সাহিত্যনামা সম্পাদকীয়
'নিরল-অনন্য পথে ভেসে আসে সোহবত,
যিকরের আলোর মতো, নিঃশব্দ, অমোঘ।
নক্ষত্রের ছায়া হৃদয়ে এসে-
অন্তরের পৃষ্ঠায় লিখে দেয় সত্য; অমোঘ।'
বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে যখন বস্তুবাদী সভ্যতা মানুষের আত্মিক প্রশান্তি কেড়ে নিয়েছে এবং ধর্মের নামে উগ্রবাদ বিশ্বশান্তিকে হুমকির মুখে ফেলেছে, তখন যে কজন আধ্যাত্মিক রাহবার বা পথপ্রদর্শক সত্য ও সুন্দরের মশাল হাতে বিশ্ববাসীকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মাওলানা শেখ মুহাম্মদ হিশাম কাব্বানী (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু) অন্যতম। তিনি একাধারে নকশবন্দি-হাক্কানি তরিকার অন্যতম প্রধান খলিফা, একজন প্রাজ্ঞ ইসলামি স্কলার, গবেষক এবং বিশ্বব্যাপী সুফিবাদের পুনর্জাগরণের অগ্রদূত। লেবাননের এক অভিজাত ও পণ্ডিত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মহান ব্যক্তিত্ব তাঁর পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার (প্রেম, সহনশীলতা এবং আত্মশুদ্ধির) বাণী প্রচারে। এই প্রবন্ধে আমরা তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শন, মাশায়েখদের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক, জ্ঞানগত অবদান এবং উগ্রবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আপোষহীন ভূমিকার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাঁর কর্ম এবং প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করব।
আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ও মাশায়েখদের সান্নিধ্য
শেখ হিশাম কাব্বানী (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু)-এর আধ্যাত্মিক জীবনের ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত। তাঁর শিরায় প্রবাহিত হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র রক্তধারা, ইমাম হাসান এবং ইমাম হুসেইন আলাহিমুসসালামের পবিত্র প্রভাব। তাঁর আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা পূর্ণতা লাভ করে নকশবন্দি তরিকার দুই মহান দিকপালের সান্নিধ্যে।
সুলতানুল আউলিয়া শেখ আব্দুল্লাহ ফায়েজ আদ্-দাগেস্তানি (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু):
শেখ হিশামের আধ্যাত্মিক যাত্রার মূল ভিত্তি রচিত হয় নকশবন্দি তরিকার গ্র্যান্ডশেখ, সুলতানুল আউলিয়া শায়খ আব্দুল্লাহ ফায়েজ আদ্-দাগেস্তানি (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। দামেস্কে শেখ আব্দুল্লাহর খানকায় তিনি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। শেখ আব্দুল্লাহ ছিলেন আধ্যাত্মিক জ্ঞানের এক মহাসাগর, যিনি শেখ হিশামকে ভবিষ্যতের কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। তিনি শেখ হিশামকে পাশ্চাত্যে হিজরত করার এবং সেখানে ইসলামের শান্তির বাণী পৌঁছে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী নির্দেশ দিয়েছিলেন। শেখ আব্দুল্লাহর সোহবতে থেকেই তিনি তাসাউফের গূঢ় রহস্য বা 'মারিফাত'-এর শিক্ষা লাভ করেন।
মাওলানা শায়খ নাজিম আদিল আল-হাক্কানি (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু):
শায়খ আব্দুল্লাহর ওফাতের পর, শায়খ হিশাম তাঁর শ্বশুর এবং আধ্যাত্মিক রাহবার, সুলতানুল আউলিয়া মাওলানা শেখ নাজিম আল-হাক্কানি (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু)-এর ছায়াতলে আসেন। শেখ নাজিম ছিলেন এই যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কুতুব। শেখ হিশাম তাঁর জীবনের ৪০ বছরেরও বেশি সময় শেখ নাজিম (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু)-এর খেদমতে এবং তাঁর নির্দেশ পালনে ব্যয় করেছেন। গুরুর প্রতি শিষ্যের ভক্তি বা 'ফানা ফিশ শায়খ'-এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন শেখ হিশাম। তিনি নিজেকে সর্বদা শেখ নাজিমের 'পায়ের ধুলো' মনে করতেন। শেখ নাজিম (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু) তাঁকে নিজের প্রতিনিধি বা 'ডেপুটি' হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং আমেরিকা ও ইউরোপে নকশবন্দি তরিকার প্রচারের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। শেখ হিশামের মাধ্যমেই পাশ্চাত্যের হাজার হাজার মানুষ মানবতা, সত্য, সৌন্দর্য, পবিত্র ইসলামের বাণীতে অবগাহন এবং আধ্যাত্মিকতার বলয়ে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন।
গবেষণা, জ্ঞানসাধনা, লেখালেখি এবং বক্তব্য
অনেকে শেখ হিশাম কাব্বানী (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু)-কে কেবল একজন সুফি সাধক হিসেবে জানেন, কিন্তু তিনি একজন উচ্চমার্গীয় অ্যাকাডেমিক স্কলারও। তিনি বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে রসায়নে স্নাতক এবং পরবর্তীতে দামেস্ক ও কায়রোর আল-আজহারের প্রখ্যাত আলেমদের কাছে ইসলামি শরিয়ত, হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। বিজ্ঞান ও ধর্মের এই অপূর্ব সমন্বয় তাঁর চিন্তাধারাকে আধুনিক মানুষের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তিনি বিশেষত নীতি-নির্ধারণী কেন্দ্র ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে অবস্থিত জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি (Georgetown University), জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি (George Washington University) এবং আমেরিকান ইউনিভার্সিটি (American University)-তে একাধিকবার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। এছাড়াও, তিনি পশ্চিম উপকূলের অন্যতম সেরা শিক্ষাকেন্দ্র ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে (UC Berkeley), ইউসিএলএ (UCLA) এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি (Stanford University)-তে বক্তব্য দিয়েছেন। উত্তর আমেরিকার অন্যান্য প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইয়েল ইউনিভার্সিটি (Yale University) এবং কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি (McGill University)। ইউরোপের ক্ষেত্রে, তিনি তাঁর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা নিয়ে হাজির হয়েছেন বিশ্বের প্রাচীনতম ও শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি (Oxford University) এবং কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি (Cambridge University)-তে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর প্রভাব দেখা যায় ইন্দোনেশিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ ইন্দোনেশিয়া-তেও, যেখানে তিনি মুসলিম বিশ্বে সুফিবাদের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
উল্লেখযোগ্য বই ও রচনাবলী:
শেখ হিশাম ইংরেজি ও আরবি ভাষায় অসংখ্য বই রচনা করেছেন, যা সমসাময়িক সুফি সাহিত্যে অমূল্য সংযোজন। তাঁর লেখাগুলো গতানুগতিক ওয়াজ-নসিহত নয়, বরং দালিলিক ও গবেষণালব্ধ।
The Naqshbandi Sufi Way: এই গ্রন্থে তিনি নকশবন্দি তরিকার ইতিহাস, সিলসিলা, আমল এবং আদবগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন, যা মুরিদদের জন্য এক অপরিহার্য গাইডবুক।
Encyclopedia of Islamic Doctrine and Beliefs: এটি তাঁর পাণ্ডিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই বিশাল গ্রন্থে তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা, মিলাদ, কিয়াম, অসিলা, তাবাররুক এবং আউলিয়াদের শান-মান নিয়ে বিরোধীদের (সালাফি/ওয়াহাবি) সকল প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।
Angels Unveiled: ফেরেশতাদের জগত ও অদৃশ্য বাস্তবতা নিয়ে একটি অনন্য আধ্যাত্মিক গ্রন্থ।
The Approach of Armageddon: শেষ জামানা বা কেয়ামতের আলামত এবং ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
The Hierarchy of Saints: আধ্যাত্মিক জগতে মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতিনিধি বা ওলিদের নানান রহস্য, দায়িত্ব এবং ভূমিকা নিয়ে লেখা।
The Prohibition of Domestic Violence: নারীদের পারিবারিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিক ফতওয়া বা নিষেধাজ্ঞা। মাওলানা এবং ড. হোমায়রা জিয়াদের যৌথভাবে লেখা এই বইটি আধুনিক মুসলিম বিশ্বের সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ফতোয়া যা নারী অধিকার আদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে।
তাঁর এই গবেষণাগুলো পাশ্চাত্যের পাঠকদের কাছে ইসলামের এক ভিন্ন রূপ তুলে ধরেছে, যা গোঁড়ামিমুক্ত, যুক্তিনির্ভর এবং আধ্যাত্মিক রসে সিক্ত।
আধ্যাত্মিকতা ও তাসাউফ দর্শন
শেখ হিশাম কাব্বানী (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু)-এর আধ্যাত্মিকতার মূল সুর হলো "ইশক" বা প্রেম। তিনি বিশ্বাস করতেন, আল্লাহকে কেবল ভয়ের মাধ্যমে নয়, বরং ভালোবাসার মাধ্যমে পেতে হবে। তাঁর মতে, মানুষের হৃদয়ে (ক্বালব) আল্লাহর জিকির এবং রাসুল (সা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা স্থাপন করাই হলো তাসাউফের মূল লক্ষ্য।
তিনি নকশবন্দি তরিকার মূল ১১টি নীতি—যার মধ্যে খিলওয়াত দার আনজুমান (জনসমাবেশে নির্জনতা), সফর দার ওয়াতান (নিজ সত্তার দিকে যাত্রা), এবং হোশ দার দাম (প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সচেতনতা) অন্যতম—সেগুলোকে আধুনিক ব্যস্ত মানুষের উপযোগী করে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন যে, আধ্যাত্মিকতা মানে সংসার ত্যাগ করে বৈরাগী হওয়া নয়, বরং দুনিয়ার কর্মব্যস্ততার মাঝে থেকেও আল্লাহকে স্মরণ করা। তাঁর সোহবত বা সাহচর্যে এসে বহু পথহারা মানুষ, বিশেষ করে পশ্চিমা যুবসমাজ, মাদক ও নাস্তিকতা ছেড়ে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে।
উগ্রবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে আপোষহীন ভূমিকা
শেখ হিশাম কাব্বানী (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু)-এর জীবনের অন্যতম বৈপ্লবিক দিক হলো ইসলামের নামে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাঁর সাহসী অবস্থান। নব্বইয়ের দশকেই তিনি মার্কিন সরকার এবং বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছিলেন যে, উগ্রবাদী মতবাদগুলো (বিশেষ করে ওয়াহাবিজম ও রাজনৈতিক ইসলাম) বিশ্বশান্তির জন্য বড় হুমকি।
ইসলামিক সুপ্রিম কাউন্সিল অফ আমেরিকা (ISCA):
তিনি আমেরিকায় 'ইসলামিক সুপ্রিম কাউন্সিল অফ আমেরিকা' প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি মার্কিন নীতিনির্ধারক এবং বিশ্বনেতাদের সামনে ইসলামের প্রকৃত, শান্তিপুর্ণ রূপ তুলে ধরেন। ৯/১১ হামলার পর যখন আমেরিকায় ইসলামোফোবিয়া চরমে, তখন শায়খ হিশাম ছিলেন ইসলামের পক্ষে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছেন যে, সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম নেই এবং সুফিবাদই হলো উগ্রবাদের একমাত্র কার্যকরী প্রতিষেধক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসলাম তরবারির মাধ্যমে নয়, বরং সুফিদের প্রেম, চরিত্র এবং আচরণের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করেছে। তাঁর এই সত্য উচ্চারণের কারণে তিনি বহুবার কট্টরপন্হীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন, তবুও তিনি সত্য বলা থেকে এক চুলও নড়েননি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শায়খ হিশাম ও নকশবন্দি তরিকা
বাংলাদেশ পীর-আউলিয়া ও সুফি-সাধকদের উর্বর ভূমি। এ দেশের মানুষের ডিএনএ-তে মিশে আছে সুফিবাদের প্রভাব। শেখ হিশাম কাব্বানী (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু) এবং নকশবন্দি-হাক্কানি তরিকা বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক অঙ্গনে এক গভীর ও ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে। এদেশের হাজার হাজার মানুষ তাঁকে দেখে কিংবা না দেখে প্রভাবিত হয়েছে। তাঁর চিন্তা, কর্ম, রুহানিয়াত দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছে। তাঁর প্রথম পবিত্র ওরস মোবারকেই এর প্রমাণ মেলে। ঢাকা এবং চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত ওরস মাহফিলে বিভিন্ন তরিকা, দরবার এবং আদর্শের তরুণ থেকে বৃদ্ধ, সকলেই মিলিত হন, আলোচনায় অংশ নেন। তাঁর প্রভাব শুধু মুরিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং, অন্যান্য তরিকার অনুসারী, ভক্তরাও তাঁকে শ্রদ্ধা করেন, স্মরণ করেন।
সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগ:
বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবতই রাসুলপ্রেমী এবং আউলিয়াপ্রেমী। শেখ হিশাম কাব্বানীর নূরানি চেহারা মোবারক, বক্তব্য, বই, লেখনীসমূহ হাজার মানুষকে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করেছে। তাঁর বয়ানসমূহ বাংলাদেশে আবহমান ঐতিহাসিক আমলগুলো যেমন, মিলাদ-কিয়াম, জিকির এবং আউলিয়াদের মাজার জিয়ারতকে পুনরুজ্জীবিত করতে উৎসাহ জুগিয়েছে। এদেশের মানুষ দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁর দুনিয়াবি সাক্ষাৎ (স্বশরীরের সাক্ষাৎ) না পেলেও রুহানিয়াত, ইশক আর মোহব্বতের বরকতে তাঁর রুহানি সাক্ষাৎ, দিকনির্দেশনা এবং নজর পেয়েছে এবং পাচ্ছে।
উগ্রবাদের মোকাবেলায় দিকনির্দেশনা:
নাইন ইলেভেনের পর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন জঙ্গিবাদের উত্থান এবং ধর্মের অপব্যাখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছিল, তখন শেখ হিশামের দর্শন সমগ্র বিশ্বের 'মুসলিম', শান্তিকামী এবং সুফি ভাবধারার মানুষের জন্য এক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। তিনি শিখিয়েছেন যে, বোমা মেরে বা মানুষ হত্যা করে জান্নাতে যাওয়া যায় না, বরং জান্নাতের পথ হলো আত্মশুদ্ধি ও মানবতার সেবা। আমরা জানি যে, উগ্রবাদিতা এখনও বিদ্যমান, এই সমস্যা সমাধানে মওলানার আদর্শ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। তাই, তাঁর অনুসারীরা গোপনে বা প্রকাশ্যে বাংলাদেশে বিভিন্ন খানকা ও জাবিয়া প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে নিয়মিত 'খতমে খাজেগান', জিকির এবং মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়, যা সমাজে শান্তির বাতাস প্রবাহিত করছে।
মুসলিম উম্মাহর শক্তি বৃদ্ধি:
শেখ হিশাম কাব্বানী (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদাকে এবং সর্বোপরি মুসলিম উম্মাহর চেতনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রচলিত অন্যান্য সুফি তরিকাগুলোর সাথে নকশবন্দি-হাক্কানি তরিকার কোনো বিরোধ নেই, বরং এটি সেগুলোকে আরও সমৃদ্ধ ও সুসংহত করেছে। তাঁর বইপত্র এবং লেকচারগুলো এ দেশের শিক্ষিত যুবসমাজকে 'মডারেট' বা মধ্যপন্থী ইসলামের দিকে ধাবিত করছে।
শেখ মুহাম্মদ হিশাম কাব্বানী (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু) কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান এবং একটি যুগের প্রতিচ্ছবি। তিনি প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক সম্পদকে পাশ্চাত্যের যান্ত্রিক সভ্যতার সামনে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর জীবন আমাদেরকে শেখায় যে, আধুনিকতা, বিজ্ঞান এবং আধ্যাত্মিকতা পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক।
মাওলানা শেখ নাজিম (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু)-এর পর, নকশবন্দি তরিকার ফয়েজ ও বরকত বিতরণে শেখ হিশাম এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তাঁর বিনয়, ইলম, এবং রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর প্রতি অবিচলতা তাঁকে সমকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'মুর্শিদে কামেল' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আজকের এই সংঘাতময় বিশ্বে, যখন মানুষ মানসিক শান্তি খুঁজছে, তখন শেখ হিশাম কাব্বানী (কাদ্দাসাল্লাহু সিররুহু)-এর দেখানো পথ—ভালোবাসা, সেবা এবং আত্মশুদ্ধির পথ—আমাদের জন্য এক বাতিঘর। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য প্রয়োজন একটি পবিত্র হৃদয় এবং একজন কামেল মুর্শিদের নির্দেশনা। তাঁর অবদান এবং শিক্ষা আগামী প্রজন্মের জন্য এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই মহান ওলির ছায়ায় থাকার এবং তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

