‘বাবরের প্রার্থনা’: শক্তির অন্তর্গত ভাঙন ও আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণের কবিতা

সাহিত্যনামার একটি বিশ্লেষণ


এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম
আজ বসন্তের শূন্য হাত–
ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

কোথায় গেল ওর স্বচ্ছ যৌবন
কোথায় কুরে খায় গোপন ক্ষয়!
চোখের কোণে এই সমূহ পরাভব
বিষায় ফুসফুস ধমনী শিরা!

জাগাও শহরের প্রান্তে প্রান্তরে
ধুসর শূন্যের আজান গান;
পাথর করে দাও আমাকে নিশ্চল
 আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

না কি এ শরীরের পাপের বীজাণুতে
কোনোই ত্রাণ নেই ভবিষ্যের?
আমারই বর্বর জয়ের উল্লাসে
 মৃত্যু ডেকে আনি নিজের ঘরে?

না কি এ প্রাসাদের আলোর ঝলসানি
পুড়িয়ে দেয় সব হৃদয় হাড়
এবং শরীরের ভিতরে বাসা গড়ে
লক্ষ নির্বোধ পতঙ্গের?

আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার
জীর্ণ করে ওকে কোথায় নেবে?
ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর
 আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

শঙ্খ ঘোষ বাংলা কবিতার অন্যতম কোমল অথচ বেদনাবিদ্ধ কণ্ঠ। তাঁর কবিতায় মানবিকতার সঙ্গে ইতিহাস, স্মৃতি, অপরাধবোধ এবং নৈতিক দ্যোতনা মিলেমিশে তৈরি করে এক গভীর আধ্যাত্মিক সুর। এ ধারার সবচেয়ে আলোচিত কবিতাগুলোর একটি হলো ‘বাবরের প্রার্থনা’—যেখানে একজন সম্রাটের জয়ের উল্লাস হঠাৎ ভেঙে যায় করুণ ও ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মুখে। কবিতাটি এই আকস্মিক ভাঙনকে কেবল মানসিক বা সামাজিক বিপর্যয় হিসেবে নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করে। এই প্রবন্ধে সেই আধ্যাত্মিক উপলব্ধির স্তরগুলো তুলে ধরা হলো।


১. ইতিহাসের বর্ম খুলে মানুষের মুখোমুখি

বাবর ইতিহাসের এক পরিচিত চরিত্র—বিজেতা, সেনাপতি, সম্রাট। তাঁর উপস্থিতি সাধারণত রক্তপাত, যুদ্ধ, প্রভাব ও ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কবিতাটিতে শঙ্খ ঘোষ যে বাবরকে দেখিয়েছেন, তিনি আর যুদ্ধক্ষেত্রের সেই জয়োৎসবমগ্ন শাসক নন। বরং তিনি এক ভঙ্গুর পিতা, যিনি সন্তানের অসুস্থতার সামনে অসহায়।

এই রূপান্তরই কবিতার প্রথম আধ্যাত্মিক মুহূর্ত।

মানুষ যখন তার পরিচয়ের সব বর্ম—ক্ষমতা, আধিপত্য, ইতিহাস—সব খুলে ফেলে দাঁড়ায়, তখনই সে নিজের গভীরে প্রবেশ করে। বাবরের ক্ষেত্রে সেই প্রবেশের দরজা খুলে যায় তাঁর সন্তানের মৃত্যুভয়ের সামনে।

আধ্যাত্মিকতার মূল শর্তই হলো,

অহংকারের ভাঙন এবং নিজের সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি।

২. পাপবোধ ও ‘অদৃশ্য ন্যায়ের’ সামনে দাঁড়ানো

কবিতার ভাষা জুড়ে বাবরের মধ্যে একটি ভয়ানক আত্মসমালোচনা দেখা যায়—

তিনি যেন বুঝতে পারছেন তাঁর অতীত কখনও কখনও নির্মমতার দিকে ঝুঁকেছিল।

তিনি প্রশ্ন করেন:

তার সন্তানের মৃত্যুভয় কি তাঁর নিজের পাপের ফল?

তার লুণ্ঠন ও বিজয়ের ইতিহাস কি নিজের ঘরে মৃত্যু ডেকে এনেছে?

এই আত্মসমালোচনাই প্রাচ্য আধ্যাত্মিকতার একটি বড় উপাদান।

বৌদ্ধধর্মে একে বলা হয় ‘কর্মফল’,

সুফি তত্ত্বে একে বলা হয় ‘নফসের আত্মসমীক্ষা’,

আর হিন্দু দর্শনে ‘অন্তর্জিজ্ঞাসা’।

বাবরের এই প্রশ্নগুলো মোটেই রাজনৈতিক নয়—

এগুলো নৈতিক ও অস্তিত্বগত প্রশ্ন, যা মানুষকে নিজের গভীরতম সত্যের সামনে দাঁড় করায়।

শঙ্খ ঘোষ এই প্রশ্নমালার মাধ্যমে দেখিয়েছেন—

ইতিহাসের বড় শাসকরাও অদৃশ্য নৈতিক শক্তির সামনে সমানভাবে অসহায়।

৩. সম্রাট থেকে ভিখারি: আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণ

কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী আধ্যাত্মিক মুহূর্ত হলো বাবরের প্রার্থনা।

তিনি তাঁর সন্তানের জীবন চাইছেন—কিন্তু বিনিময়ে নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত।

এটি কেবল এক পিতার আবেদন নয়;

এটি এক ধরনের আত্মত্যাগের নৈতিক দীপ্তি, যা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার অন্যতম উচ্চতম পর্যায়।

চাইলে এ প্রার্থনাকে ধর্মীয় ভাবা যায়,

কিন্তু শঙ্খ ঘোষ যে ভঙ্গিতে এটি সাজিয়েছেন, তা ধর্মবিশেষের বাইরে।

বাবর জানেন না—

তিনি কাকে ডাকছেন,

কোন শক্তির কাছে হাত বাড়াচ্ছেন,

কোন ঈশ্বর তাঁর শোনা-না-শোনা প্রার্থনার ওপারে আছেন।

এই অচেনা সত্তার কাছে আত্মসমর্পণই—আধ্যাত্মিকতার মূল পরম্পরা।

এই অর্থে ‘বাবরের প্রার্থনা’ কোনও ধর্মীয় কবিতা নয়, বরং অন্তর্হৃদয়ের তীর্থযাত্রা।

৪. জয়ের আস্হাভঙ্গ: শক্তির প্রতি গভীর অনাস্থা

কবিতায় বাবর দেখছেন—

তার প্রাসাদের আলোর ঝলকানির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে পচন, ধ্বংস, পতঙ্গের বাসা।

অধিকারের বহর যেন তাকে শুষে নিচ্ছে, ক্ষয় করছে।

এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রূপক।

ক্ষমতার ঝলকানি কত সময় জীবনের গভীর সত্তাকে পুড়িয়ে দেয়—

এটাই কবি দেখাতে চান।

এই উপলব্ধি না আসলে আধ্যাত্মিকতার দরজা খোলে না।

যে ক্ষমতা মানুষকে মহিমান্বিত করে—

সেই ক্ষমতাই কখনও কখনও সবচেয়ে বড় অভিশাপ।

বাবর সেই অভিশাপকে প্রথমবার বুঝতে পারছেন, এবং বুঝেই ভেঙে পড়ছেন।

এই ভাঙনই মুক্তির শুরু।

৫. সন্তানের জন্য আত্মাহুতির আকাঙ্ক্ষা: ঈশ্বরের সন্ধান মানবিক ভালোবাসায়

কবিতার শেষ প্রার্থনা—

সন্তানটিকে বাঁচিয়ে দাও,

আমাকেই ধ্বংস করো—

এটি ধর্মীয় আখ্যানের মতো হলেও এর গভীর নৈতিক তাৎপর্য আছে।মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব বহু সময় মানুষকে ঈশ্বর-নির্ভর করে তোলে;

কিন্তু একই সঙ্গে এটি মানুষকে ঈশ্বর-সদৃশও করে তোলে—

যেখানে কারো প্রতি গভীরতম ত্যাগ, নিঃশর্ত ভালোবাসা

মানুষকে তার অস্তিত্বের শুদ্ধতম জায়গায় পৌঁছে দেয়।

এই জায়গাটিই আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রে।

এখানে আর নীতি, রাজনীতি, ইতিহাস—কিছুই নেই।

থাকে শুধু মানবিক ভালোবাসার সূক্ষ্ম আলো।

৬. শঙ্খ ঘোষের কবিতায় আধ্যাত্মিকতা: নৈঃশব্দ্যের গভীর সুর

‘বাবরের প্রার্থনা’ শঙ্খ ঘোষের কবিতার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করে—

তিনি আধ্যাত্মিকতাকে বাহ্যিক ধর্মাচারের মাধ্যমে নয়,

বরং মানুষের অন্তর্গত ক্ষত, ভয়, করুণা, অপরাধবোধ এবং প্রেমের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করেন।

এই কবিতায় ঈশ্বর নেই—কিন্তু ঈশ্বরীয় অনুভব আছে।

প্রার্থনা আছে—কিন্তু ধর্ম নেই।

বিচারবোধ আছে—কিন্তু আইন নেই।

আত্মদান আছে—কিন্তু ঘোষণা নেই।

এই নিঃশব্দ গভীরতা শঙ্খ ঘোষকে আধুনিক আধ্যাত্মিক কবিদের ধারায় বিশেষ স্থান দেয়।

উপসংহার: ‘বাবরের প্রার্থনা’ কেন আজও প্রাসঙ্গিক

আজকের বিশ্বেও যখন ক্ষমতা, হিংসা, যুদ্ধ, আধিপত্য—এগুলোই প্রধান আলোচ্য,

তখন বাবরের প্রার্থনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

মানুষের শক্তির চেয়ে মানবিকতা বড়।

ক্ষমতার চেয়ে সহানুভূতি বড়।

জয়ের চেয়ে বোধ বড়।

আর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই প্রকৃত মুক্তি আসে।

এই কবিতার আধ্যাত্মিকতা কোনো ধর্মানুবর্তিতার নয়—

বরং মানবিকতার গভীর স্বীকৃতি।

শঙ্খ ঘোষ দেখিয়েছেন—

একজন সম্রাটের বুক ভেঙে বেরোনো প্রার্থনাও হতে পারে

এই পৃথিবীর অন্যতম নির্মল আলো।

নবীনতর পূর্বতন