যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কেন আইনে ব্যাচেলর বা অনার্স ডিগ্রি নেই?

 মো. রিদওয়ান আল হাসান
প্রতীকী চিত্র

বিশ্ব আইনি কাঠামো এবং বিচার ব্যবস্থার দিক থেকে অন্যতম প্রভাবশালী দুই দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে গুরুত্বপূর্ণ একটা চিত্র আমাদের সামনে চলে আসে। উত্তর আমেরিকার এই দুই দেশে উচ্চমাধ্যমিক শেষে সরাসরি কোনো ব্যাচেলর বা অনার্স ডিগ্রি নিয়ে আদালতে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। সেখানে আইন শিক্ষাকে কোনো প্রাথমিক আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

আমেরিকা এবং কানাডার প্রচলিত শিক্ষানীতিতে আইন হলো একটি বিশেষায়িত পেশাগত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি যাকে বলা হয় জুরিস ডক্টর বা সংক্ষেপে জেডি। একজন শিক্ষার্থীকে আদালতে লড়াই করার মতো প্রফেশনাল আইন ডিগ্রি অর্জন করতে হলে প্রথমে কলা, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা ফলিত বিজ্ঞানের যেকোনো মৌলিক শাখায় পূর্ণাঙ্গ স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করতে হয়। এই প্রথম ডিগ্রির সময়কালকে বলা হয় প্রি-ল পর্যায়। এটি মূলত শিক্ষার্থীকে মানসিক, দার্শনিক ও সমালোচনামূলক চিন্তার জায়গায় পরিণত করে তোলার এক প্রাতিষ্ঠানিক বুনিয়াদ।

প্রথম স্নাতক সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীদের বসতে হয় ল স্কুল অ্যাডমিশন কাউন্সিল পরিচালিত ল স্কুল অ্যাডমিশন টেস্ট নামের এক সূক্ষ্ম বিশ্লেষণমূলক পরীক্ষায়। সেখানে কোনো আইনের ধারা বা বিধান মুখস্থ লেখার সুযোগ থাকে না। যাচাই করা হয় প্রার্থীর যুক্তি খণ্ডন ক্ষমতা, জটিল পাঠোদ্ধার এবং বিশ্লেষণ দক্ষতা। এই ধাপে উত্তীর্ণ হয়ে হার্ভার্ড, ইয়েল, কলম্বিয়া, স্ট্যানফোর্ড, টরন্টো কিংবা ম্যাকগিলের মতো শীর্ষস্থানীয় ল স্কুলগুলোতে সুযোগ পেলে শুরু হয় তিন বছর মেয়াদি নিবিড় পেশাদার প্রশিক্ষণ। এই তিন বছর সফলভাবে শেষ করে জুরিস ডক্টর ডিগ্রি ও স্টেট বার পরীক্ষা পাসের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী আদালতে ওকালতি বা পরবর্তীসময়ে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অধিকার লাভ করেন।

সামাজিক বিজ্ঞানের প্রভাবশালী দার্শনিকদের দৃষ্টিতে আইনকে দেখলে বোঝা যায় যে কেবল আইনের ধারা মুখস্থ করে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসার তার বিখ্যাত প্রবন্ধ Ideology and Ideological State Apparatuses (1970) এ দেখিয়েছেন, আইন এবং আদালত হলো রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মতাদর্শিক ও দমনমূলক যন্ত্র। ইতালীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এন্তোনিও গ্রামসি তার Prison Notebooks (19291935) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, শাসকগোষ্ঠী কেবল জোরজবরদস্তি দিয়ে নয়, আইনের ভাষা ও নৈতিক সম্মতির আড়ালে সমাজে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। মিশেল ফুঁকোর Discipline and Punish: The Birth of the Prison (1975) গ্রন্থে জ্ঞান ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিষয়ক বয়ান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, আইনের প্রতিটি বিধান সমাজদেহে ক্ষমতা প্রয়োগের এক জটিল প্রযুক্তি। একই সুর পাওয়া যায় ফ্রাঞ্জ কাফকার অমর উপন্যাস The Trial (1925) , যেখানে তিনি দেখিয়েছেন মানবিক বোধ ও সামাজিক সংবেদনশীলতাহীন যান্ত্রিক আইন কীভাবে মানুষের ওপর চূড়ান্ত বিমূর্ত নিপীড়ন নামিয়ে আনে। আইন প্রয়োগকারী যদি সমাজকাঠামো, মানুষের বঞ্চনা, মনস্তত্ত্ব ও মানবিক জটিলতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন, তবে আইনের প্রয়োগ হয়ে পড়ে প্রাণহীন ও যান্ত্রিক।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোর দিকে তাকালে এই ব্যবস্থার রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যে আইনকে তৈরি করা হয়েছিল মূলত বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য রক্ষা, কর আদায় এবং উপনিবেশে অনুগত প্রশাসনিক মধ্যস্থতাকারী শ্রেণি তৈরির উদ্দেশ্যে।

স্কুল পেরোনো তরুণদের সরাসরি আইনে ভর্তি করিয়ে ব্রিটিশ ধাঁচের এই ঔপনিবেশিক পাঠ্যক্রম মুখস্থনির্ভর আইনের একটি গোলকধাঁধা তৈরি করেছিল। আন্তর্জাতিক আইনের উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক বা থার্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাপ্রোচেস টু ইন্টারন্যাশনাল ল (TWAIL)-এর গবেষক এবং এডওয়ার্ড সাঈদের Orientalism (1978) এর অনুসারী সমালোচকদের মতে, ঔপনিবেশিক আমল পার হয়ে গেলেও ইংল্যান্ড তাদের গ্লোবাল হেজিমনি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য ধরে রাখতে লন্ডনের ইনস অব কোর্টের মাধ্যমে কৃত্রিম এক 'ব্যারিস্টার' এলিট পদবি টিকিয়ে রেখেছে। এন্টনি অ্যাঙ্গি তার বিখ্যাত গ্রন্থ Imperialism, Sovereignty and the Making of International Law (2005) এ দেখিয়েছেন কীভাবে ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামো দিয়ে আধুনিক বিশ্বেও কর্তৃত্ব বহাল রাখা হয়েছে। সমালোচকদের গবেষণায় উঠে এসেছে, এটি মূলত সাবেক উপনিবেশগুলোর উচ্চবিত্ত তরুণদের আকৃষ্ট করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক আন্তর্জাতিক লিগ্যাল এডুকেশন বিজনেস মডেল ছাড়া আর কিছুই না। বাস্তবে যেকোনো দেশে আদালতে দাঁড়িয়ে ওকালতি করার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এবং স্থানীয় বারের যোগ্যতাই চূড়ান্ত, সেখানে ব্রিটিশ বার কোডের কোনো স্বতন্ত্র জাদুকরী শ্রেষ্ঠত্ব নেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বিশ্ব রাজনীতি, বহুজাতিক করপোরেট বাণিজ্য এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর চরম বিকাশ ঘটতে শুরু করে। চুক্তি আইন, কোম্পানি আইন, মেধা স্বত্ব, দেওয়ানি ও জটিল সাংবিধানিক বিরোধগুলো গভীর আকার ধারণ করে। আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশন এবং তৎকালীন আইন বিশারদরা গভীরভাবে অনুধাবন করেন যে স্কুল (আমাদের ক্ষেত্রে কলেজ) পেরোনো অপরিণতদের দিয়ে কেবল কিছু সংবিধিবদ্ধ আইনের ধারা মুখস্থ করিয়ে এত বড় সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট নিরসন সম্ভব নয়। একটি জটিল করপোরেট মামলা বুঝতে হলে অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থার জ্ঞান প্রয়োজন। একটি ফৌজদারি অপরাধের বিচার করতে হলে অপরাধবিজ্ঞান ও মানব মনস্তত্ত্বের বোঝাপড়া অপরিহার্য। একটি সাংবিধানিক সংকট সমাধান করতে হলে রাষ্ট্রচিন্তা ও ইতিহাসের সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি জানা থাকা চাই। এই উপলব্ধি থেকেই ১৯৬০ এর দশকে আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের নীতিগত সিদ্ধান্তে শীর্ষস্থানীয় মার্কিন ও কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্ডারগ্র্যাজুয়েট এলএলবি ডিগ্রি পুরোপুরি বিলুপ্ত করে। তারা আইন শিক্ষাকে স্নাতকোত্তর স্তরের দ্বিতীয় পেশাদার ডিগ্রির মর্যাদায় নিয়ে যায়।

আইনশাস্ত্রের মহান দার্শনিকদের জীবন পর্যালোচনা করলে এই ব্যবস্থার শক্তি আরও স্পষ্ট হয়। বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ আইন দার্শনিক এইচ এল এ হার্ট আইনের গভীরতায় প্রবেশের আগে প্রাচীন ইতিহাস ও ধ্রুপদী দর্শনে দীর্ঘ সময় অধ্যয়ন করেছিলেন। সেই সমাজ ও দর্শনের ভিত্তিই পরবর্তীতে তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Concept of Law (1961) রচনায় প্রধান নিয়ামক হয়েছিল। আধুনিক আইন দর্শনের পুরোধা রনল্ড ডোয়ার্কিন তার Taking Rights Seriously (1977) গ্রন্থে কিংবা বিচার কাঠামোর অন্যতম রূপকার লন ফুলার তার The Morality of Law (1964) গ্রন্থে আজীবন এই কথাই তুলে ধরেছেন যে নীতিশাস্ত্র, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং মানব প্রকৃতির সামগ্রিক বোঝাপড়া ছাড়া আইনের প্রয়োগ কেবল শুকনো আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়।

এছাড়াও, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর (সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ড) উন্নত বিচার কাঠামোর দিকে তাকালেও দেখা যায় আইন সেখানে কোনো বিচ্ছিন্ন বিদ্যা নয়। ইউরোপীয় বোলোনিয়া প্রক্রিয়ার অধীনে সেখানে ৩ বছরের ব্যাচেলর এবং ২ বছরের মাস্টার্স মিলিয়ে ৫ বছরের কঠোর ও সমন্বিত আইনি শিক্ষা পরিচালিত হয়, যেখানে সমাজবিজ্ঞান, কল্যাণ অর্থনীতি ও মানবাধিকারের পাঠ বাধ্যতামূলক।

কেবল একাডেমিক ডিগ্রিই থাকলেই হয় না। ডিগ্রি অর্জনের পর সুইডেন বা নরওয়েতে ন্যূনতম দুই থেকে তিন বছর আদালতে বা ল ফার্মে পূর্ণকালীন বাস্তব প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই কেবল ওকালতি বা বিচারিক জীবনের ছাড়পত্র মেলে।

উন্নত বিশ্বের সামগ্রিক আইনি শিক্ষানীতি সুস্পষ্ট প্রমাণ করে যে আইন কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জ্ঞানতত্ত্ব, শাস্ত্র বা বিষয় নয়। প্রতিনিয়তই পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে জাতীয়-আন্তর্জাতিক জটিল বাণিজ্যিক বিরোধ, নীতিগত বিরোধ, রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন, মেধা স্বত্ব, অপরাধের মনস্তাত্ত্বিক, ব্যক্তিগত-সামাজিক কল্যাণ, ন্যায়বিচার কিংবা সাংবিধানিক অধিকারের প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে হতে হলে বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি এবং সমাজের বহুস্তরীয় জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। আইনের নিজস্ব ভাষার ভেতর প্রবেশের আগে সমাজ ও মানুষকে অন্য কোনো মুক্ত জ্ঞানপীঠ থেকে উপলব্ধি করে আসার এই প্রাতিষ্ঠানিক পথই একজন আইনবিদের দৃষ্টিকে পরিণত, বহুমাত্রিক ও সত্যিকারের দূরদর্শী করে তোলে।

তথ্যসূত্র:

  • Althusser, Louis (1970). Ideology and Ideological State Apparatuses (Notes towards an Investigation). La Pensée.
  • Gramsci, Antonio (1971). Selections from the Prison Notebooks of Antonio Gramsci (Q. Hoare & G. N. Smith, Eds.). International Publishers.
  • Foucault, Michel (1975). Discipline and Punish: The Birth of the Prison. Pantheon Books.
  • Anghie, Antony (2005). Imperialism, Sovereignty and the Making of International Law. Cambridge University Press.
  • Hart, H. L. A. (1961). The Concept of Law. Oxford University Press (Clarendon Law Series).
  • Dworkin, Ronald (1977). Taking Rights Seriously. Harvard University Press.
  • Fuller, Lon L. (1964). The Morality of Law. Yale University Press.
  • American Bar Association (ABA) Standards and Rules of Procedure for Approval of Law Schools (Standard 502: Educational Requirements): https://www.americanbar.org/groups/legal_education/resources/standards/
  • Law School Admission Council (LSAC) JD Guide & Testing System
                                                                                                                                                         
লেখক, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সাহিত্যনামা 

নবীনতর পূর্বতন