পোষা বিড়াল: আধ্যাত্মিকতা, মর্যাদা এবং অকৃত্রিম ভালোবাসার এক ধারক

মওলানা শেখ নাজিম এবং মওলানা শেখ হিশামের সাথে বিড়াল

সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব সৃষ্টি এই বিড়াল কেবল আমাদের ঘরই আলোকিত করে না, বরং আধ্যাত্মিক এবং মানসিক প্রশান্তির এক অনন্য মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। ইসলামি শরিয়ত থেকে শুরু করে গভীর সুফিদর্শন পর্যন্ত সর্বত্র বিড়ালের অবস্থান অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। আধ্যাত্মিক সাধক এবং সুফি বুজুর্গদের জীবনে বিড়াল কেবল একটি পোষা প্রাণী নয়, বরং প্রকৃতির এক নীরব জিকিরকারী সত্তা।

ইসলামে বিড়ালের মর্যাদা ও পবিত্রতা

ইসলামি আইনে বিড়ালকে অত্যন্ত পবিত্র প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। নবী করিম ﷺ বিড়ালকে ভালোবেসেছেন এবং তাদের প্রতি সদয় আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। বিড়ালের পবিত্রতা সম্পর্কে একটি বিখ্যাত হাদিস রয়েছে। হজরত কাবশা বিনতে কাব বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, আবু কাতাদা (রা.) একবার ওজু করছিলেন, তখন একটি বিড়াল এসে পাত্র থেকে পানি পান করতে শুরু করে। তিনি বিড়ালটির জন্য পাত্রটি কাত করে দিলেন। সাহাবি কাবশা অবাক হয়ে তাকালে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, এরা অপবিত্র নয়, এরা তো তোমাদের চারপাশে সর্বদা ঘোরাফেরা করে। (সুনান আবু দাউদ)

বিড়ালের প্রতি নিষ্ঠুরতার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা উল্লেখ করে রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, একটি বিড়ালের কারণে এক নারীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। সে বিড়ালটিকে আটকে রেখেছিল এবং সে অবস্থায় সেটি মারা যায়। সে তাকে খাবার বা পানি দেয়নি এবং তাকে পোকামাকড় খাওয়ার জন্য ছেড়েও দেয়নি। ফলস্বরূপ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

তাছাড়া, সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে সাখর (রা.) বিড়াল ছানাদের প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণে "আবু হুরায়রা" বা বিড়াল ছানার পিতা উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন, যা ইসলামে বিড়ালের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।


সুফিবাদ ও তাসাউফে বিড়ালের জিকির

তাসাউফ বা সুফিদর্শনে মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু এবং প্রাণী স্রষ্টার জিকিরে মগ্ন। সুফি সাধকরা মনে করেন, বিড়াল যখন চোখ বন্ধ করে প্রশান্তিতে গুড়গুড় শব্দ বা পারিং করে, সেটি আসলে তাদের নিজস্ব ভাষার জিকির। এই শব্দের মাধ্যমে তারা তাদের স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং চারপাশের পরিবেশকে আধ্যাত্মিক শক্তিতে পূর্ণ করে তোলে। অনেক আধ্যাত্মিক সাধক বিড়ালের এই ছন্দোবদ্ধ গুড়গুড় শব্দকে পরম করুণাময়ের নামের জিকির হিসেবে অনুভব করেন।


বিড়ালের পজিটিভ এনার্জি এবং ফ্রিকোয়েন্সি

আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে বিড়ালের পারিং ফ্রিকোয়েন্সি ২৫ থেকে ১৪০ হার্জের মধ্যে থাকে, যা মানুষের স্নায়বিক চাপ কমাতে, রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে এবং মানসিক অবসাদ দূর করতে সাহায্য করে। সুফি সাধকরা এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাদের মতে, বিড়ালের এই ফ্রিকোয়েন্সি হলো বিশুদ্ধ পজিটিভ এনার্জি বা ইতিবাচক শক্তি। বিড়াল যখন ঘরে থাকে, তখন তারা নেতিবাচক শক্তি শোষণ করে নেয় এবং তাদের নীরব জিকিরের মাধ্যমে ঘরে এক ধরনের প্রশান্তি ও রহমত ছড়িয়ে দেয়।  


গ্র্যান্ড শেখ নাজিম এবং মাওলানা শেখ হিশামের বিড়াল প্রেম

সুলতানুল আওলিয়া শেখ নাজিম আদিল আল হাক্কানি এবং মাওলানা শেখ হিশাম কাব্বানির জীবনে বিড়ালের প্রতি এক গভীর এবং আধ্যাত্মিক ভালোবাসা লক্ষ্য করা যায়। তারা বিড়ালকে অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং তাদের মজলিসে বা বাড়িতে বিড়ালদের অবাধ বিচরণ ছিল।

গ্র্যান্ড শেখ আবদুল্লাহ ফায়েজ আদ দাগেস্তানির জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা এক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে। উম্মে কাওসার নামের এক প্রতিবেশীর একটি হলুদ বিড়াল ছিল, যেটি উম্মে কাওসার এবং গ্র্যান্ডশেখের বাড়ির মাঝের উঁচু দেয়াল থেকে লাফিয়ে আসত। বিড়ালটি গ্র্যান্ডশেখের উঠোনে রাখা পানির ড্রামে প্রস্রাব করে তার সীমানা নির্ধারণ করত। এটি দেখে গ্র্যান্ডশেখ মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বিড়ালটিকে তাড়িয়ে দিলেও, তিনি কখনোই চাইতেন না প্রাণীটির কোনো ক্ষতি হোক।

একবার মে দিবসে একটি অনুষ্ঠানে ওই হলুদ বিড়ালটি জিবরানি নামের এক ব্যক্তির একটি শখের প্রদর্শনী কবুতর খেয়ে ফেলে। জিবরানি ক্ষিপ্ত হয়ে সেখানে উপস্থিত একজন পুলিশকে বিড়ালটিকে গুলি করার নির্দেশ দেন। পুলিশটি গ্র্যান্ডশেখের সামনেই বিড়ালটিকে লক্ষ্য করে পরপর তিনটি গুলি করে এবং বিড়ালটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সবাই ভেবেছিল বিড়ালটির উপদ্রব চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু গ্র্যান্ডশেখের আধ্যাত্মিক শক্তি ও দয়ার বরকতে, তিনটি গুলি লাগার পরও বিড়ালটির কোনো ক্ষতি হয়নি। অলৌকিকভাবে বিড়ালটি আবার ফিরে আসে এবং তার আগের স্বভাবমতো ড্রামের কাছে ঘোরাফেরা করতে থাকে। গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহ ফায়েজ আদ দাগেস্তানির অসংখ্য কারামত বা অলৌকিক ক্ষমতা ছিল, কিন্তু তিনি তা প্রকাশ করতে চাইতেন না। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, চরম বিরক্তি সত্ত্বেও আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর ওলীদের কত গভীর দয়া এবং ভালোবাসা থাকে!

শেখ নাজিম প্রায়শই তার অনুসারীদের উপদেশ দিতেন প্রত্যেকটি ঘরে অন্তত একটি করে বিড়াল রাখার জন্য। তিনি বলতেন, বিড়াল হলো আধ্যাত্মিক পাহারাদার। তারা ঘরের ভেতরের নেতিবাচক শক্তি বা খারাপ আত্মিক প্রভাব থেকে ঘরকে সুরক্ষিত রাখে। শেখ নাজিম বিশ্বাস করতেন যে বিড়াল তার মালিকের জন্য দোয়া করে এবং ঘরের অনেক বালা মুসিবত বা অকল্যাণ দূর করতে সাহায্য করে। মাওলানা শেখ হিশামও বিড়ালদের খাওয়ানো এবং তাদের যত্ন নেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তাদের কাছে বিড়াল হলো এমন এক সৃষ্টি যা মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায় এবং স্রষ্টার প্রেমের পথে হাঁটতে সাহায্য করে।

বিড়াল কেবল আমাদের নিঃসঙ্গতার সঙ্গী নয়, তারা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক পবিত্র অংশ। ইসলাম এবং সুফিদর্শন আমাদের শেখায় যে, এই নিরীহ প্রাণীগুলোর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন, তাদের যত্ন নেওয়া এবং তাদের উপস্থিতিকে সম্মান করা আমাদের নিজস্ব আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যই অত্যন্ত জরুরি। একটি বিড়ালকে ভালোবাসা মানে আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, যা পরোক্ষভাবে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের এক সুগম পথ তৈরি করে। শুধু বিড়াল নয়, কুকুরসহ অভুক্ত অসহায় প্রাণীদের যত্ন করার মাঝেও অনেক কল্যাণ নিহিত আছে।

 

-সাহিত্যনামা সম্পাদকীয়

নবীনতর পূর্বতন