চিকিৎসাবিজ্ঞানের চোখে বন্ধ্যাত্ব ও লোমের মিথ
সাম্প্রতিক সময়ে একজন বাংলাদেশি ভেটেরিনারি চিকিৎসক দাবি করেছেন যে আমরা যেভাবে (কোলে নিয়ে বা কাছাকাছি রেখে) বিড়াল পালন করি তা 'আনসায়েন্টিফিক'। তিনি বিড়াল পালনের সাথে নারীদের 'বন্ধ্যাত্ব'কেও ফ্রেমিং করেছেন।
মানবদেহে প্রজনন অক্ষমতা বা সন্তান ধারণে জটিলতা তৈরি হয় অত্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু শারীরবৃত্তীয় কারণে। আধুনিক ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগবিজ্ঞান (Gynecology) অনুযায়ী, নারী বা পুরুষের বন্ধ্যাত্বের জন্য মূলত পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (PCOS), এন্ডোমেট্রিওসিস, ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ হয়ে যাওয়া, ডিম্বস্ফোটন (Ovulation) ব্যাধি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা কিংবা পুরুষের শুক্রাণুর গুণগত ও সংখ্যাগত হ্রাস দায়ী।
বিড়ালের লোম বা খুশকি (Dander)-তে এমন কোনো রাসায়নিক উপাদান বা হরমোনাল প্রভাবক নেই যা মানুষের জরায়ু, ডিম্বাশয় বা প্রজনন অঙ্গের কোনো ক্ষতি করতে পারে। বিড়ালের লোমে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বড়জোর অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা ধুলাবালি বা পরাগরেণুর অ্যালার্জির মতোই সাধারণ একটি ইমিউন রেসপন্স। লোমের সঙ্গে স্থায়ী বন্ধ্যাত্বের কোনো সংযোগ চিকিৎসাবিজ্ঞানে কখনোই পাওয়া যায়নি।
টক্সোপ্লাজমোসিস: পরজীবীবিদ্যা ও সংক্রমণের প্রকৃত সত্য
বিড়াল এবং গর্ভাবস্থার প্রসঙ্গ আসলেই যে রোগটির কথা বলা হয়, তা হলো টক্সোপ্লাজমোসিস। এটি মূলত Toxoplasma gondii নামক একটি এককোষী পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট সংক্রমণ। জীববিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ী বিড়াল এই পরজীবীর চূড়ান্ত পোষক (Definitive Host), কিন্তু এর মানে এই নয় যে প্রতিটি গৃহপালিত বিড়ালই জীবাণু বহন করে। বিড়াল কেবল তখনই এতে আক্রান্ত হয়, যখন সে সংক্রামিত কাঁচা মাংস খায় কিংবা বাইরে কোনো আক্রান্ত ইঁদুর বা পাখি শিকার করে খায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরজীবী বিড়ালের লোম, চামড়া বা লালায় থাকে না; এটি কেবল আক্রান্ত বিড়ালের মলের মাধ্যমে ওওসিস্ট (Oocyst) আকারে পরিবেশে নির্গত হয়। মল ত্যাগের পর সেই ওওসিস্ট সংক্রামক (Sporulated) হতে পরিবেশের আর্দ্রতায় কমপক্ষে ১ থেকে ৫ দিন সময় লাগে। ফলে যদি প্রতিদিন লিটার বক্স পরিষ্কার করা হয়, তবে সংক্রমণ ছড়ানোর কোনো সুযোগই থাকে না।
এপিডেমিওলজিক্যাল বা মহামারী সংক্রান্ত বৈশ্বিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষের টক্সোপ্লাজমোসিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রধানতম উৎস বিড়াল নয়; বরং অপর্যাপ্ত তাপে রান্না করা বা আধাসেদ্ধ মাংস খাওয়া, বাগান করার পর মাটিযুক্ত হাত ভালো করে না ধোয়া এবং কাঁচা শাকসবজি ঠিকমতো না ধুয়ে গ্রহণ করা। এছাড়া, এই পরজীবী কোনো নারীকে স্থায়ীভাবে বন্ধ্যা বানায় না। গর্ভধারণের পূর্বে কোনো নারী আক্রান্ত হলে তাঁর দেহে আজীবন প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি (IgG) তৈরি হয়, যা ভবিষ্যৎ ভ্রূণকে বরং সুরক্ষা দেয়। কেবল গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহে কোনো মা যদি প্রথমবারের মতো তীব্র সংক্রমণে (Acute Primary Infection) পড়েন, তখন গর্ভপাত বা ভ্রূণের ত্রুটির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যার জন্য প্রয়োজন চিকিৎসাভিত্তিক সতর্কতা, বিড়াল বর্জন নয়।
চিকিৎসা ও গবেষণায় বিড়ালের অবদান: ক্যান্সার থেকে অ্যান্টিভাইরাল
বিড়াল কেবল নিরীহ গৃহপালিত প্রাণী নয়, আধুনিক বায়োমেডিকেল গবেষণায় মানুষের পরম মিত্র। তুলনামূলক অনকোলজি (Comparative Oncology) শাখায় বিড়াল অত্যন্ত মূল্যবান অবদান রাখছে। বিড়ালের স্তন ক্যান্সার এবং মানুষের ট্রিপল-নেগেটিভ স্তন ক্যান্সারের আণবিক বিন্যাস ও জিনগত বৈশিষ্ট্যে গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। বিড়ালের ওপর পরিচালিত টিউমার থেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো মানুষের জন্য উন্নত ক্যান্সার ওষুধ উদ্ভাবনে পথ দেখাচ্ছে।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো কোভিড-১৯ এর ওষুধ। বিড়ালের মারাত্মক সংক্রামক রোগ 'ফেইলিন ইনফেকশাস পেরিটোনাইটিস' (FIP) চিকিৎসার জন্য আবিষ্কৃত প্রোড্রাগ (GS-441524) মানুষের কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত রেমডেসিভিরের মতো কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল উদ্ভাবনের মূল রসদ জুগিয়েছিল। এছাড়াও জীবপদার্থবিজ্ঞানে দেখা গেছে, বিড়ালের গলার গুড়গুড় শব্দ বা পার্লিং (Purr)-এর কম্পাঙ্ক (২০ থেকে ১৪০ হার্টজ) মানুষের পেশির ক্লান্তি উপশম ও হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। কার্ডিওভাসকুলার গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়াল পালনের ফলে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ কমে, যা স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস করে।
ধর্ম ও ঐতিহ্যে বিড়াল: পবিত্রতা ও স্নেহের প্রতীক
বিশ্বের প্রধান ধর্মগ্রন্থ ও ঐতিহ্যে বিড়ালকে ভালোবাসা, সহাবস্থান ও আশীর্বাদের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে:
ইসলাম ধর্ম: ইসলামে বিড়ালকে অত্যন্ত পরিষ্কার ও পবিত্র প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে বিড়াল অপবিত্র নয়, বরং এরা মানুষের আশপাশেই বিচরণকারী সঙ্গী। সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে সাখরের বিড়ালপ্রীতির কারণে তাঁকে রাসুলুল্লাহ (সা.) "আবু হুরায়রা" (বিড়ালছানার পিতা) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। বিড়ালকে কষ্ট দিয়ে অনাহারে হত্যার পরিণতি হিসেবে এক নারীর জাহান্নামী হওয়ার ঘটনা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
সনাতন ঐতিহ্য: হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে বিড়াল হলো দেবী ষষ্ঠীর বাহন। দেবী ষষ্ঠী মূলত সন্তান, মাতৃত্ব ও পরিবারের উর্বরতার দেবী। শাস্ত্রীয় সংস্কৃতিতে বিড়ালকে আঘাত করা পাপ এবং একে মাতৃত্ব সুরক্ষার অনুকূল প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্ম: বৌদ্ধ দর্শনের মূল শিক্ষা হলো সকল জীবের প্রতি অহিংসা (Ahimsa) ও করুণা। মঠের নীরব পরিবেশ ও পাণ্ডুলিপি রক্ষায় বিড়াল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিপালিত হয়েছে। খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে সেন্ট গার্ট্রুডকে বিড়ালদের পৃষ্ঠপোষক সাধ্বী ভাবা হয়, এবং ইহুদিদের তালমুদে বিড়ালের স্বভাবজাত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শিষ্টাচার শেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দার্শনিক সংকট ও মধ্যযুগীয় অজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি
ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অন্ধ কুসংস্কারের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। মধ্যযুগে ইউরোপে ধর্মীয় অজ্ঞতার কারণে বিড়ালকে শয়তানের সঙ্গী বা অশুভ শক্তির প্রতীক ভেবে ব্যাপক হারে হত্যা করা হয়। প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার কারণে কালো ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং সৃষ্টি হয় মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মহামারী 'ব্ল্যাক ডেথ' বা বিউবোনিক প্লেগ, যাতে ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারায়।
আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগে এসে একজন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার মুখ থেকে বিড়াল সম্পর্কে ভীতি ছড়ানো সেই মধ্যযুগীয় অন্ধবিশ্বাসেরই আধুনিক সংস্করণ। চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষকে সচেতনতা, স্বাস্থ্যবিধি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা (Risk Management) শেখায়; অমূলক আতঙ্ক বা জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ডাক দেয় না। পোষা প্রাণীকে নিয়মিত কৃমিনাশক দেওয়া, স্বাস্থ্যসম্মত সেদ্ধ খাবার দেওয়া এবং গর্ভবতী নারীদের লিটার বক্স পরিষ্কারে গ্লাভস পরা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের সাহায্য নেওয়াই হলো এর বিজ্ঞানসম্মত সমাধান। বিজ্ঞানকে ব্যক্তিগত অপছন্দ বা সংকীর্ণ স্বার্থের হাতিয়ার না বানিয়ে তথ্যের সঠিক উপস্থাপনই একজন পেশাজীবীর প্রধানতম দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র (References)
American College of Allergy, Asthma, and Immunology (ACAAI). (2022). Pet Allergies: Causes and Management.
American Veterinary Medical Association (AVMA). Toxoplasma gondii and Pet Safety Guidelines.
Centers for Disease Control and Prevention (CDC). (2024). Parasites - Toxoplasmosis (Toxoplasma infection): Prevention and Control.
Cook, A. J., et al. (2000). Sources of toxoplasma infection in pregnant women: European multicentre study. The Lancet, 356(9224), 128–134.
Pedersen, N. C., et al. (2019). Efficacy and safety of the nucleoside analog GS-441524 for treatment of cats with naturally occurring feline infectious peritonitis. Journal of Feline Medicine and Surgery, 21(4), 271–281.
Qureshi, A. I., et al. (2009). Cat ownership and the risk of fatal cardiovascular diseases. Results from the Second National Health and Nutrition Examination Survey Mortality Follow-up Study. Journal of Vascular and Interventional Neurology, 2(1), 132–135.
Schiffman, J. D., & Breen, M. (2015). Comparative oncology: What dogs and other species can teach us about humans with cancer. Philosophical Transactions of the Royal Society B: Biological Sciences, 370(1673), 20140231.
Sunan Abu Dawood (Hadith 75) & Jami` at-Tirmidhi (Hadith 92), Chapter on Purification.
Sahih al-Bukhari (Hadith 3482), Book of the Stories of the Prophets.
The Babylonian Talmud, Tractate Eruvin, Folio 100b.