ইফতেখার আহমেদ হিমেল
"নাইম......এই নাইম....ওঠো। স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে " বলতে বলতে নাইমের রুমে গেলেন হাফসা। হাফসা নাইমের মা। নাইম একটা নাম করা স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তাদের স্কুল ৮টা থেকে। এখন বাজে ৭:২০।
হাফসা আবার ডাকলেন, "না ইম..." নাইম " উঃ " শব্দ করে আবার ঘুমাতে লাগলো । হাফসা এবার তাকে জোর করে উঠিয়ে বসিয়ে দিলেন। বললেন, "স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে । তাড়াতাড়ি রেডি হও।"
নাইম চোখ ঘষতে ঘষতে বলল, "আজকে শরীরটা ভালো লাগছে না , আম্মু। আজকে না যাই।"
হাফসা রেগে-মেগে বললেন, "একটা চড় লাগাবো ধরে । ফাঁকিবাজি শুধু। দ্রুত রেডি হও। নাহয় তোমার আব্বুকে বলব সব।"
মায়ের ধমক খেয়ে নাইম দ্রুত বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমের দিকে গেল। মুখ-হাত ধুয়ে বের হতে হতে ৭:৪০ করে ফেলল।
হাফসা
বললেন, "দুটো করে ভাত খেয়ে নে। নাহয় ক্লাসে ক্ষুধা লাগবে ।"
নাইম
বলল, "না, থাক। টিফিনের সময় কিছু খেয়ে নিব। এখন দেরি হয়ে যাবে।"
হাফসা বললেন, "ঠিক আছে । সাবধানে যাও।"
একটা রিকশা নিয়ে নাইম স্কুলে চলে গেল। হাফসা তখন নাইমের বাবা শামীম সাহেবের জন্য সকালের খাবার রেডি করতে লাগলেন।
শামীম
সাহেব একটা প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি প্রতিদিন গোসল করে খাবার টেবিলে বসেন
আর ফেসবুকে স্ক্রল
করে দিনের খবরাখবর দেখেন। খাবার মুখে দিয়ে হাফসাকে জিজ্ঞেস করলেন, "নাইম স্কুলে
গিয়েছে?”
হাফসা
বললেন, "হ্যাঁ।"
এরপর শামীম সাহেব আর কিছু বললেন না । খেয়ে-দেয়ে অফিসের জন্য রেডি হতে লাগলেন।
শামীম সাহেব অফিসে যাওয়ার পর হাফসা বাজার করতে বের হলেন। সবজি, মুরগি, ডিম ইত্যাদি কেনার পর কী মনে করে নাইমের জন্য একটা ফুটবল নিলেন। নাইম অনেক দিন আগেই ফুটবলটা খুঁজেছিল। দিবেন দিবেন করে দেওয়া হয়নি। আজকে স্কুল থেকে এসে তার বিছানায় ফুটবলটা দেখে নাইম কী যে খুশি হবে ! এই ফাঁকে হাফসা নিজেও কখন হেসে ফেললেন বুঝতেই পারলেন না।
নিজেকে সামলালেন, যখন দেখতে পেলেন দোকানের ক্যাশিয়ারে বসা মেয়েটি তাঁর দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে আছে।
সব কাজ সেরে হাফসা বাসায় আসলেন। এরপর রান্নাবান্না করতে লাগলেন। ১টার দিকে টিভি খুলতেই তাঁর বুকটা কেঁপে উঠল। নাইমদের স্কুলে একটা প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে । অনেক হতাহত হয়েছে বলছে । হাফসা দ্রুত রেডি হয়ে নাইমের স্কুলের দিকে গেলেন। পথে শামীম সাহেবও তাঁকে ফোন করলেন। নাইমকে পেলে জানাতে বললেন।
স্কুলে গিয়ে হাফসা দেখতে পেলেন নাইমদের ক্লাসের দিকে মানুষ জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে । বিল্ডিংটার একটা অংশ ভেঙ্গে গেছে , আগুন জ্বলছে । একটা ছেলেকে দেখতে পেলেন খালি গায়ে "আম্মু, আম্মু" বলে কাঁদতে কাঁদতে হেঁটে যেতে লাগল। তার মা থার চুলগুলো পুড়ে গেছে । হাফসার চোখে পানি এসে গেল। নাইম কোথায়? কেমন আছে ?
অনেক
খোঁজাখুঁজির পরও নাইমকে পাওয়া গেল না। ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা
এসে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছে। সেনাবাহিনীর একজন অফিসারকে হাফসা নাইমের ছবি দেখিয়ে
বললেন, "ওকে দেখেছেন?"
অফিসার বললেন, "ক্লাসরুমগুলো তো পুড়ে গেছে ....চেহারা তো....আপনি পাশের মেডিকেলে খোঁজ নিতে পারেন। সবাইকে সেখানে আপাতত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।"
হাফসা মেডিকেলে গিয়ে খোঁজ নিতে লাগলেন। একজন নার্স এসে তাঁকে সাদা চাদরে মুখ ঢাকা ৪টা লাশের কাছে নিয়ে গেল। হাফসা একটা একটা করে উল্টান আর আঁতকে উঠেন। পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে সব। ৪ নম্বরটির চাদর উল্টানোর সময় মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগলেন। এটা যেন নাইম না হয়। ছেলেটার মুখ-বুক পুড়ে গেছে । কিন্তু তার হাতের ঘড়িটা জানিয়ে দিল এটাই নাইম। হাফসা কাঁদতে কাঁদতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন। আশেপাশের সবাই তাঁকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন।
একজন নার্স এসে যাবতীয় তথ্য নোট করে চলে গেল। একসময় শামীম সাহেব মেডিকেলে আসলেন। তিনিও কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।
হাফসা বলতে লাগলেন, "সকালে দেরি করে ঘুম থেকে উঠায় ভাত খেতে পারেনি ছেলেটা। বলেছিল টিফিনে কিছু একটা খেয়ে নিবে ....." এরপর একটু থেমে কাঁদতে কাঁদতে আবার বলতে লাগলেন, "অনেক দিন আগে আমাকে বলেছিল ফুটবলের কথা। দিব, দিব করে আর দেওয়া হয়নি। আজকে বাজার করার সময় হঠাৎ মনে হল ছেলেটার জন্য একটা ফুটবল নিই....কে খেলবে এখন ফুটবলটা দিয়ে ?...... নাইম, বাবা , আমাকে ক্ষমা করে দিস। আজকেও তোর উপর রাগারাগি করেছি। আমার উপর রাগ করিস না ,বাবা ।"
হাফসার
কান্না জড়ানো কথায় সবার চোখ ভিজে উঠল।
এমন সময় সেনাবাহিনীর ওই অফিসারটি, যাকে হাফসা নাইমের ছবি দেখিয়ে ছিলেন, নাইমকে নিয়ে হাজির হলেন। হাফসা , শামীম সাহেব দুজনেই পাগলের মতো নাইমের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তার মুখে, কপালে বারবার চুমু খেতে লাগলেন।
হাফসা বললেন, "তোমার ঘড়ি দেখে ভাবলাম তুমি ....."
নাইম কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আমার বন্ধু রাশেদ ও। আজকে ক্লাসের ফাঁকে ও আমার ঘড়িটা একটু পরতে চেয়েছিল।"
শামীম সাহেব বললেন, "তুমি কোথায় ছিলে বিমান ক্ল্যাশ করার সময়?"
নাইম বলল, "ডিবেটিং ক্লাবের মিটিং -এ। একাডেমিক বিল্ডিং -এর ২ তলায়।"
[বি
.দ্র: নাইম তো বেঁচে ফিরল। কিন্তু রাশেদের মতো যারা মাইলস্টোনের বিমান দুর্ঘটনায় নিহত
হল তাঁদের পরিবার-পরিজনের প্রতি আমাদের সমবেদনা। এই গল্পটি সেই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত-আহত
সকলের প্রতি উৎসর্গিত।]