মাহ্দী গালিবের তিনটি কবিতা

লেখক মাহ্দী গালিব

আমার একমাত্র ঠিকানা

মাঘের শীতে চাঁদের সাথে মোড়েতে গলিতে
বিগলিত জোছনায় কুয়াশায় খুঁজে যায়
আমার দু'চোখ, ঊষার আকাশ।

ঊষার আকাশ- ঝিলমিলে সূর্যের প্রত্যাশা
চামড়ার রোমেরোমে উষ্ণ স্বস্তির আঁকিবুঁকি
ফুটপাত শ্রেণির পরম বিলাশ।

এসবি দেখি, হোস্টেল জীবনে এসে।
পঁচিশ টাকার দু'বেলা তরকারিতে
গোস্তের টুকরো খুঁজি, আঙুল ঠেলেঠেলে।
ভাঙিভাঙি করা ভবনের ভেতর
কঁচকঁচ করা খাটের ওপর, স্বপ্ন দেখি,
একদিন শীতাতপ ঘরে, কারো বাহুডোরে
ঘুমাব পৈশাচিক শান্তিতে। 

পিছে ঠেলে সভ্যতা,
রাস্ট্রযন্ত্রের বুর্জোয়া মন্ত্রে আবোধ্য ইবাদত।
এগোও! ছাপিয়ে যাও বাকিদের
পাবে সম্মান, পাবে দেহসুখের উপকরণ।
পরিবারের স্নেহসিক্ত চাবুক,
মায়ের মায়াবী মুখের পর্দায় দেখি,
প্রতিযোগিতাবাদের অবচৈতনিক সমর্থন।

আমাকে এগুতে বলে,
দে অলিম্পকের দৌড়! 
আমি দৌড়াই, পরাজিত হই, বরংবারের মত।

এ পৃথিবী আমার, প্রকৃতি আমার,
এ আমার জন্মের অধিকার।
আর তাদের গড়ে তোলা সভ্যতা, পুঁজি, রাস্ট্র
আমাকে বঞ্চিত করে, সে অধিকার থেকে।

লাভাময় ভূ-গর্ভ থেকে মহাকাশের আলোকবর্ষেও
তাদের অবাধ বিস্তার,
আর আমি বাংলার চিপাগলির অন্ধকার
সাথে নিয়ে জোছনা দেখি
যেন এক অবাঞ্চিত অতিথি।

তারা সব নিয়েছে,
তবুও আমার রাজ্য আছে
আমি সেথায় নন্দিত নাগরিক।
মহাকালের এই সুবিশাল দেহে
গড়ে ওঠা একমাত্র অবিনশ্বর শহর
প্রেমিক হৃৎপিণ্ডের ইটে গাঁথা
শান্তির নকশীকাঁথা
আমার একমাত্র ঠিকানা... মদিনা!

কাসিদা গাউসিয়া

স্বয়ং স্রষ্টায় দিলেন আমায় প্রেমেতে মিতালি
প্রেমের গেলাস এদিকে আস দে শরাব ঢালি।

এলো ছুটে মোর নিকটে সে প্রেমময় পাত্র 
প্রেমের হালে সখা মহলে করলাম তা বিলি। 

সব সখাকে বলি ডেকে এসো এখনি চলে
মোর সঙ্গে একই রঙ্গে হও খোদা-খেয়ালি৷
 
হাত বাড়িয়ে নাও পিয়ে—হে সখা সেনাদল
রসুল নিজে দিল সেজে এ প্রেমপাত্র উথলী।
 
হই মাতোয়ারা উপচে পড়া প্রেমপাত্র পানে
উঁচু হতে আমার হাতে চাটো যা রেখেছি খালি।
 
সসম্মানে উঁচুস্থানে আছো বন্ধু হে তবুও
গোপন গগনে মোর পিছনে রবে সতত সকলি। 

খোদা সান্নিধ্যে সবার মধ্যে আমি অনন্য একক
খোদার অধীন হয়ে স্বাধীন আমি সর্বাগ্রে চলি। 

আমার মতো কে এতো পুণ্য পুরুষ উন্নত—আমি
সুফিরাজ যেমন সাদাবাজ পাখিতে প্রভাবশালী।

খোদায় মুকুট দিল অটুট দিল পোশাক পরিয়ে
সব তরিকা আমার একা শক্তিতে শক্তিশালী।
 
সকল গুপ্ত করে ব্যক্ত খোদা আমার লাগি
সব ইচ্ছার পূরণ হবার দিল সনদ গলায় ঝুলি।

এবং সাধক এর বিচারক বানালেন খোদ খোদায়
আমার আদেশ রবে অনিশেষ রবে অনন্ত-কালি।

এবং শুকিয়ে যাবে হারিয়ে সাগর জল সকলি
যদি সাগরে একটু করে আমার রহস্য ফেলি। 

এবং পাহাড়ে আস্তে করে রাখি যদি রহস্যাবলি
হবে চুরমার সকল পাহাড় হবে আণুবীক্ষণিক ধুলি।
 
এবং আগুনে গুনেগুনে রাখি রহস্য সাবধানে
আগুন নিভে ছাই হবে—ছাইও হারাবে কালি।
 
এবং খোদার অপার দয়ার রহস্য রাখলে কবরে
সকল মৃত হবে জীবিত—উঠবে কথা বলি।

শোন কাফের তর্ক কিসের অবিশ্বাস কেনো করলি 
সকল যুগ আমার অনুগ মাসও মানে নির্দেশাবলি।
 
সেসব যুগ নিয়মানুগ আমাকে ঘিরে ঘোরে—করে
অনুবাদ সকল সংবাদ দেয় ভূতভবিষ্যৎ বলি।
 
মুরিদ মোর যা ইচ্ছে কর গা খা লাফা আনন্দে
খোদাপ্রেমে আমার নামে রশিটা বাঁধিস খালি।

মুরিদ মোর কাউকে না ডর আল্লাহ আমার রব
তাঁর ইচ্ছায় তোকে রক্ষায় আমি পরাক্রমশালী।
 
দেশে দেশে মহাকাশে বাজে মোর নামের ডঙ্কা
ভাগ্য-ঘোষক হয়ে গায়ক গায় মোর গুণাবলি।

খোদায়ি সব উপনিবেশ—মানে আমার আদেশ
সময়ও পূর্বে আমার কলবে ফুটেছে কুসুম কলি।

ফেললে পলক দ্যুলোক ভূলোক সমগ্র পরলোক
দেখি সরষে দানা ভাসে হাতের তালুতে মামুলি। 

সাধক সকলে মেনে চলে আমার চরণ চলন চিহ্ন
জোছনা উজল নবি পদতল রেখেছি বুকেতে তুলি।

মুরিদ সকল থাক অটল থাকুক শত চোগলখোর 
যুদ্ধক্ষেত্রে অমোঘ অস্ত্রে করি মিথ্যুক ফালি ফালি।

গোপন-প্রকাশ জ্ঞান বিকাশ করেছে আমায় কুতুব
মওলা মোরে করে আদরে পরম-ভাগ্যে ভাগ্যশালী৷
 
তাই বলি কোন অলি আছে এমন আমার মতন
কোন কালে ইলম হালে কে দিবে আমার তুল্যি।
 
ইবনে রিফায়ি অনুধ্যায়ী হন যেমন উদাহরণ 
আমার পথে কাজে মতে সদা এসেছেন চলি। 

হিজাজ দেশি মক্কাবাসী হাশিমি-বংশী নবি-শশী
পিতার পিতা সর্বদাতা তাই পাই যা-ই গাই গীতালি।
 
আমার স্বজন গ্রীষ্ম দহন সয়ে পালন সাধে সাওম
নিশিরাতে ইবাদতে উঠে যেনো মুক্তো জ্বলি। 

হাসানি আমি উপনামী মারেফাতে মাখদা-সম্ভ্রমী
আমার পা আছে ছাপা—ঘাড়ে বহে সকল অলি।
 
জানালাম—আমার নাম প্রসিদ্ধ আব্দুল কাদির
মাতামহ উৎস-সহ রাখেন পুরো পূর্ণতা আগলি।
 
আমি জিলানি মহিউদ্দিন-ই আমার উচ্চ উপাধি
পতাকা উড়ে পাহাড় চূড়ে সাজে তাতে শৃঙ্গশৈলী।
 
করো গ্রহণ মালিক এখন ফিরিও না এ প্রার্থনা
আহ্বানে সাড়া দানে জুড়াও প্রাণে নজর তুলি।

সকল মুশকিল করো সাবলিল করো মুক্ত অনাবিল
পূর্ণতা চাঁদ মোস্তাফা নিখাঁদ নাম নিলাম আকুলি।

ভালোবাসি

মৃত্যুর মতো ভালোবাসি
অবধারিত ভালোবাসি। 

ভালোবাসি কষ্ট মতো
হামু-গাইনে পিষ্ট মতো
মুনিবের উচ্ছিষ্ট মতো।
ভালোবাসি— 

সদ্য শিশু শুদ্ধ মতো
মরু-মদিনা মুগ্ধ মতো
শরৎ-শিশির স্নিগ্ধ মতো
বাংলা বাগবিদগ্ধ মতো। 

মা মাখানো ভাত মতো
শুদ্ধ সৈয়দ জাত মতো
বসন্ত বারাভি রাত মতো
ভিখারি ভিক্ষা পাত মতো। 

গোলাম-গাউস জিন্দা মতো
ইবাদত সিজদা বান্দা মতো
সাকি শরাব নিন্দা মতো।

খায়বারের খবর মতো
সুফিগণের সবর মতো
রেযার গভীর কবর মতো।

আজমিরি আত্মার মতো
ভাণ্ডারী ভাণ্ডার মতো
বারেলি-বাদশার মতো।

মানবপ্রেম মজুদে
ওয়াহাদাত-আল অজুদে
তিমির তাহাজ্জুদে
ওয়াহাদাত-আল সুজুদে—
ভালোবাসি অবাধ্য
ভালোবাসি অসাধ্য 
ভালোবাসি আরাধ্য। 

ভালোবাসাময় ভালোবাসি
ভালোবাসাহীন ভালোবাসি। 

এবং ভালোবাসি
অথবা ভালোবাসি
যেহেতু ভালোবাসি 
কিন্তু ভালোবাসি
বরঞ্চ ভালবাসি।

ভালোবাসি ভয়ানক—
ভালোবাসি হে একক!
হে মদিনার মহানায়ক!

***

বারাভি : বারো তারিখ। বারো রবিউল আউয়াল। 
গোলাম-গাউস : গাউসে পাকের গোলাম। 
সবর : ধৈর্য।  
তিমির : অন্ধকার। তাহাজ্জুদ গভীর অন্ধকারেই আদায় হয়৷
খায়বারের খবর : খায়বার নামক স্থানে একটি যুদ্ধ হয়। এখানেই মওলা আলি (কাদ্দাসা সিররুহুল আজিজ) একহাতে শত্রু দূর্গের দরজা উপড়ে ফেলেছিলেন। 
রেযার গভীর কবর : ইমাম আলা হযরতের নাম রেযা। আহমাদ রেযা খান। তিনি বলেছিলেন— আমার কবর গভীর করে খুড়িও, আমার নবীজান (সাল্লালাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) যখন উপস্থিত হবেন, আমি দাঁড়িয়ে সালাম জানাব।


মাহ্‌দী গালিব

মাহ্‌দী গালিব বাংলাদেশের একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ লেখক, যিনি ইসলামের গভীর তত্ত্ব ও আকিদার সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপনে দক্ষ। রংপুরে জন্মগ্রহণকারী এই লেখক শৈশব কাটিয়েছেন ঢাকায় এবং বর্তমানে চট্টগ্রামে কর্মজীবনে ব্যস্ত। তিনি ইতিহাসে স্নাতক ডিগ্রিধারী এবং বর্তমানে একজন গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন, যেখানে তাঁর চিন্তা, অনুসন্ধিৎসা এবং গবেষণাধর্মী মনোভাব প্রশংসনীয়।

মাহ্‌দী গালিবের পারিবারিক প্রেক্ষাপট আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানচর্চার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তাঁর পিতা মরহুম সুফি হিলাল উদ্দিন সরকার এবং পিতামহ হাজি রমজান উদ্দিন সরকারের জীবনাদর্শ তাঁর চিন্তা ও কর্মে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি খাদ্যরসিক এবং রান্না, খাওয়া ও অন্যদের খাওয়ানোর আনন্দে ভরপুর একজন মানুষ। তাঁর রাত্রিজাগরণের অভ্যাস এবং নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে এক ভিন্নতর জীবনদর্শন দিয়েছে।

মাহ্‌দী গালিব ইসলামি দর্শন এবং সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে একাধারে মৌলিক ও সৃষ্টিশীল। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে “পথিকৃৎ” এবং “অদ্বিতীয়” পাঠকসমাজে বিশেষ সমাদৃত। তিনি অনুবাদ, কবিতা এবং ইসলামি আকিদার সূক্ষ্ম ব্যাখ্যায় পারদর্শী। তাঁর লেখনীতে যুক্তি, সাহিত্যিক গুণাবলি এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সঠিক ব্যাখ্যা মিলে একটি নিখুঁত সমন্বয় সৃষ্টি করে।

লেখালেখির পাশাপাশি মাহ্‌দী গালিব একজন নিবেদিত ভ্রমণপ্রেমী। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ঘুরে দেখা ছাড়াও তিনি ভারতের উত্তরাঞ্চল এবং মদিনায় ভ্রমণ করেছেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তা ও লেখায় বৈচিত্র্য ও গভীরতা যোগ করেছে।

মাহ্‌দী গালিবের সাহিত্য ও গবেষণার মূল লক্ষ্য ইসলামের সঠিক জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্যভাবে পৌঁছে দেওয়া। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো পাঠকের চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে এবং আধ্যাত্মিকতা ও ঈমানের গভীরতা বাড়ায়। ইসলামের সঠিক ও সহজ-সরল ব্যাখ্যা উপস্থাপনে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

জীবনী সূত্র: পাঠ্যনগর
নবীনতর পূর্বতন