আমরা কি শেষ সময়ে চলে এসেছি? কিয়ামত, মহাপ্রলয় বা অ্যাপোক্যালিপ্সের হাতছানি

সাহিত্যনামা সম্পাদকীয়

শনিবার, জুলাই ১৯, ২০২৬


বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র দাবদাহ, একের পর এক মহামারি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অনিয়ন্ত্রিত উত্থান—সব মিলিয়ে বর্তমান মানবসমাজ এক অদ্ভুত ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন সকালে সংবাদের পাতায় চোখ রাখলে মনে হয়, আমরা বোধহয় এক অবিন্যস্ত পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। সাধারণ মানুষের মনে অবচেতনভাবেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: আমরা কি তবে শেষ সময়ে চলে এসেছি? ধর্ম, বিজ্ঞান কিংবা দর্শন—সবখানেই কি তবে কোনো মহাপ্রলয় বা অ্যাপোক্যালিপ্সের ঘণ্টা বাজছে?

"সাহিত্যনামা"-এর আজকের বিশেষ আখ্যানে আমরা এই চরম অস্তিত্ববাদী সংকটকে কোনো অন্ধ আতঙ্ক থেকে নয়, বরং ইতিহাস, বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব এবং দর্শনের এক সমন্বিত দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার চেষ্টা করব। এই ভাবনার পেছনে বিশেষ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন সম্রাট, যিনি সামাজিক মাধ্যমে দর্শনের জটিল গোলকধাঁধাকে অত্যন্ত সহজ ও বিশ্লেষণাত্মক কন্টেন্টের মাধ্যমে আমাদের সামনে প্রতিনিয়ত উন্মোচন করে চলেছেন।

ধর্মতত্ত্বের আয়নায় শেষ সময়: জাগতিক মোহমুক্তি ও বিচারদিন

মহাপ্রলয় বা শেষ সময়ের ধারণাটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রধান ধর্মেই মহাবিশ্বের একটি চূড়ান্ত সমাপ্তি বা 'বিচারদিনের' কথা বলা হয়েছে। আব্রাহামিক ধর্মসমূহে (ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদিধর্ম) একে কিয়ামত, অ্যাপোক্যালিপ্স বা জাজমেন্ট ডে হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ইসলামী ধর্মতত্ত্বে কিয়ামতের বড় ও ছোট কিছু চিহ্নের কথা উল্লেখ আছে, যার মধ্যে নৈতিকতার চরম বিপর্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আধিক্য এবং সময়ের দ্রুত চলে যাওয়া অন্যতম। অন্যদিকে, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের শেষ বই "বুক অব রেভেলেশন"-এ চারজন অশ্বারোহীর (Four Horsemen of the Apocalypse) রূপক দিয়ে মহামারি, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মৃত্যুকে চিত্রায়িত করা হয়েছে, যা মানবজাতির চূড়ান্ত হিসাবের দিনকে নির্দেশ করে (আসাদ, ১৯৮০)।

প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে আবার সময়কে লিনিয়ার বা সরলরৈখিক ভাবা হয় না; একে দেখা হয় সাইক্লিক বা চক্রাকার হিসেবে। সনাতন ধর্মে বলা হয়েছে চার যুগের কথা—সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এবং কলি। বর্তমান সময়কে ধরা হয় 'কলিযুগ' হিসেবে, যা অন্ধকার, অনৈতিকতা এবং অধর্মের চূড়ান্ত পর্যায়। এই যুগের শেষে মহাবিশ্বের ধ্বংস এবং পুনরায় এক নতুন সত্যযুগের সূচনা হবে (রাধাকৃষ্ণন, ১৯২৭)। ধর্মের এই বয়ানগুলো মানুষকে সর্বদা মনে করিয়ে দেয় যে, দৃশ্যমান এই জগৎ চিরস্থায়ী নয় এবং এর একটি অবধারিত সমাপ্তি রয়েছে।

বিজ্ঞানের সতর্কবার্তা: ডুমসডে ক্লক এবং মানবসৃষ্ট বিপর্যয়

ধর্ম যেখানে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক স্খলনকে প্রলয়ের কারণ বলে, বিজ্ঞান সেখানে আমাদের বস্তুগত উপাত্ত ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে এক বাস্তব মহাপ্রলয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও গবেষকদের তৈরি "ডুমসডে ক্লক" (Doomsday Clock) বা কেয়ামতের ঘড়ি এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ২০২৪ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত এই ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত বা প্রলয়ের ঠিক ৯০ সেকেন্ড আগে থমকে আছে (বুলিটিন অব দি অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস, ২০২৪)। মানব ইতিহাসের ইতিহাসে আমরা কখনোই ধ্বংসের এত কাছাকাছি আসিনি।

বিজ্ঞানীদের মতে, অ্যাপোক্যালিপ্স বা মহাবিনাশ আকাশ থেকে হঠাৎ নেমে আসবে না, বরং এটি আমাদের নিজেদের কর্মের ফল। অ্যানথ্রোপোসিন (Anthropocene) বা মানবপ্রভাবিত এই ভূতাত্ত্বিক যুগে এসে আমরা তিনটি বড় সংকটের মুখোমুখি:

  • জলবায়ু পরিবর্তন: বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তীব্র দাবদাহ এখন আর দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা।

  • অস্তিত্ববাদী প্রযুক্তিগত ঝুঁকি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) লাগামহীন নিয়ন্ত্রণ এবং জৈব-প্রযুক্তির অপব্যবহার মানবজাতির বিলুপ্তির কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অক্সফোর্ডের ফিলোসফার নিক বোস্ট্রম (বোস্ট্রম, ২০১৪)।

  • মহাজাগতিক ঘটনা: ডাইনোসরদের বিলুপ্তির মতো কোনো বিশাল গ্রহাণুর আঘাত কিংবা সূর্যের সুপার-ফ্লেয়ার যেকোনো মুহূর্তে পৃথিবীর চাকা থামিয়ে দিতে পারে।

দর্শন ও মনস্তত্ত্বের সংকট: অর্থহীনতা ও অ্যাপোক্যালিপ্টিক অবসেশন

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, প্রলয়ের এই ভয় আসলে মানুষের এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক অবসেশন বা মগ্নতা। ফরাসি দার্শনিক জঁ বদ্রিলার তার উত্তর-আধুনিক তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক মানুষ প্রতিনিয়ত মিডিয়া এবং হাইপার-রিয়েলিটির মাধ্যমে এক ধরণের কৃত্রিম প্রলয়ের স্বাদ পায় (বদ্রিলার, ১৯৯৪)। আমরা সিনেমা, গেম আর ফিকশনে এত বেশি ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, বাস্তব জীবনের সামান্য সংকটকেও আমাদের অবচেতন মন মহাপ্রলয় বলে ধরে নেয়।

আবার ফ্রেডরিক নিটশে বা আলবেয়ার কামুর মতো অস্তিত্ববাদী চিন্তাবিদদের আলোতে দেখলে, ঈশ্বরের অনুপস্থিতি বা নৈতিকতার শূন্যতাই মানুষের মনের আসল অ্যাপোক্যালিপ্স। বাহ্যিক জগৎ ধ্বংস হওয়ার আগেই যখন মানুষের ভেতরের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং জীবনের অর্থ ধ্বংস হয়ে যায়, তখনই মানুষ নিজের অজান্তেই এক মানসিক শেষ সময়ের মুখোমুখি দাঁড়ায়। এই শূন্যতাবাদের জন্মই মানুষকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে সে পৃথিবীকে অর্থহীন মনে করে ধ্বংসের প্রতীক্ষা করতে থাকে।

আমরা কি তবে সত্যিই শেষ সময়ে?

ধর্মের ভবিষ্যদ্বাণী, বিজ্ঞানের ডুমসডে ক্লক আর দর্শনের অস্তিত্ববাদী সংকট—সবকিছুই প্রমাণ করে যে আমরা মানব ইতিহাসের অন্যতম এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। তবে ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, মানবজাতি প্লেগ মহামারি, বিশ্বযুদ্ধ কিংবা কৃষ্ণগহ্বরের মতো অন্ধকারের সময়ও পার করেছে এবং প্রতিবারই টিকে থাকার নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে।

প্রলয় বা কিয়ামত যখনই আসুক না কেন, বর্তমানের এই সংকট আসলে আমাদের জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কতা। এটি আমাদের শেখায় প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হতে, নৈতিকতা পুনরুদ্ধার করতে এবং প্রযুক্তির অন্ধ মোহ থেকে বেরিয়ে এসে মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে। বাহ্যিক পৃথিবী ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে কি না—তা ভাবার চেয়েও জরুরি হলো, আমরা আমাদের ভেতরের মানবিক সত্তাটিকে বাঁচিয়ে রাখছি কি না। কারণ ভেতরের মানুষের মৃত্যু ঘটলে, বাইরের পৃথিবী অক্ষত থাকলেও তা আসলে এক জীবন্ত অ্যাপোক্যালিপ্স ছাড়া আর কিছুই নয়।


সম্পাদনায়, 

মো. রিদওয়ান আল হাসান

প্রকাশনায়,

আব্দুল্লাহ আল মামুন


তথ্যসূত্র ও সাইটেশন (References)

  • আসাদ, এম. (১৯৮০). দ্য মেসেজ অব দ্য কুরআন. দার আল-আন্দালুস. (Asad, M. - The Message of the Qur'an)

  • রাধাকৃষ্ণন, এস. (১৯২৭). ইন্ডিয়ান ফিলোসফি (ভলিউম ১). অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস. (Radhakrishnan, S. - Indian Philosophy)

  • বুলিটিন অব দি অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস. (২০২৪). এ টাইম অব আনপ্রিসিডেন্টেড ডেঞ্জার: ইট ইজ স্টিল ৯০ সেকেন্ডস টু মিডনাইট. (Bulletin of the Atomic Scientists)

  • বোস্ট্রম, এন. (২০১৪). সুপারইন্টেলিজেন্স: প্যাথস, ডেঞ্জার্স, স্ট্র্যাটেজিস. অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস. (Bostrom, N. - Superintelligence)

  • বদ্রিলার, জে. (১৯৯৪). সিমুলাক্রা অ্যান্ড সিমুলেশন. ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান প্রেস. (Baudrillard, J. - Simulacra and Simulation)

#কিয়ামত
#সাহিত্যনামাবাংলাদেশ
#শেষযামানা
নবীনতর পূর্বতন