মওলানা শেখ হিশাম কাব্বানী
১৬ জানুয়ারি ২০১০, বার্টন, মিশিগান
ইশা / আস-সিদ্দিক মসজিদ
আল্লাহ আল্লাহ, আল্লাহ আল্লাহ, আল্লাহ আল্লাহ আযীয আল্লাহ
আল্লাহ আল্লাহ, আল্লাহ আল্লাহ, আল্লাহ আল্লাহ কারীম আল্লাহ
আল্লাহ আল্লাহ, আল্লাহ আল্লাহ, আল্লাহ আল্লাহ সুবহান আল্লাহ
আল্লাহ আল্লাহ, আল্লাহ আল্লাহ, আল্লাহ আল্লাহ সুলতান আল্লাহ
ইলা হাযরাতি 'ন-নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম... আল-ফাতিহা।
আউযু বিল্লাহি মিন আশ-শায়তানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
নাওয়াইতু 'ল-আরবাঈন, নাওয়াইতু 'ল-ই'তিকাফ, নাওয়াইতু 'ল-খালওয়াহ, নাওয়াইতু 'ল-উযলাহ, নাওয়াইতু 'র-রিয়াদাহ, নাওয়াইতু 'স-সুলুক, লিল্লাহি তাআলা ফি হাযা 'ল-মাসজিদ।
আমরা পূর্ববর্তী সোহবতে বলেছিলাম যে, পাঁচটি ভিন্ন উপস্থিতি বা পাঁচটি ভিন্ন স্তর রয়েছে। মূল স্তরগুলোর ভেতরে এমন অসংখ্য স্তর রয়েছে যা একজন তরিকতের সালেক বা পথপ্রার্থী তার আধ্যাত্মিক সফরের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারে। একটি মাত্র বিষয় আমাদের এগুলো বুঝতে বা উপলব্ধি করতে বাধা দেয়—তা হলো, আমরা আমাদের মনের বন্দি। আপনি যদি কোনো কারাগারের কুঠুরিতে বন্দি থাকেন, তবে আপনি সেখান থেকে বের হতে পারবেন না। আর ভেতরে বন্দি থাকা অবস্থায় বাইরে কী ঘটছে তা দেখা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনার দৃষ্টি কেবল সেই কক্ষের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে; বাইরের সুন্দর বাগান, পাহাড়, জঙ্গল, নদী বা মহাসমুদ্র আপনি দেখতে পান না। কারণ আপনি সেই ঘরের দরজা খুলে বাইরে আসার চেষ্টা করছেন না। একইভাবে, আমাদের মন হলো আত্মার জন্য একটি কারাগার। এই কারণেই যখন মানুষের কাছে আধ্যাত্মিকতার কথা বলা হয়, তখন তারা তা বুঝতে পারে না।
শুধু সাধারণ মানুষই নয়, বহু আলেম বা পণ্ডিত ব্যক্তিও আধ্যাত্মিকতাকে অস্বীকার করেন। আধ্যাত্মিকতা কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়। এটি কেবল মুখে মুখে বলা কোনো গল্প নয়, বরং এটি একটি বাস্তব সত্য। এই আধ্যাত্মিক যাত্রায় স্রষ্টা বা আল্লাহ তার বান্দাকে এমন এক বাস্তব রূপ দান করেন, যা অনুভবে, দর্শনে এবং জীবনযাপনে উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু যারা এটি দেখতে পায় না, তারা প্রধানত দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যায়:
১. একদল এটি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। তারা বলে, আধ্যাত্মিকতা বলতে কিছু নেই; চোখের সামনে যা দেখা যায় কেবল সেটাই সত্য—নামাজ, রোজা এবং বাহ্যিক ইবাদতই শেষ কথা।
২. অন্য দলটি এটি সরাসরি অস্বীকার না করলেও বই-পুস্তক বা শিক্ষকের মাধ্যমে এর নাম শুনেছে মাত্র। তারা এখনও সেই স্তরে উন্নীত হতে পারেনি যেখানে পৌঁছালে এই সত্যগুলো স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ ও অনুভব করা যায়।
সায়্যিদিনা আব্দুল কাদির জিলানী (কঃ) সেই আধ্যাত্মিক দর্শনের স্তরে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। এই কারণেই তিনি বলেছিলেন, "আমি এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে আমার পা প্রতিটি াল্লাহর ওলী র ঘাড়ের ওপর রয়েছে।" তাঁর সময়ের আগে অন্য কেউ এমন কথা বলেননি। লক্ষ্য করুন, তিনি কিন্তু "মাথার ওপর" বলেননি, বলেছেন "ঘাড়ের ওপর"। এর অর্থ হলো, তিনি এমন এক উঁচুমাত্রায় পৌঁছেছিলেন যা তৎকালীন সবার জ্ঞানের ঊর্ধ্বে ছিল—অর্থাৎ ঘাড় পর্যন্ত। তবে ঘাড়ের ওপরে মাথা থাকে, যার অর্থ তাঁর ওপরেও উচ্চতর জ্ঞানের অধিকারী সত্তা বিদ্যমান।
যাঁরা এই মানের আধ্যাত্মিক মহামানব, তাঁরা জানেন যে এসব সত্যের অস্তিত্ব রয়েছে। এই কারণেই আমাদের জীবনে সঠিক পথপ্রদর্শক বা মুর্শিদের প্রয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলে শিক্ষক যেভাবে আপনাকে পর্যায়ক্রমে উচ্চশিক্ষার দিকে নিয়ে যান, মুর্শিদও ঠিক সেভাবেই পরিচালনা করেন। শিক্ষক ছাড়া কি আপনি উচ্চশিক্ষা বা ভালো কোনো পর্যায়ে পৌঁছাতে পারতেন? এমনকি আপনি যদি বাড়িতেও পড়ালেখা করেন, তাহলেও সার্টিফিকেট বা স্বীকৃতির জন্য কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। ঠিক তেমনই, আধ্যাত্মিক জগতেও বিশ্ববিদ্যালয় এবং অধ্যাপনার মতো উচ্চতর স্তর রয়েছে। আমরা কেন কেবল পার্থিব ডিগ্রি বা পিএইচডি অর্জনের পেছনে ছুটি, কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপনের পিএইচডি বা আধ্যাত্মিক অর্জনের কথা ভুলে যাই? আমাদের চিন্তাভাবনা থেকে এই বিষয়টি পুরোপুরি মুছে গেছে। আমাদের সীমিত ও সংকীর্ণ মনই এর মূল কারণ। মন আমাদের আটকে রেখেছে বলে আমরা সবসময় মনের বিচারবুদ্ধি দিয়ে উত্তর দিই, অন্তর বা আত্মার গভীর থেকে নয়।
যখন আপনি এই পরম সত্য বা হাকিকতের মহানুভবতা উপলব্ধি করতে পারবেন, তখন আউলিয়াগণের নির্দেশিত এই পাঁচটি স্তরের বাস্তবতা আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। উদাহরণস্বরূপ, মন আপনাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি বা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে রাখে; কিন্তু স্বপ্ন তা করে না। মাঝেমধ্যে এমন কিছু স্বপ্ন আপনারা দেখেন যা আপনাকে ঊর্ধ্বজগতে নিয়ে যায়। তখন সেখানে আপনার মাঝে জ্ঞান আপলোড করা হয়, কিন্তু তা ডাউনলোড করার চাবি বা ক্ষমতা আপনাকে দেওয়া হয় না।
আপনি যখন কোনো কামেল পীরের হাত ধরেন, তখন তিনি আপনাকে কেবল মুখোমুখি বসে পড়ান না। একজন সার্জন বা চিকিৎসক যেমন রোগীকে অজ্ঞান বা অ্যানেস্থেশিয়া দিয়ে তার দেহে অস্ত্রোপচার করেন, ঠিক তেমনি আধ্যাত্মিক অভিভাবকগণও আমাদের অবচেতন অবস্থায় আমাদের ওপর কাজ করেন। কোনো রোগী জেগে থাকলে কি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব? একইভাবে ছোট শিশুর ক্ষেত্রে দাঁতের চিকিৎসা করা বেশ কঠিন, কারণ সে হাসির গ্যাস নেওয়ার পরও নড়াচড়া করে। তাকে পুরোপুরি অবশ করলেই কেবল কাজ সহজ হয়। আমরা যখন জেগে থাকি, তখন সবকিছুকেই আমাদের বাহ্যিক মন দিয়ে বিচার করতে চাই।
এখন সময় কত? ধরুন সন্ধ্যা ৬:৪৫। আমি যদি বলি এখন ৫:৪৫, আপনি কি বিশ্বাস করবেন? আপনি বলবেন, "না"। তবে শিকাগোর মানুষ বলবে, "হ্যাঁ"—কারণ তাদের টাইম জোন বা সময় আলাদা। সুতরাং এটি নির্ভর করে আপনি কোন পরিবেশে আছেন তার ওপর। আপনি যদি আধ্যাত্মিক জগতের বা আউলিয়াদের স্তরে থাকেন, তবে আপনাকে আপনার সাধারণ মনের চিন্তাভাবনা ও সময়ের হিসাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আপনি যদি পার্থিব সময়ের ফ্রেমে আটকে থাকেন, তবে এই বিষয়গুলো বোঝা কঠিন।
আল্লাহর ওলীগণ যখন আত্মশুদ্ধির এই উচ্চপর্যায়ে পৌঁছান, তখন তারা পার্থিব ভোগবিলাস ও ইচ্ছা ত্যাগ করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের নেয়ামতের প্রত্যাশী হন। তখন তাদের জন্য সবকিছু বদলে যায়। এই কারণেই সায়্যিদিনা আব্দুল কাদির জিলানী (কঃ) বলেছিলেন, "আমার পা প্রতিটি ওলীর ঘাড়ের ওপর।" কারণ তিনি জানতেন, সেই মুহূর্তে তাঁর স্তরে অন্য কেউ ছিল না। তবে মানুষ কেবল নিচের স্তরগুলো দেখতে পায়, নিজের ওপরের স্তর দেখতে পায় না। আপনি একটি ভবনে কে আছে তা দেখতে পেলেও ছাদে কে দাঁড়িয়ে আছে তা দেখতে পারেন না। সুতরাং তাঁর ওপরেও অনেকে থাকতে পারেন, এবং সর্বাগ্রে ও সবার ওপরে রয়েছেন আমাদের প্রিয় নবী সায়্যিদিনা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
এই কারণেই আমাদের নকশবন্দী তরিকাকে "আত-তরিকাতুল মুমতাযাহ্ আল-আলিয়্যাহ" বা পরম বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত উচ্চতর তরিকা বলা হয়। প্রায় এক হাজার বছর আগে শাহ নকশবন্দ (কঃ) বলেছিলেন, "অন্যান্য তরিকতের যেখানে শেষ, আমাদের নকশবন্দী তরিকতের সেখান থেকেই শুরু।"
এর অর্থ হলো, অন্যান্য সমস্ত সুফি ধারা এক অর্থে নকশবন্দী তরিকতের মূল চালিকাশক্তির সাথে যুক্ত। আধুনিক আমলের একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যায়—বর্তমানে বিভিন্ন সার্ভার ও ইমেইল ঠিকানা তথ্য খোঁজার জন্য যেমন একটি প্রধান ইঞ্জিনের সাথে যুক্ত থাকে (যেমন গুগলের উদাহরণ দেওয়া যায়), ঠিক তেমনি আধ্যাত্মিক জগতেও সকল তরিকতের মূল ইঞ্জিন হলো এই সিলসিলা। সায়্যিদিনা ইমাম মাহদী (আঃ) এর আগমন পর্যন্ত এই আধ্যাত্মিক প্রবাহ অব্যাহত থাকবে।
সকল আল্লাহর ওলী বা সাধক আমাদের এই মাহফিলে আত্মিকভাবে যুক্ত হন, আমাদের আওরাদ গ্রহণ করেন এবং দৈনিক জিকিরে অংশ নেন। সৃষ্টিজগতের শুরু থেকে শুরু করে ইমাম মাহদী (আঃ) এর আগমন এবং কেয়ামত পর্যন্ত তাঁরা এই ধারাকে শক্তভাবে আঁকড়ে রাখবেন। কেন? কারণ নকশবন্দী তরিকত দুটি মহান উৎস থেকে প্রবাহিত হয়েছে—সায়্যিদিনা আলী (রাঃ) এবং সায়্যিদিনা আবু বকর আস-সিদ্দিক (রাঃ)। এই দুটি ধারা সায়্যিদিনা জাফর আস-সাদিক (রাঃ)-এর পবিত্র সত্তায় এসে মিলিত হয়েছে। এমনকি ইমাম মাহদী (আঃ)-ও এই উৎস থেকেই আধ্যাত্মিক আলো গ্রহণ করবেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "আমি জ্ঞানের শহর এবং আলী তার দরজা।" এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের ওপর আর কোনো মাধ্যম নেই।
মারেফাতের চরম শিখরে পৌঁছানো সুফিগণ বা আরিফগণ হযরত মুহাম্মদী (সাঃ)-এর অন্তরের অতল গহীনে এমনভাবে নিমজ্জিত হয়েছেন যে, সেখান থেকে তারা এই গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেছেন। এই জ্ঞানের ভিত্তিতেই তারা অস্তিত্বের প্রধান পাঁচটি স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন।
এর প্রথমটি হলো 'আলাম আন-নাসুত বা মানব জগৎ। এটি ৩৪টি মাত্রার (Dimensions) সমন্বয় গঠিত এই ভৌত ও দৃশ্যমান জগৎ, যেখানে মানুষ ও সকল সৃষ্টি বিদ্যমান। এই জগতের ভেতরেই অগাধ জ্ঞান লুকিয়ে রয়েছে। আজকের বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করেন যে, মহাবিশ্বে যা কিছু আছে তার এক শতাংশও তারা এখনও আবিষ্কার করতে পারেননি। এমআরআই (MRI) প্রযুক্তির মতো আধুনিক বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনগুলো কেবল শুরুর ধাপে রয়েছে। প্রযুক্তির যত উন্নতিই হোক না কেন, মানুষের অক্ষমতা থেকেই যায়। মানুষের এই জগৎ অসীম রহস্যে ঘেরা। আল্লাহ তাআলার কুদরতকে কখনো খাটো করে দেখবেন না। হাদিসে এসেছে: "মুমিনের ফারাসাত বা অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় করো, কারণ সে আল্লাহর ঐশ্বরিক আলো দিয়ে দেখে।" একজন কামেল ওলী আপনি কী চিন্তা করছেন বা করছেন তা স্পষ্টভাবে দেখতে পান।
কেবল হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্মের সাধকরাই নির্দিষ্ট কিছু আধ্যাত্মিক ক্ষমতা অর্জন করেন না; তবে তাদের সীমা নির্দিষ্ট। তারা একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারেন, কিন্তু তার বাইরে যেতে পারেন না। কারণ সেখানে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দুঃখজনকভাবে, বর্তমান সময়ে মূলধারার ধর্মগুলোতে আধ্যাত্মিক চর্চার বেশ অভাব দেখা যায়। ধর্মে আধ্যাত্মিকতা নেই তা নয়, বরং মানুষ এখন কেবল বাহ্যিক দেহ ও আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত; মন ও আত্মার মুক্তির দিকে নজর দিচ্ছে না। মন আপনার জন্য বন্দিশালা, আর তারা চায় না আপনি সেই আত্মাকে মুক্ত করে সত্যের মুখোমুখি হন।
প্রাচ্য সংস্কৃতিতে কেবল আত্মা নিয়ে আলোচনা করার কারণে মানুষ সেদিকে আকৃষ্ট হয়। অথচ আমাদের নিজেদের ধর্মেও এর পূর্ণাঙ্গ দিশা রয়েছে। প্রায় ১৫০ বছর আগে সায়্যিদিনা খালিদ আল-বাগদাদী (কঃ) নামের একজন প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক মহামানব ও জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি তাঁর শিষ্যদের হজের সফরে পাঠানোর সময় বলেছিলেন, "তোমরা সফরে গিয়ে মাহদীর (পথপ্রদর্শক) দেখা পাবে।" আরবিতে 'মাহদী' শব্দের অর্থ হলো হেদায়েতপ্রাপ্ত বা একজন সঠিক পথপ্রদর্শক। মানবজাতিকে পরিচালিত করার জন্য একজন জ্ঞানী পথপ্রদর্শকের সর্বদা প্রয়োজন।
বর্তমান সমাজে মানুষ বিভিন্ন দলে বিভক্ত। প্রত্যেকে নিজের ছোট গোষ্ঠী নিয়ে ব্যস্ত। আধুনিক প্রযুক্তি মানুষকে নিজস্ব মতামত প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে, যদিও সেই মতামতগুলোর কোনো বাস্তব মূল্য নাও থাকতে পারে! মানুষ এখন ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে তাদের সময় নষ্ট করছে। সেখানে অপ্রয়োজনীয় পোস্ট করার চেয়ে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে ঊর্ধ্ব জগতের বা আসমানী ভাবনায় যুক্ত হওয়া অনেক বেশি কল্যাণকর।
মানুষ পৃথিবীতে কত বছর বাঁচে? ৫০, ৬০, ৭০ বা ৮০ বছর? মুহূর্তের মধ্যে জীবনের সব পার্থিব আনন্দ বিলীন হয়ে যায়। একজন ৩৫ বা ৪৫ বছর বয়সী চিকিৎসককে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, গতকাল যে আনন্দ তিনি অনুভব করেছিলেন তা কি এখনও হুবহু পাচ্ছেন? উত্তর হবে, না। তা অতীত হয়ে গেছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি পার্থিব সুখে মত্ত ছিল এবং যে ব্যক্তি তা থেকে দূরে ছিল—বর্তমান মুহূর্তে উভয়ের অনুভূতিই সমান। কিন্তু তফাৎ হলো, একজন অনিত্য পার্থিব আনন্দের পেছনে জীবন নষ্ট করেছে, আর অন্যজন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে জীবন ব্যয় করেছে। মৃত্যুর মুহূর্তে কোনো পার্থিব সুখ আর অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু মৃত্যুর পর যে সত্য উদটিত হবে, সেখানে যারা ঈমান ও সৎকর্মের পথে ছিল তারা রক্ষা পাবে, আর যারা বিভ্রান্ত ছিল তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আল্লাহ পরম দয়ালু, তিনি কাকে ক্ষমা করবেন তা আমরা নির্ধারণ করতে পারি না; তবে আধ্যাত্মিক জ্ঞান আমাদের এই সতর্কবার্তাই দেয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের এই জীবনে উপভোগ করার অনুমতি দিয়েছেন, তবে তা একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি ও সীমার মধ্যে। সীমালঙ্ঘন করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, "আমি তোমাদের আনন্দিত করার জন্য প্রচুর নেয়ামত দিয়েছি, তবে তোমরা কেন সীমা অতিক্রম করছ?" অতিরিক্ত মদপান বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন কখনো প্রকৃত সুখ আনতে পারে না। হযরত ঈসা (আঃ) বা হযরত মুসা (আঃ) কি সারাক্ষণ মদ্যপানে লিপ্ত ছিলেন? তা কখনোই নয়।
এখন সেই গল্পে ফিরে যাওয়া যাক। সায়্যিদিনা খালিদ আল-বাগদাদী (কঃ) তাঁর শিষ্যদের একজন মহাজ্ঞানী ব্যক্তিত্বকে খুঁজে বের করতে বলেছিলেন। শিষ্যরা ভারতে গিয়ে শুনল যে বোম্বেতে (মুম্বাই) একজন হিন্দু গুরু রয়েছেন যিনি অলৌকিক ঘটনা বা কারামত দেখাতে পারেন। শিষ্যরা ফিরে এসে শেখকে বলল, "আমরা সেই পথপ্রদর্শককে পাইনি, তবে বোম্বেতে একজন হিন্দু গুরুকে অলৌকিক ক্ষমতা দেখাতে দেখেছি। আমরা আপনার অনুসারী হয়েও কোনো অলৌকিক ক্ষমতা দেখতে পাচ্ছি না, অথচ একজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী তা করছে!"
তাদের এই আচরণ ও কথার ধরন দেখে খালিদ আল-বাগদাদী (কঃ) বললেন, "আমাকে আগামীকাল পর্যন্ত সময় দাও, আমি তোমাদের উত্তর দেব।" সেই রাতেই তিনি আধ্যাত্মিক শক্তিতে (তৈয়্যুল অর্জ বা অলৌকিক স্থানান্তরের মাধ্যমে) ভারতে গমন করলেন এবং সেই গুরুর দরজায় গিয়ে পৌঁছালেন। তিনি দরজায় কড়া নাড়ার আগেই সেই গুরু দরজা খুলে দিলেন এবং বললেন, "আমি আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।"
সেই গুরু পুনর্জন্মে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু পুনর্জন্মের ধারণা আল্লাহর অসীম সৃষ্টিক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে। এটি মনে করা ভুল যে আল্লাহ নতুন আত্মা সৃষ্টি করতে অক্ষম বলেই পুরোনো আত্মাকে বারবার ফিরিয়ে আনেন। এটি মানুষের সংকীর্ণ মনের চিন্তা। তারা মনে করে ভালো কাজ করলে মানুষ পরের জন্মে ফেরেশতা হয়ে জন্মাবে, আর খারাপ কাজ করলে গাধা বা সাপ হয়ে জন্মাবে! কিন্তু আল্লাহ তাআলা মানুষকে অনুশোচনা ও ক্ষমার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির সুযোগ দেন। মানুষ যখন তার ভুলের জন্য লজ্জিত হয় এবং তওবা করে, তখন আল্লাহর রহমত প্রকাশ পায়।
যাইহোক, সেই গুরু শেখ খালিদ আল-বাগদাদী (কঃ)-কে সম্মান জানিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন এবং খাবার খেতে দিলেন। তিনি বললেন, "আমি বিশেষ করে একজন মুসলিম নারীকে দিয়ে আপনার খাবার তৈরি করিয়েছি, কারণ আমি জানতাম আপনি অন্যথায় এটি গ্রহণ করবেন না।" দেখুন, সেই গুরু অতিথির আদব রক্ষায় কতটা সচেতন ছিলেন।
শেখ খালিদ আল-বাগদাদী (কঃ) খাবারের দিকে না তাকিয়ে গুরুর দিকে তাকালেন এবং বললেন, "বলুন! আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ও রাসুলুহু (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল)!"
তখন সেই গুরু সাথে সাথে কোনো উত্তর না দিয়ে গভীর ধ্যান বা মোরাকাবায় মগ্ন হয়ে গেলেন। ঘণ্টা পর ঘণ্টা কেটে গেল। শেখ হাঁটু গেড়ে বসে রইলেন এবং গুরু ধ্যানে নিমগ্ন রইলেন। দীর্ঘ সময় পর গুরু মাথা তুলে স্পষ্ট কণ্ঠে পাঠ করলেন: আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ও রাসুলুহু।
শেখ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, "এই শাহাদাত পাঠ করতে আপনার এত ঘণ্টা সময় লাগল কেন? আমি বলার সাথে সাথে বললে কি ভালো হতো না?"
তখন সেই গুরু বললেন, "হে আমার শিক্ষক, আমার মাস্টার!" (দেখুন, সাথে সাথে শেখ তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষক হয়ে গেলেন)। গুরু বুঝিয়ে বললেন, "আমি জীবনে যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার কুপ্রবৃত্তি বা নফসের (Self/Ego) সাথে পরামর্শ করি। বিগত ২৫ বছর ধরে আমার নিয়ম হলো—আমার নফস আমাকে যা করতে বলে, আমি ঠিক তার উল্টোটা করি। নফস যদি বলে কোনো কাজ করতে, আমি তা করি না; আর নফস যদি কোনো কাজ করতে নিষেধ করে, আমি ঠিক সেটাই করি। কারণ মানুষের নিজের নফস বা অহংকারই হলো তার সবচেয়ে বড় শত্রু। ধর্ম এসেছে মানুষকে এই শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করতে। আজ যখন আপনি আমাকে কালেমা শাহাদাত পাঠ করতে বললেন, আমি আমার নফসের কাছে জানতে চাইলাম। আমার নফস আমাকে বলল, 'তুমি কি পাগল হয়েছ? তুমি হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে বড় গুরু, পরম সম্মানের আসনে আছ। তুমি ইসলামে গিয়ে একজন সাধারণ ভিক্ষুকের মতো সর্বনিম্ন ধাপ থেকে আবার শুরু করতে চাও? আমি তোমাকে কখনোই এটি বলতে দেব না!' আমার নফস এটি চরমভাবে বিরোধিতা করেছিল বলেই, নফসকে পরাজিত করতে আমি আপনার কথা মেনে নিলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করলাম।"
সেই মুহূর্তে, নফসকে দমন করার কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য আসমান ও জমিনের আধ্যাত্মিক রহস্য উন্মুক্ত করে দিলেন। যখন তিনি নিজের অহংকার ত্যাগ করে সত্যকে গ্রহণ করলেন, তখন ঐশ্বরিক জ্ঞান তাঁর অন্তরে বর্ষিত হলো।
আমরা কতজন আমাদের নফসের বিরোধিতা করতে পারি? আমরা বেশিরভাগ সময় নফসের দাসত্ব করি, যা আমাদের আত্মিক ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। আমাদের মন যখন নফসের কারাগারে বন্দি থাকে, তখন আমরা প্রকৃত সত্য দেখতে পাই না। প্রতিদিনের কাজকর্মের জন্য মন বা বুদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে, তবে মন যেন আত্মাকে পরিচালিত না করে; বরং আসমানী আধ্যাত্মিক আলো যেন আমাদের মন ও জীবনকে পরিচালনা করে।
সুফি সাধকগণ এই আধ্যাত্মিক জগতের মূলত পাঁচটি স্তরের কথা বলেছেন। এর প্রথমটি হলো 'আলাম আন-নাসুত' বা মানব জগৎ। রাতে আকাশে তাকালে আপনি অজস্র তারা দেখতে পান। কিন্তু যখন ভোরের সূর্য ওঠে, তখন কি আর তারাগুলো দেখা যায়? দেখা যায় না। তারাগুলোর অস্তিত্ব তখনও থাকে, কিন্তু সূর্যের তীব্র আলোর সামনে সেগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। ঠিক তেমনই, অন্তরের গভীরে যখন ঐশ্বরিক সত্যের সূর্য উদিত হয়, তখন পার্থিব তুচ্ছ ইচ্ছা ও বাসনাগুলো দূর হয়ে যায়।
তখন মানুষ কেবল নামীদামী ব্র্যান্ড, রেস্তোরাঁ, বার কিংবা সাময়িক আনন্দের পেছনে ছোটাছুটি করে না। মানুষ সাজসজ্জা দিয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়াতে চায়, অথচ আল্লাহর দেওয়া আধ্যাত্মিক পোশাকই মানুষকে প্রকৃত পবিত্রতা দান করতে পারে। যখন এই পার্থিব জীবনের প্রতি মোহ কেটে যায়, তখন মানুষ প্রবেশ করে আধ্যাত্মিক স্বর্গীয় জগত বা 'আলাম আল-মালাকুত-এ।
'আলাম আল-মালাকুত হলো এমন এক জগৎ যা গায়বী জ্ঞান ও ঐশ্বরিক নিদর্শনে পরিপূর্ণ। এটি কেবল চূড়ান্ত সত্যের সূচনা নয়, বরং এটি হলো 'আলাম আল-আসমা ওয়াস-সিফাত' এবং রোল মডেলদের জগত। হাদিসে যেমনটি বলা হয়েছে: "চোখ যা কখনো দেখেনি, কান যা কখনো শোনেনি এবং মানুষের অন্তর যা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি—আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য সেই জান্নাতী জগতে তা প্রস্তুত রেখেছেন।"
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক পথ দেখান এবং হেফাজত করুন। আজকাল শহরের বাড়িগুলোর সামনে প্রায়ই লেখা থাকে "কুকুর হতে সাবধান"। কিন্তু আমরা কখনো নিজেদের অন্তরের সামনে লিখি না "শয়তান হতে সাবধান"। আপনার পাশের জন বা কোনো পরিচিত ব্যক্তি আপনাকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে, মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পাপের প্রথম পদক্ষেপটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ একবার পা বাড়ালে সেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। সাময়িক উত্তেজনায় মানুষ আনন্দ খোঁজে, কিন্তু প্রকৃত শান্তি কেবল আল্লাহর প্রেমে এবং আসমানী ভালোবাসাতেই পাওয়া সম্ভব। এটিই আপনার পরিবার, সন্তান ও সমাজের জন্য স্থায়ী কল্যাণ নিয়ে আসবে।
পার্থিব ক্ষমতা বা পদমর্যাদা ক্ষণস্থায়ী। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভূকম্পনেই বড় বড় ক্ষমতাধর ব্যক্তি নিমিষে সর্বস্বান্ত হয়ে যেতে পারে। সকালের প্রধান ব্যক্তি সন্ধ্যায় গৃহহীন বা পথহারা হয়ে পড়তে পারে। সুতরাং এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর ওপর ভরসা না করে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা উচিত। আল্লাহ যে জীবনবিধান দিয়েছেন, তা অনুসরণ করাই শ্রেয়। তা না হলে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও বিপর্যয় বা আধ্যাত্মিক ভূমিকম্প নেমে আসতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের তাঁর মহত্ত্ব উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন। এই ভৌত জীবন ও আধ্যাত্মিক জগতের বিষয়ে আলোচনা এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি, সামনের পর্বগুলোতে আমরা এর পরবর্তী স্তরগুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত জানব।
