ঈশ্বর মৃত: ফ্রেডরিক নিটশে এবং শূন্যতাবাদের সেই অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যদ্বাণী

সেই বিপজ্জনক দার্শনিক


বিশ্ব সাহিত্যের পাঠকদের কাছে ফ্রেডরিক নিটশে (Friedrich Nietzsche) কেবল একজন দার্শনিক নন, তিনি একটি ঝড়ের নাম। "ঈশ্বর মৃত" (God is dead)—তার এই একটি উক্তিই পশ্চিমা দর্শন, সাহিত্য ও মনোবিজ্ঞানের ভিত্তি নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। তাকে ভুল বোঝার তালিকাটিও বেশ দীর্ঘ। অনেকেই তাকে উগ্র, অহংকারী এবং নাস্তিক্যবাদের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে দেখেন।

কিন্তু "সাহিত্যনামা"-এর আজকের লেখায় আমরা নিটশেকে ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখব। আমরা প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করব, নিটশে কি সত্যিই 'নায়ালিজম' বা শূন্যতাবাদের (Nihilism) প্রচারক ছিলেন? এর পেছনে অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন সম্রাট, যিনি সামাজিক মাধ্যমে দর্শনশাস্ত্র নিয়ে ব্যাখ্যামূলক এবং বিশ্লেষণমূলক কন্টেন্ট তৈরি করেন এবং আমাদেরকে নতুনভাবে চিন্তা করতে শেখান।

সত্যি বলতে, নিটশে শূন্যতাবাদের প্রবর্তক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এর সবচেয়ে বড় ভবিষ্যদ্বক্তা। তিনি এই শূন্যতাবাদ চাননি; বরং তিনি গভীর হতাশা ও আতঙ্কের সাথে এর অবশ্যম্ভাবী আগমনকে দেখেছিলেন এবং মানবজাতিকে এর থেকে উত্তরণের পথ দেখানোর জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন।

হাতুড়ি হাতে সেই একাকী মানুষ: নিটশের জীবন

১৮৪৪ সালে প্রুশিয়ার এক ধর্মযাজক পরিবারে নিটশের জন্ম। বিস্ময়কর প্রতিভাধর নিটশে মাত্র ২৪ বছর বয়সে সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসিক্যাল ফিলোলজির (ভাষাতত্ত্ব) অধ্যাপক নিযুক্ত হন, যা ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কিন্তু অ্যাকাডেমিক জীবন তাকে বেশিদিন আকর্ষণ করতে পারেনি। তার দর্শন ছিল প্রথাবিরোধী, যা গতানুগতিক বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর সাথে বেমানান।

সংগীতজ্ঞ রিচার্ড ওয়াগনারের সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব ও পরবর্তীকালের তিক্ত বিচ্ছেদ, ল্যু সালোমে-এর সাথে তার জটিল দার্শনিক প্রেম, এবং সর্বোপরি—তার দর্শনের প্রতি সমকালীন সমাজের চরম উদাসীনতা তাকে ক্রমশ একাকী করে তোলে। তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে অধ্যাপনা ছেড়ে দেন এবং পরবর্তী দশকগুলো ইউরোপের বিভিন্ন শহরে এক ভ্রাম্যমাণ, নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। এই সময়েই তিনি তার শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো সম্পন্ন করেন।

১৮৮৯ সালে, মাত্র ৪৪ বছর বয়সে, তুরিনের রাস্তায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। জীবনের শেষ ১১ বছর তিনি সম্পূর্ণ নির্বাক ও মানসিক বিকারগ্রস্ত অবস্থায় কাটান। ১৯০০ সালে এই "হাতুড়ি হাতে" দার্শনিক পৃথিবী ত্যাগ করেন।

নিটশের দর্শন: শূন্যতার মুখোমুখি

নিটশের দর্শনের মূল ভিত্তি বুঝতে হলে তার "ঈশ্বর মৃত" উক্তিটির গভীরে যেতে হবে।

১. ঈশ্বর মৃত (God is dead) এবং শূন্যতাবাদের (Nihilism) আগমন: নিটশে যখন বলেন "ঈশ্বর মৃত", তিনি আক্ষরিক অর্থে কোনো ঈশ্বরের মৃত্যুর কথা বলেননি। তিনি একটি সাংস্কৃতিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন। তার মতে, ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং জ্ঞানদীপ্তির (Enlightenment) ফলে বিজ্ঞান ও যুক্তির যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছে, তা পশ্চিমা সভ্যতার নৈতিকতার ভিত্তিকেই (অর্থাৎ, খ্রিস্টধর্ম) ধ্বংস করে দিয়েছে।

তিনি বলতে চেয়েছেন, আমরা আমাদের বিশ্বাস ও নৈতিকতার যে স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে ছিলাম, তাকে আমরা নিজেরাই হত্যা করেছি। কিন্তু আমরা এখনও এর পরিণতির জন্য প্রস্তুত নই।

২. শূন্যতাবাদের ভবিষ্যদ্বাণী (The Prophecy): এখান থেকেই আপনার অনুরোধ করা সেই মূল ফ্রেমিং-এর শুরু। নিটশে হতাশার সাথে দেখলেন যে, ঈশ্বরের মৃত্যুর পর একটি বিশাল শূন্যস্থান (Void) তৈরি হয়েছে। মানুষ শত শত বছর ধরে যে মূল্যবোধ (Values) আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিল (যেমন: ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য), তার ভিত্তি সরে গেছে।

এর ফলে যা আসবে, নিটশে তার নাম দিলেন 'নায়ালিজম' বা শূন্যতাবাদ। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে কোনো কিছুরই আর কোনো চূড়ান্ত অর্থ থাকে না, কোনো নৈতিকতার ভিত্তি থাকে না, এবং জীবন অর্থহীন হয়ে পড়ে।

নিটশে নিজে এই শূন্যতাবাদ চাননি। তিনি একে একটি ভয়াবহ "রোগ" হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি আতঙ্কিত ছিলেন যে, এই শূন্যতার যুগে মানুষ হয় চরম হতাশায় নিমজ্জিত হবে, অথবা এই শূন্যস্থান পূরণ করতে গিয়ে আরও ভয়ঙ্কর কোনো নতুন 'ঈশ্বরের' (যেমন: উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ বা সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্র) জন্ম দেবে। (বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস তার এই আতঙ্ককে সত্য প্রমাণ করেছিল)।

৩. উত্তরণের পথ: অতিমানব (Übermensch) ও শক্তির সদিচ্ছা (Will to Power): নিটশে শুধু সমস্যা চিহ্নিত করেই থামেননি, তিনি উত্তরণের পথও দেখিয়েছেন। তার দর্শন হতাশার নয়, বরং চূড়ান্ত জীবন-affirming বা জীবনকে গ্রহণ করার দর্শন।

  • অতিমানব (Übermensch বা Overman): শূন্যতাবাদের যুগে সাধারণ মানুষ (যাকে তিনি 'Herd' বা 'পাল' বলেছেন) দিশেহারা হয়ে পড়বে। কিন্তু নিটশে এমন এক মানুষের কল্পনা করেছেন, যে এই শূন্যতাকে ভয় পাবে না। সে ঈশ্বরের বা সমাজের চাপিয়ে দেওয়া 'ভালো-মন্দ' (যাকে তিনি 'Slave Morality' বলেছেন) গ্রহণ করবে না। বরং সে নিজের মূল্যবোধ নিজে তৈরি করবে। এই 'অতিমানব' হলো সৃজনশীল, আত্ম-নির্ভরশীল এবং জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্টকে আলিঙ্গন করার ক্ষমতাবান এক সত্তা। সে প্রচলিত নৈতিকতার "উর্ধ্বে" (Beyond Good and Evil) বিচরণ করে।

  • শক্তির সদিচ্ছা (Will to Power): নিটশের মতে, বেঁচে থাকার মূল চালিকাশক্তি আত্মরক্ষা নয়, বরং 'Will to Power' বা শক্তির সদিচ্ছা। এটি আধিপত্য বা ক্ষমতার লোভ নয়, বরং এটি হলো নিজের ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ স্তরে বিকশিত করার, সৃজনশীল হওয়ার, এবং নিজের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব ("Self-mastery") অর্জনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা।

নিটশের বইয়ের জগৎ (সংক্ষিপ্ত পরিচিতি)

নিটশের দর্শন বুঝতে হলে তার মূল বইগুলোর সাথে পরিচিত হওয়া জরুরি। তার লেখনী প্রথাগত দর্শনের মতো শুষ্ক নয়, বরং কাব্যিক, রূপকধর্মী এবং তীব্র।

  • Thus Spoke Zarathustra (জরথুস্ট্রু এইভাবেই বলিয়াছিলেন): তার সবচেয়ে বিখ্যাত ও কাব্যিক গ্রন্থ। এই বইতেই তিনি 'অতিমানব', 'ঈশ্বরের মৃত্যু' এবং 'শাশ্বত প্রত্যাবর্তন' (Eternal Recurrence) ধারণাগুলো রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেন।

  • Beyond Good and Evil (ভালো-মন্দের ঊর্ধ্বে): প্রচলিত নৈতিকতার কঠোর সমালোচনা। এখানে তিনি 'প্রভু-নৈতিকতা' ও 'দাস-নৈতিকতা'-এর পার্থক্য দেখান।

  • The Genealogy of Morals (নৈতিকতার বংশলতিকা): 'ভালো' এবং 'মন্দ' ধারণাগুলো ঐতিহাসিকভাবে কীভাবে তৈরি হয়েছে, তার একটি বিশ্লেষণ।

  • The Gay Science (আনন্দময় বিজ্ঞান): এই বইতেই প্রথম "ঈশ্বর মৃত" উক্তিটি পাওয়া যায়।

  • Twilight of the Idols (মূর্তিপূজার অবসান): তার শেষ দিকের কাজ, যেখানে তিনি "হাতুড়ি দিয়ে দর্শন" করেছেন—অর্থাৎ সমকালীন সংস্কৃতির ফাঁপা 'আইডল' বা প্রতিমাগুলোকে ভেঙেছেন।

উপসংহার: কেন নিটশে আজও প্রাসঙ্গিক?

নিটশে যে শূন্যতাবাদের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আমরা আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে সেই শূন্যতাবাদের যুগেই বাস করছি। উত্তর-আধুনিক বিশ্বে (Post-modernism) আমরা প্রতিনিয়ত অর্থহীনতা, বিচ্ছিন্নতা এবং মূল্যবোধের সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি।

নিটশে আমাদের এই সংকটের জন্যই প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো অর্থ বা মূল্যবোধ নয়, বরং জীবনের অর্থ নিজেদেরই সৃষ্টি করতে হয়। "সাহিত্যনামা"-এর পাঠকদের জন্য নিটশে তাই কোনো সমাপ্তি নন, তিনি এক নতুন সূচনার নাম। তিনি আমাদের প্রশ্ন করতে শেখান, ঝুঁকি নিতে শেখান এবং সর্বোপরি, নিজের জীবনের শিল্পী হতে শেখান।

নবীনতর পূর্বতন