নবিজিকে নিয়ে ইমাম বুসাইরির ক্বাসিদায়ে বুরদা শরিফ

ক্বাসিদায়ে বুরদা শরিফ 

মূল: ইমাম শরফুদ্দীন আল-বুসিরি (রহ.)

ভাবানুবাদে সাহিত্যনামা টিম


মূল কোরাস: মওলা ইয়া সাল্লি ওয়া সাল্লিম দায়িমান আবাদা ‘আলা হাবি-বিকা খাইরিল খালকি কুল্লিহিমি

হে আমার প্রতিপালক, চিরকাল অনন্ত দরুদ ও শান্তি বর্ষণ করো তোমার সেই প্রিয়তম হাবিবের ওপর, যিনি সমগ্র সৃষ্টির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ ও অনুপম।

যিল-সালাম প্রান্তরের স্মৃতিকাতরতায় কি নয়নে নেমেছে রক্তাশ্রুর ঢল? নাকি কাযিমার দিক থেকে বয়ে এল মদিনার স্নিগ্ধ সমীরণ, আর ইদাম পর্বতের চূড়ায় চমকে উঠল বিরহের বিজলি-রেখা? চোখের বারিধারাকে যত থামতে বলি, সে ততই উথলে ওঠে; অন্তরকে যত শান্ত করতে চাই, সে ততই দিশেহারা হয়। প্রেমের এই গোপন আগুন কি আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব, যখন চোখের অবাধ্য অশ্রু আর দগ্ধ হৃদয় নিজেই তার সাক্ষ্য দেয়?

অথচ আমার পথভ্রষ্ট নফস কোনো হিতোপদেশ কানে নেয়নি। বয়সের শুভ্রতা চুলে এসে বার্তা দিলেও সে রইল উদাসীন। নফস তো এক অবুঝ শিশুর মতো; তাকে ছাড়িয়ে না নিলে সে আজীবন দুগ্ধপানের মোহেই মত্ত থাকে। তাই কুপ্রবৃত্তির লাগাম টেনে ধরো, তাকে বিজয়ী হতে দিয়ো না। সে কখনো উপাসনা কিংবা নেক আমলের ছদ্মবেশেও তীব্র বিষ বয়ে আনে। পাপের ভারে নুয়ে পড়া জীবনে তাই বারবার অনুশোচনার অশ্রু ফেলে আশ্রয় খুঁজি সেই মহান সত্তার দরবারে।

সৃষ্টির নিখিল সৌন্দর্যের পূর্ণতা পেয়েছেন আমাদের প্রিয় রাসুল ﷺ। রূপ ও চরিত্রে তিনি এমন এক মহামানব, যাঁর কোনো সমকক্ষ বা উপমা ত্রিভুবনে নেই। খ্রিস্টানরা তাঁদের পয়গম্বরের ব্যাপারে যেভাবে সীমা লঙ্ঘন করেছিল, সেটুকু বাদ দিয়ে তাঁর যত ইচ্ছা গুণগান করো; পৃথিবীর কোনো ভাষাই তাঁর প্রশংসার অন্ত পাবে না। মানবজ্ঞানের চূড়ান্ত সীমা কেবল এতটুকুই জানতে পারে যে, তিনি একজন মানুষ, তবে তিনি আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম মুক্তা। পূর্ববর্তী সকল নবির অলৌকিক মহিমা ছিল বস্তুত তাঁরই নূরানি প্রদীপের একেকটি রশ্মি। তিনি চরিত্রে প্রস্ফুটিত গোলাপের মতো কোমল, মর্যাদায় পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল, বদান্যতায় অপার মহাসমুদ্র আর সংকল্পে অনন্তকালের পথপ্রদর্শক।

তাঁর শুভ আগমনে কেঁপে উঠেছিল অন্ধকার জাহেলিয়াতের ভিত্তিপ্রস্তর। পারস্য রাজপ্রাসাদের খিলান ভেঙে পড়েছিল, নিভে গিয়েছিল সহস্র বছর ধরে প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড, আর সাওয়া হ্রদের পানি শুকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল কুফরির উল্লাস।

অতঃপর তাঁর আহ্বানে প্রকৃতির জড়বস্তুও সাড়া দিয়েছে পরম আনুগত্যে। বৃক্ষরাজি মাটি চিরে শিকড় উপড়ে এসে তাঁর পায়ে প্রণতি জানিয়েছে, মেঘমালা ছায়া ফেলেছে মরুভূমির প্রখর রোদে। তাঁর আঙুলের ইশারায় তৃষ্ণার্ত মরুসেনারা পেয়েছে অথৈ ঝরনাধারার সন্ধান, আর সামান্য আহার্য মিটিয়েছে অগণিত মানুষের ক্ষুধা।

সেই পবিত্র হৃদয়ে অবতীর্ণ হয়েছে শাশ্বত আল-কুরআন, যার অলৌকিকত্ব চিরন্তন ও অবিনাশী। কালের আবর্তে যার আবেদন কখনো পুরাতন হয় না। যুগে যুগে প্রতিটি সংশয়ী মনকে পরাভূত করেছে এই ঐশী বাণীর গভীরতা ও মাধুর্য।

এক মহিমান্বিত রজনীতে তিনি ভ্রমণ করেছিলেন ধরা থেকে আরশে আজিমে। মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা হয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন সেই পরম নৈকট্যের স্থানে, যেখানে কোনো সৃষ্টির পদচারণা সম্ভব হয়নি। সমস্ত নবি ও রাসুল তাঁর পেছনে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে বরণ করে নিয়েছিলেন ইমাম ও পথপ্রদর্শক হিসেবে।

অতঃপর সত্যের পথে যখন তিনি জিহাদের ময়দানে দাঁড়ালেন, প্রতিটি প্রান্তর মুখরিত হলো তাঁর সাহাবিদের আত্মত্যাগে। বদ্র ও ওহুদের ময়দানে বাতিলের দম্ভ চূর্ণ হয়ে গেল। শত্রুপক্ষ তাঁর সামনে পরিণত হলো স্রোতের শেওলার মতো, আর ইসলামের নিশান উড়ল সত্যের দ্যুতি ছড়িয়ে।

হে আল্লাহর প্রিয় রাসুল ﷺ, আপনার প্রশংসায় সাজিয়েছি এই ভাঙা কাব্য, যদি আপনার একটুখানি শাফায়াতের ছায়া পাই। পাপের অতল সমুদ্রে নিমজ্জিত এই অধম আপনার ক্ষমার চাদরের উসিলা কামনা করে।

হে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ কাণ্ডারি, কঠিন হাশরের দিনে আপনার আশ্রয় ছাড়া আমার আর কোনো সহায় নেই। যে মুহূর্তে বিচারক হিসেবে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আবির্ভূত হবেন, সে মুহূর্তে আপনার মহান মর্যাদা একবিন্দু ক্ষুণ্ণ হবে না।

হে রাব্বুল আলামিন, তোমার হাবিবের ওসিলায় আমাদের সকল নেক মাকসুদ পূর্ণ করো। আমাদের বিগত জীবনের সকল ত্রুটি ও গুনাহ ক্ষমা করে দাও। পৃথিবীর সকল মুমিন নর-নারীর ওপর বর্ষণ করো তোমার অপার রহমত ও অফুরন্ত শান্তি।

নবীনতর পূর্বতন