মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি: লালন সাঁইয়ের প্রয়াণ দিবসে তাঁর জীবনাদর্শ ও দর্শন


কার্তিকের পহেলা তারিখ বা ১৭ অক্টোবর বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় কালীগঙ্গা নদীর তীরে কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে তাঁর আখড়াবাড়ি। একশো বছরেরও বেশি সময় আগে দেহত্যাগ করলেও, বাংলার ভাবজগতে ও সাধারণ মানুষের মননে লালন সাঁই আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেও কেবল আত্মানুসন্ধান আর মানবপ্রেমের মধ্য দিয়ে তিনি যে দর্শনের জন্ম দিয়েছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যের ও চিন্তাজগতের এক অমূল্য সম্পদ।

জাতপাতহীন সমাজ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা

লালন সাঁইজির পুরো জীবনটাই ছিল সামাজিক ভেদাভেদ আর গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক নীরব বিপ্লব। শৈশবে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে কালীগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা লালনকে উদ্ধার করেছিলেন মলম কারিকর ও তাঁর স্ত্রী মতিজান বিবি। সেই থেকেই তিনি হিন্দু না মুসলমান, এই প্রশ্ন বারবার তাঁকে বিদ্ধ করেছে। তৎকালীন সমাজের উঁচুনিচু ভেদাভেদ এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে তিনি তাঁর গানের ভাষায় সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। ফকির লালন সাঁই তাঁর একটি বিখ্যাত গানে জাতপাতের এই অসারতাকে তুলে ধরেছেন এভাবে:

সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে। লালন কয় জেতের কী রূপ, দেখলাম না এ নজরে।।

এই গানের মূল কথা হলো মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর প্রক্রিয়ায় কোনো জাতের চিহ্ন থাকে না, তবুও পৃথিবীতে আসার পর মানুষ নিজেই কৃত্রিম দেয়াল তৈরি করে। জাতপাত ও বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে এটি তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ।

দেহতত্ত্ব ও আত্মানুসন্ধান

লালন দর্শনের মূল ভিত্তি হলো দেহতত্ত্ব এবং আত্মতত্ত্ব। তাঁর মতে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব রহস্য লুকিয়ে আছে মানুষের এই ক্ষুদ্র দেহের ভেতরেই, যাকে তিনি বলেছেন ভান্ড। তাই স্রষ্টাকে খুঁজতে বনেবাদাড়ে বা তীর্থে না ঘুরে নিজের ভেতরেই অনুসন্ধান করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। লালন সাঁইয়ের কণ্ঠে সেই আত্মানুসন্ধানের বাণী:

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়। তারে ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়।।

এখানে খাঁচা বলতে মানবদেহ এবং অচিন পাখি বলতে প্রাণবায়ু বা পরমাত্মাকে বোঝানো হয়েছে। দেহের ভেতরে থেকেও যে সত্তা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, তাকে চেনার এবং জানার আকুতিই এই গানের মূল উপজীব্য।

আবার আত্মপরিচয়ের সংকট ও স্রষ্টার সাথে জীবের দূরত্বের কথা বলতে গিয়ে তিনি ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ গানে বুঝিয়েছেন যে পরমাত্মা আমাদের অতি কাছেই বাস করেন, অথচ অজ্ঞতার কারণে আমরা তাঁকে দেখতে পাই না।

মানবতাবাদ ও মনের মানুষের সন্ধান

সাঁইজির দর্শনের চূড়ান্ত কথা হলো মানুষ। সব মতবাদ, শাস্ত্র এবং আচারের ঊর্ধ্বে তিনি স্থান দিয়েছেন মানুষকে। তাঁর কাছে রক্তমাংসের মানুষই হলো স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ রূপ। মানুষকে ভালোবাসলে এবং মানুষের সেবা করলেই পরম সত্যকে পাওয়া সম্ভব। লালন সাঁইয়ের কালজয়ী বাণী:

মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষের সনে।।

এই গানে তিনি পরম কাঙ্ক্ষিত সেই সত্তার সাথে মিলনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন, যাকে তিনি ‘মনের মানুষ’ বলে ডেকেছেন। একইভাবে ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ গানে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে মানুষকে বাদ দিয়ে কোনো সাধনাই পূর্ণতা পায় না; খাঁটি মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা নিহিত। (সাঁইজির এই গানগুলোর সম্পূর্ণ কথা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা গুগলে সার্চ করে সহজেই খুঁজে পেতে পারেন।)

ফকির লালন শাহ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বা গোত্রের ছিলেন না, তিনি ছিলেন সব মানুষের। ক্ষমতা, অহংকার ও বিভেদের বিপরীতে তিনি বিনয় এবং সাম্যের জয়গান গেয়েছেন। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে দাঁড়িয়ে, অসহিষ্ণু ও বিভক্ত এই পৃথিবীতে লালনের মানবতাবাদী দর্শন আমাদের নতুন করে পথ দেখাতে পারে। মানুষের মাঝে যেদিন মানুষ আপন ঠিকানা খুঁজে পাবে, সেদিনই সাঁইজির দেখানো পথ সার্থক হয়ে উঠবে।

নবীনতর পূর্বতন