আমাদের ছেলে-মেয়ে ‘মানুষ’ হওয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতি: সনদের আড়ালে পাশবিকতা ও নৈতিকতার সংকট


আমাদের সমাজে অত্যন্ত তৃপ্তি ও সামাজিক অহংকার নিয়ে একটি কথা হরহামেশা বলা হয়, অমুকের ছেলে বা মেয়েটি অবশেষে ‘মানুষ’ হয়েছে। আমরাও বুক ফুলিয়ে সমাজে সেই পরিচয়ের বড়াই করি। কিন্তু একটু থমকে দাঁড়িয়ে যদি আমরা নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করি, আমাদের এই চেনা সামাজিক বাস্তবতায় ‘মানুষ হওয়া’ বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি? একজন ব্যক্তি সৎ পথে জীবন যাপন করছে কি না, তার ভেতরে পরিবারের মানুষের প্রতি সম্মান আছে কি না, কিংবা সে দুর্বল মানুষের সাথে মানবিক আচরণ করে কি না, এই প্রশ্নগুলোর কোনো মূল্য কি আমাদের কাছে আছে? আমাদের বাস্তবতায় ‘মানুষ হওয়া’র একমাত্র সংজ্ঞা হলো যেকোনো উপায়ে একটি লোভনীয় চাকরি জোগাড় করা, ক্ষমতার বলয়ে প্রবেশ করা এবং মাস শেষে চোখ বন্ধ করে মোটা অঙ্কের টাকা ঘরে তোলা। অর্থাৎ, ‘মানুষ’ শব্দটিকে তার আবহমান নৈতিক উচ্চতা থেকে নামিয়ে এনে আমরা নিছক ক্ষমতা, পদবি ও বৈষয়িক সফলতার এক নির্লজ্জ সমার্থক শব্দ বানিয়ে ফেলেছি। সনদের নামে গড়ে তোলা এই অসুস্থ বয়ান আমাদের সন্তানদের রক্তমাংসের সংবেদনশীল মানুষ বানায় না, বরং তৈরি করে নৈতিকতাবিবর্জিত, লোভী ও সুবিধাবাদী একেকটি সামাজিক দানব।
সফলতার ড্রয়িংরুম বনাম অন্ধকারের অন্দরমহল: তথাকথিত ‘মানুষ’দের পাশবিকতা
আমাদের তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত ‘মানুষ’দের অন্দরমহলের পর্দা একটু সরালেই এক ভয়ংকর রূপ বেরিয়ে আসে। সমাজে যাদের সবচেয়ে ‘উচ্চশিক্ষিত’, ‘মার্জিত’ ও ‘প্রতিষ্ঠিত’ বলা হয়, তাঁদের চার দেয়ালের ভেতরেই চলে সবচেয়ে নির্মম অপরাধ। আজ খবরের কাগজ খুললে দেখা যায়, বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা, বড় করপোরেট এক্সিকিউটিভ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কিংবা চিকিৎসক নিজের স্ত্রীকে যৌতুকের দাবিতে বা সামান্য তর্কে পিটিয়ে হত্যা করছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় সহিংসতা জরিপ অনুযায়ী, দেশের শতকরা ৭০ ভাগের বেশি বিবাহিত নারী তাঁদের জীবনে কোনো না কোনো ধরনের পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন, যার একটি বিশাল অংশ ঘটে তথাকথিত শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে (BBS, 2015)। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনাগুলোর সিংহভাগই ঘটে থাকে সমাজের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিচারক কিংবা বিত্তবান পরিবারে, যেখানে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা কিংবা হাত-পা ভেঙে দেওয়ার মতো নারকীয় ঘটনা ঘটান তথাকথিত সুশিক্ষিত গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীরা (ASK, 2023)।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতনের একটি বড় অংশের অপরাধী সমাজের তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ ও ক্ষমতাশালী শ্রেণি (BMP, 2022)। যে ছেলেটি পরিবারের অমূল্য সম্পদ হয়ে ‘মানুষ’ হলো, সেই ছেলেটিই বৃদ্ধ মা-বাবাকে বোঝা মনে করে বার্ধক্যে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে কিংবা বৃদ্ধাশ্রমে নির্বাসন দিচ্ছে। যে ব্যক্তিটি নিজের দুর্বল গৃহকর্মীর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়, স্ত্রীকে নির্যাতন করে, সে কোন যুক্তিতে ‘মানুষ’? তার প্রথম শ্রেণির সনদ, তার রাজকীয় পদবি কিংবা তার বিত্তবৈভব কি তার ভেতরের আদিম পশুত্ব ও বিকৃতিকে ঢাকতে পেরেছে? সমাজ যাদের হাততালি দিয়ে ‘মানুষ’ ঘোষণা করেছে, তাদের এক বড় অংশ আজ নৈতিকতার বিচারে আস্ত এক একজন বর্বর অমানুষ।
ঘুষের রাজপ্রাসাদ বনাম নিঃস্ব সততা: প্রকৃত অমানুষ কে?
আমাদের সমাজ মেধার মোড়কে এমন কিছু মানুষ তৈরি করেছে যাদের লোভের কোনো তলানি নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জাতীয় খানা জরিপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদনগুলো স্পষ্ট দেখায় যে দেশের সেবা খাতগুলোতে সবচেয়ে বেশি ঘুষ ও দুর্নীতির সাথে জড়িত সমাজের প্রথম সারির নীতি নির্ধারক ও আমলাতন্ত্র (TIB, 2021)। যিনি ফাইলের নিচে লাখ টাকার বান্ডিল না পেলে স্বাক্ষর করেন না, যিনি গরিবের রিলিফের চাল চুরি করেন, কিংবা যিনি সিন্ডিকেট গড়ে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেন, তিনি তো আমাদের প্রচলিত সংজ্ঞায় সেরা ছাত্র ছিলেন। তিনি তো পরীক্ষায় প্রথম হয়ে, প্রতিযোগিতায় সবাইকে পেছনে ফেলেই সেই চেয়ারে বসেছিলেন। তাঁর সেই শিক্ষা আর ক্ষমতার দম্ভ কি তাঁকে ন্যূনতম মানুষ বানাতে পেরেছে?
অন্যদিকে সমাজের চোখে যারা তথাকথিত ‘অমানুষ’ বা ব্যর্থ, তাদের জীবন কেমন? যে কৃষক রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ফসল ফলিয়ে আমাদের ক্ষুধা মেটান, যে দিনমজুর নিজের শরীরের শেষ রক্তবিন্দু পানি করে পরিবারের জন্য দুটো ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করেন, কিংবা ফুটপাতে রাত কাটানো যে পাগলটি কোনো দিন কারও একটা পয়সা চুরি করেনি, তাদের আমরা হেয় চোখে দেখি। অথচ তারা কোনোদিন ব্যাংকের টাকা লোপাট করেনি, কারও ওপর অন্যায় জুলুম চালায়নি, কারও হক নষ্ট করেনি। তাহলে নৈতিকতার দাঁড়িপাল্লায় কে প্রকৃত মানুষ? কোটি টাকার ঘুষখোর কর্মকর্তা মানুষ, নাকি ঘাম ঝরিয়ে সততার সাথে বাঁচা প্রান্তিক মেহনতি মানুষ?
শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনের নির্বাসন: মননশীলতা কি অপরাধ?
আমাদের এই বস্তুবাদী সমাজে কোনো সন্তান যদি দর্শন চর্চা করতে চায়, সাহিত্য ভালোবাসে, সুর বাঁধে কিংবা চিত্রশিল্পে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে চায়, সমাজ সাথে সাথে তার ওপর ‘অপদার্থ’ তকমা সেঁটে দেয়। অভিভাবকেরা শিউরে উঠে বলেন, ওসব নিয়ে থাকলে পেটে ভাত জুটবে না, তুমি তো ‘মানুষ’ হতে পারলে না। অর্থাৎ, যে বিদ্যা মানুষের হৃদয়কে কোমল করে, মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়, সহমর্মী বানায়, তা এই সমাজের কাছে চরম অর্থহীন। এই সমাজ চায় এমন এক সুবোধ কর্মচারী, যার চোখে কোনো স্বপ্ন থাকবে না, হৃদয়ে কোনো প্রেম থাকবে না, বিবেকে কোনো প্রশ্ন থাকবে না।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সারা জীবন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে কাটিয়েছেন (Islam, 1925)। তিনি রাজপ্রাসাদের আরাম-আয়েশ চাননি, ক্ষমতার দালালির কাছে মাথা নত করেননি। শাসক তাঁকে বারবার কারাগারে পাঠিয়েছে, তবুও তিনি নিপীড়িত মানুষের মুক্তির গান গেয়ে গেছেন। আজকের সমাজে যদি নজরুলের মতো কোনো স্বাধীনচেতা তরুণ জন্ম নেয়, আমাদের পরিবারগুলো হয়তো তাকে ‘ব্যর্থ’ বা বখে যাওয়া বলে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেবে। কারণ নজরুল কোনো আমলা হতে পারেননি, নজরুল কোনো করপোরেট বসের পা চাটতে শেখেননি। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় নজরুল চিরন্তন ‘মানুষ’ হিসেবে বেঁচে আছেন, আর সেই যুগের শত শত অহংকারী ম্যাজিস্ট্রেট আর সুবিধাভোগী রাজকর্মচারীরা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে হারিয়ে গেছেন।
জ্ঞানের আত্মমর্যাদা বনাম ক্ষমতার গোলামি: ইতিহাসের শিক্ষা
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, জ্ঞান চর্চার আসল লক্ষ্য ছিল মানুষের ভেতরের অহংকার ও পশুবৃত্তিকে ধ্বংস করা। জ্ঞানীরা কখনো ক্ষমতার লোভে পথভ্রষ্ট হননি। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস ক্ষমতার অন্যায্য নির্দেশ না মেনে হাসিমুখে হেমলক বিষের পেয়ালা তুলে নিয়েছিলেন, কিন্তু সত্যের সাথে প্রতারণা করেননি (Plato, 399 BCE)।
মুসলিম জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে ইমাম আবু হানিফা ছিলেন একজন স্বাধীন ব্যবসায়ী, যিনি ক্ষমতার লোভনীয় প্রধান বিচারপতির পদ হেলায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন শাসকের দরবারে বসলে নিজের বিবেক ও সততাকে বলি দিতে হবে। ফলস্বরূপ তাঁকে নির্দয় বন্দিশালায় বিষপ্রয়োগে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল (Ibn Kathir, 1373)। সুফি সাধক মনসুর হাল্লাজ আত্মোপলব্ধির চরম শিখরে পৌঁছে শাসকের মিথ্যা অহংকারকে অস্বীকার করেছিলেন, যার কারণে তাঁকে নির্মমভাবে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হয়েছিল (Al-Sulami, 1021)। ইমাম গাজ্জালি তাঁর এহইয়াউ উলুমিদ্দীন গ্রন্থে শতাব্দীর পর শতাব্দী আগে সতর্ক করে গেছেন, যে জ্ঞান মানুষের ভেতরের তাকাব্বুর বা অহংকার বাড়ায় এবং ক্ষমতার লিপ্সা তৈরি করে, তা জ্ঞান নয়, তা হলো ধ্বংসাত্মক ব্যাধি (Al-Ghazali, 1097)।
সেই মনীষীরা জানতেন, আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার দাস হওয়া মানে আত্মিক মৃত্যু। অথচ আজ আমরা আমাদের সন্তানদের সেই দাসত্ব আর ক্ষমতার অন্ধ গোলামির দিকেই জোর করে ঠেলে দিচ্ছি এবং তার নাম দিচ্ছি ‘মানুষ হওয়া’।
মানুষ হওয়ার সংজ্ঞাকে ফিরিয়ে আনার লড়াই
‘মানুষ হওয়া’ কোনো সামাজিক স্ট্যাটাস, দামি গাড়ি কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর ছড়ি ঘোরানোর ক্ষমতা নয়। মানুষ হওয়া হলো নিজের ভেতরের বিবেককে বাঁচিয়ে রাখার এক আপসহীন সংগ্রাম।
মানুষ সে-ই, যে কোটি টাকার প্রলোভনের মুখে দাঁড়িয়ে ঘুষের ফাইল ছুড়ে ফেলতে পারে। মানুষ সে-ই, যার ঘরে কোনো নারী বা দুর্বল মানুষ শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় না। মানুষ সে-ই, যে দুর্বল গৃহকর্মীকে নিজের সন্তানের স্নেহে আগলে রাখে এবং পরিবারের প্রবীণ মা-বাবাকে গভীর শ্রদ্ধায় বুকে জড়িয়ে ধরে। মানুষ সে-ই, যে ক্ষমতার চূড়ায় বসেও নিজের অহংকারকে মাটিতে মিশিয়ে সাধারণ মানুষের দুঃখের অংশীদার হতে জানে।
আমাদের সন্তানদের তথাকথিত ‘মানুষ’ বানানোর এই পচা ও অন্ধ কারখানা বন্ধ করার সময় এসেছে। ক্ষমতার উপাসনা আর টাকার অন্ধ মোহ ভেঙে দিয়ে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রেম, সততা ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন পাঠে। কাগুজে সনদের মেকি আভিজাত্য নয়, একজন সৎ, সংবেদনশীল এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানো মানবিক সত্তা হওয়াই যেন হয় আমাদের সন্তানদের একমাত্র পরম পরিচয়।
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি
Ain o Salish Kendra [ASK]. (2023). Human Rights in Bangladesh 2022: Annual Monitoring Report. ASK Publications.
Al-Ghazali. (1097). Ihya Ulum al-Din (The Revival of the Religious Sciences).
Al-Sulami. (1021). Tabaqat al-Sufiyya (Biographies of the Sufis).
Bangladesh Bureau of Statistics [BBS]. (2015). Report on Violence Against Women (VAW) Survey 2015. Ministry of Planning, Government of Bangladesh.
Bangladesh Mahila Parishad [BMP]. (2022). Annual Report on Violence Against Women and Children in Bangladesh. BMP Central Committee.
Ibn Kathir. (1373). Al-Bidayah wan-Nihayah (The Beginning and the End).
Islam, K. N. (1925). Samyabadi (The Equalizer / Songs of Equality).
Plato. (399 BCE). Apology (The Defense of Socrates).
Transparency International Bangladesh [TIB]. (2021). Corruption in Service Sectors: National Household Survey 2021. TIB Research Report.

নবীনতর পূর্বতন