রবীন্দ্রনাথ: ঐতিহাসিক বিতর্ক ও সত্যানুসন্ধান

সাহিত্যনামা সম্পাদকীয়

ইতিহাস যখন অজ্ঞতা কিংবা সংকীর্ণ রাজনৈতিক প্রচারণার শিকল পরে, তখন মহামানবদের সত্য আড়ালে চলে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির শীর্ষ পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে কবিগুরুকে সংকীর্ণ কাঠামোর ভেতর ফেলে দেওয়ার এক অপচেষ্টা চলছে। অথচ তথ্যপ্রমাণ ও নিবিড় গবেষণার আলোকে তাকালে তাঁর জীবনের ভিন্ন এক চিত্র দেখা যায়। সেখানে তিনি কেবল একজন কবি নন। তিনি একজন সমাজসংস্কারক, প্রজাদরদি অভিভাবক এবং উদার বহুত্ববাদের প্রতীক।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অপপ্রচারের ঐতিহাসিক অবসান

ইদানীং কিছু মানুষ দাবি করেন রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। এই দাবি সর্বৈব মিথ্যা। এটি একটি ভিত্তিহীন কল্পকাহিনি ছাড়া কিছু নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা এসেছিল ১৯১২ সালে। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের ঢাকা সফরের পর এই উদ্যোগ চূড়ান্ত রূপ পায়। এর বিরোধিতা করে ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে কোনো এক প্রতিবাদ সভা হয়েছিল বলে অভিযোগ তোলা হয়। অনেকে দাবি করেন সেই সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন বা উপস্থিত ছিলেন। অথচ ঐতিহাসিক দলিল এই দাবির সম্পূর্ণ অসাড়তা প্রমাণ করে।

রবীন্দ্রজীবনী ও সমকালীন দিনলিপি অনুযায়ী ১৯১২ সালের ১৯ মার্চ কবিগুরুর ইংল্যান্ড যাত্রার কথা ছিল। শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেই যাত্রা স্থগিত হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রামের জন্য তিনি ২৪ মার্চ শিলাইদহে চলে যান। তিনি শিলাইদহ অবস্থান করেন ১২ এপ্রিল পর্যন্ত। অর্থাৎ ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ তিনি কলকাতায় ছিলেনই না। তিনি তখন অবস্থান করছিলেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহের পদ্মাবক্ষে। সেখানে বসে তিনি তাঁর ‘গীতিমাল্য’ কাব্যগ্রন্থের বেশ কয়েকটি গান রচনা করেছিলেন।

ইতিহাসবিদ অমলেন্দু দে, রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এবং আধুনিক গবেষক কুলদা রায় এই বিভ্রান্তি তথ্য দিয়ে খণ্ডন করেছেন। এমনকি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বাজেট ভাগাভাগির শঙ্কায় প্রাথমিক আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিছু রাজনীতিকও আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কোনো লিখিত প্রবন্ধ, চিঠি কিংবা মৌখিক বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে একটি বাক্যও পাওয়া যায় না।

পরবর্তীকালে ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় আসেন। তিনি কার্জন হলে বক্তৃতা দেন। জগন্নাথ হল ও মুসলিম হলে সংবর্ধনা গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরম শুভাকাঙ্ক্ষী। ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পূর্তিতে কবিগুরুকে সম্মানসূচক ডি লিট উপাধিতে ভূষিত করা হয়। যে মানুষটি প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতাই করেননি, তাঁর নামে এমন অপপ্রচার ইতিহাসের চরম বিকৃতি।

প্রজাদরদি মন ও জমিদারি সেবায় নিঃস্বার্থ আত্মনিয়োগ

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আরেকটি বিতর্ক ছড়ানো হয় তাঁর জমিদারি পরিচালনা নিয়ে। অভিযোগ করা হয় তিনি প্রজাদের শোষণ করেছেন। অথচ ঐতিহাসিক সত্য সম্পূর্ণ বিপরীত। উনিশ শতকের নিষ্ঠুর সামন্তপ্রথার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এক অনন্য ব্যতিক্রমী ভূস্বামী।

১৮৯০ সালের পর থেকে পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরে জমিদারি তদারকির দায়িত্ব নিয়ে তিনি পল্লী উন্নয়নের মূল সত্য উপলব্ধি করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা না করলে সমাজ বাঁচবে না। এই উপলব্ধি থেকে তিনি ১৯০৫ সালে নওগাঁর পতিসরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পতিসর কৃষি ব্যাংক’। এটি ছিল উপমহাদেশের প্রথম গ্রামীণ সমবায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি পথিকৃৎ রূপ।

১৯১৩ সালে তিনি গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পান। সেই পুরস্কারের সিংহভাগ অর্থ তিনি নিজের বিলাসে ব্যয় করেননি। তিনি নোবেল পুরস্কারের প্রায় এক লাখ আট হাজার টাকা পতিসর কৃষি ব্যাংকে মূলধন হিসেবে জমা দেন। লক্ষ্য ছিল প্রজারা যেন নামমাত্র সুদে ঋণ পায় এবং স্বাবলম্বী হতে পারে। পরবর্তী সময়ে বহু অর্থ অনাদায়ী থেকে গেলেও তিনি তা জোরপূর্বক আদায় করেননি।

শুধু তাই নয়। তিনি জমিদারির এলাকাগুলোতে দাতব্য চিকিৎসালয় গড়ে তুলেছিলেন। প্রজাদের ঘরে ঘরে পাঠশালা ও নাইট স্কুল খুলে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন। নিজ পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বন্ধুপুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠান আধুনিক কৃষি ও পশুপালন বিদ্যা শেখার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল তাঁরা ফিরে এসে পূর্ববঙ্গের কৃষকদের আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ও ট্রাক্টরের ব্যবহার শেখাবেন। পতিসরে তিনি সালিশি ব্যবস্থা প্রবর্তন করে প্রজাদের নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধানের অধিকার দিয়েছিলেন। তাঁর পুরো জমিদারি ছিল শোষণ নয়, সমাজসেবা ও আত্মশক্তির অনন্য পাঠশালা।

বাংলাদেশ শব্দটির প্রথম প্রবক্তা

আজ আমরা যে সার্বভৌম রাষ্ট্র নিয়ে গর্ব করি, সেই ‘বাংলাদেশ’ শব্দটির রাজনৈতিক ও নান্দনিক ব্যবহারে রবীন্দ্রনাথের অবদান অবিস্মরণীয়। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি এই অঞ্চলের ভূখণ্ডগত আত্মাকে এক সূত্রে বাঁধেন।

তিনি রচনা করেন দেশাত্মবোধক গান। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি’ গানে স্পষ্ট উচ্চারিত হয় এই শব্দটি। তাঁর লেখা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ আজ স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। মানচিত্রের এই ভূখণ্ডকে তিনি ভালোবেসে ‘বাংলাদেশ’ নামে হৃদয়গ্রাহী পরিচয় দান করেছিলেন।

ধর্মীয় পরিচয়: রবীন্দ্রনাথ সনাতন হিন্দু ছিলেন না

রবীন্দ্রনাথের ধর্ম নিয়ে অনেক অগভীর ধারণা রয়েছে। অনেকে তাঁকে সনাতন বা পৌত্তলিক হিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করেন। এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। বংশপরম্পরায় ঠাকুর পরিবার হিন্দু রীতিনীতির বাইরে গিয়ে একত্ববাদী ব্রাহ্ম মতাদর্শ গ্রহণ করেছিল।

রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ‘মহর্ষি’ উপাধিতে ভূষিত ব্রাহ্মধর্মের অন্যতম প্রাণপুরুষ। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ছিলেন একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মসমাজের সদস্য। তিনি মূর্তিপূজার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন নিরাকার পরমব্রহ্মের উপাসনায়। তাঁর ভাবনায় ঈশ্বর কোনো মন্দিরে সীমাবদ্ধ নন। তিনি মানুষের কর্মে ও সেবায় বিরাজমান।

তাঁর বিখ্যাত কবিতায় তিনি লিখেছেন, ভজন পূজন সাধন আরাধনা সমস্ত থাক। তিনি দেবতাকে খুঁজেছেন রৌদ্রে ও ঝড়ে মেঠো পথে মাটি ভাঙা কৃষকের মাঝে। মানবধর্মই ছিল তাঁর চূড়ান্ত ধর্ম। তাই কোনো নির্দিষ্ট সাম্প্রদায়িক লেবেলে তাঁকে বন্দি করা ইতিহাসসম্মত নয়।

সুফি সাধনা, ফারসি কাব্য ও ইসলামপ্রেম

রবীন্দ্রনাথের রক্তে ও মননে ইসলামি সংস্কৃতির সুউচ্চ প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিদিন ফারসি কবি হাফিজের দিওয়ান পাঠ করতেন। গভীর রাতে হাফিজের গজল আবৃত্তি ছিল তাঁদের ঠাকুরবাড়ির নিত্যদিনের দৃশ্য। সেই আধ্যাত্মিক সুবাস রবীন্দ্রনাথ শৈশব থেকেই গ্রহণ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ নিজে ফারসি কাব্যের গভীর ভক্ত ছিলেন। তিনি মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি, শেখ সাদি ও হাফিজের মরমি দর্শনে গভীরভাবে আলোড়িত হন। ১৯৩২ সালে পারস্যের শাহ রেজা শাহ পাহলভির রাজকীয় আমন্ত্রণে তিনি ইরান সফর করেন। তিনি শিরাজে গিয়ে হাফিজ ও সাদির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। হাফিজের সমাধিপাশে বসে কবিগুরু গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়েছিলেন।

ইসলাম ধর্ম ও এর উদার মানবিক আদর্শের প্রতি কবিগুরুর ছিল অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। তিনি পবিত্র কোরআনের একেশ্বরবাদের গভীর প্রশংসা করেছেন। হযরত মুহাম্মদ সা এর জীবন ও আদর্শ তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯৩৩ সালের ২৬ নভেম্বর বোম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত ‘পয়গম্বর দিবস’ উপলক্ষে তিনি একটি ঐতিহাসিক বাণী পাঠান। সেই বাণীতে তিনি উল্লেখ করেন, যিনি বিশ্বের মহত্তমদের অন্যতম, সেই পবিত্র পয়গম্বর হজরত মহম্মদের উদ্দেশে তিনি অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি লিখেন, হজরত মুহাম্মদ মানুষের ইতিহাসে নতুন ও সম্ভাবনাময় জীবনীশক্তির সঞ্চার করেছিলেন।

১৯৩৪ সালে আকাশবাণীতে প্রচারিত আরেক বাণীতে তিনি ইসলামকে পৃথিবীর অন্যতম মহৎ ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ১৯৩৬ সালে দিল্লির ‘দ্য পেশওয়া’ পত্রিকার নবী সংখ্যাতেও তিনি রাসুলুল্লাহ সা এর শানে শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখিত বাণী পাঠান। তাঁর একাধিক প্রবন্ধ ও গল্পে মুসলিম সংস্কৃতির উদার ও জীবন্ত চরিত্র বারবার ফুটে উঠেছে।

উপসংহার

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কোনো ভৌগোলিক গণ্ডি বা ধর্মীয় সংকীর্ণতায় বন্দি না হওয়া এক বিশ্বনাগরিক। তাঁর বিরোধিতা, তাঁর বিরুদ্ধে আনা পক্ষপাতিত্ব কিংবা বিদ্বেষমূলক প্রচারণা মূলত অজ্ঞতা ও অপব্যাখ্যার ফসল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অপপ্রচার হোক কিংবা জমিদারি শোষণের অপবাদ, ইতিহাসের তথ্যপ্রমাণ প্রতিটি অভিযোগের পর্দা উন্মোচন করে দেয়। তিনি পূর্ববঙ্গের মাটিকে ভালোবেসেছিলেন। তিনি প্রজাদের জন্য নোবেল পুরস্কারের অর্থ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি একেশ্বরবাদী সুফি ভাবনা ও রাসুলপ্রেমের উদার বাণী নিজের অন্তরে লালন করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বাঙালির মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার বিকাশ অসম্ভব। তাঁর সাহিত্য, তাঁর জীবনদর্শন এবং তাঁর সমাজসংস্কার আজও আমাদের সামনে এক আলোকিত আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে। সত্যের আলোয় সেই মহাজীবনের পুনর্মূল্যায়নই বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি।
নবীনতর পূর্বতন