্য সমাজের প্রথম শর্ত। যতক্ষণ না আমরা এই অসুস্থ তুলনার ইঁদুরদৌড় বন্ধ করছি এবং ব্যক্তির ভেতরের অনন্য সৃষ্টিকে সম্মান করতে শিখছি, ততক্ষণ কোনো শিক্ষানীতি বা কোনো আইন দিয়ে এই ঘরোয়া বন্দিদশা বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ, একেকটি ফ্যাসিস্ট পরিবার থেকেই একটা ফ্যাসিস্ট সমাজের জন্ম, আর, রাষ্ট্র তো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।
“জন্মিয়াছে যারা এই পৃথিবীতে
সন্তানের মতো হ’য়ে—
সন্তানের জন্ম দিতে-দিতে
যাহাদের কেটে গেছে অনেক সময়,
কিংবা আজ সন্তানের জন্ম দিতে হয়
যাহাদের; কিংবা যারা পৃথিবীর বীজখেতে আসিতেছে চ’লে
জন্ম দেবে—জন্ম দেবে ব’লে;
তাদের হৃদয় আর মাথার মতন
আমার হৃদয় না কি? তাহদের মন
আমার মনের মতো না কি?
—তবু কেন এমন একাকী?
তবু আমি এমন একাকী”
-জীবনানন্দ দাশ (বোধ)
মো. রিদওয়ান আল হাসান,
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সাহিত্যনামা