সাহিত্যনামা সম্পাদকীয়
জ্ঞানের অন্বেষণ ও সত্যের চর্চা মানব সভ্যতার বিকাশের সমান্তরাল এক চিরন্তন প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হলো উচ্চশিক্ষা। উচ্চশিক্ষা নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে দক্ষতা অর্জন বা পেশাগত যোগ্যতার সনদ তৈরি করে না, বরং মানুষের চিন্তার দিগন্তকে প্রসারিত করে, সমাজকে প্রগতির পথে এগিয়ে নেয় এবং নতুন জ্ঞানের জন্ম দেয়। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে উচ্চশিক্ষার ধারণাটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়েছে। বর্তমান সময়ে এসে এই রূপান্তরের ধারাকে বুঝতে হলে উচ্চশিক্ষার মৌলিক দর্শন, এর ঐতিহাসিক বিবর্তন, আরবের অনন্য অবদান এবং গবেষণার অপরিহার্যতার দিকে আলো ফেলা প্রয়োজন।
উচ্চশিক্ষার দর্শন: সত্যের অন্বেষণ ও মননশীলতার বিকাশ
উচ্চশিক্ষার মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে দর্শনের ওপর। জার্মান দার্শনিক ভিলহেল্ম ফন হুমবোল্ট (Wilhelm von Humboldt) আধুনিক উচ্চশিক্ষার যে রূপরেখা দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি জোর দিয়েছিলেন শিক্ষার স্বাধীনতা (Lehrfreiheit) এবং শেখার স্বাধীনতার (Lernfreiheit) ওপর। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হলো শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের যৌথ প্রয়াসে সত্যের সন্ধান করা, কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় বা অর্থনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা নয়।
উচ্চশিক্ষার দর্শন মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত:
জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বাধীনতা: কোনো প্রকার পূর্বনির্ধারিত ধারণার বাইরে গিয়ে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে সত্যকে খোঁজা এবং প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সাহস অর্জন করা।
মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ: সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মননশীল, সংবেদনশীল ও দূরদর্শী মানুষ তৈরি করা, যারা সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক সমাজ বিনির্মাণে অবদান রাখবে।
সামাজিক দায়বদ্ধতা: জ্ঞানকে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে নিয়োজিত করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপাদিত জ্ঞান যেন লাইব্রেরির তাকে বন্দি না থেকে জনমানুষের মুক্তির পথ দেখায়।
জন হেনরি নিউম্যান তাঁর বিখ্যাত আকর গ্রন্থ দ্য আইডিয়া অব а ইউনিভার্সিটি (The Idea of a University)-তে লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন একটি জায়গা যেখানে সমস্ত শাখা-প্রশাখার জ্ঞান একীভূত হয় এবং শিক্ষার্থীরা উদার শিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের মেধা ও চরিত্রের বিকাশ ঘটায়। এটি কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির সুতিকাগার।
উচ্চশিক্ষার বিবর্তন: প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের ইতিহাস
উচ্চশিক্ষার আধুনিক রূপটি একদিনে তৈরি হয়নি। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ পর্যন্ত এর একটি দীর্ঘ বিবর্তন রয়েছে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সূচনা
প্রাচীন ভারতের নালন্দা ও তক্ষশীলা, কিংবা গ্রিসের প্লেটোর একাডেমিকে উচ্চশিক্ষার আদি রূপ হিসেবে গণ্য করা যায়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক এবং আইনি স্বায়ত্তশাসন সম্পন্ন আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয় মধ্যযুগীয় ইউরোপে। ১০৮৮ সালে ইতালিতে প্রতিষ্ঠিত বলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (University of Bologna) এবং পরবর্তীতে প্যারিস ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এই ধারার অগ্রপথিক। সে সময় উচ্চশিক্ষা মূলত ধর্মতত্ত্ব, আইন, চিকিৎসাবিদ্যা এবং উদার কলা (Liberal Arts) চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
আরবের অবদান ও বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়
জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনে আরব্য ও ইসলামি সভ্যতার অবদান এক অনন্য অধ্যায়। ইউরোপীয় রেনেসাঁর বহু আগেই মুসলিম বিশ্বের মনীকাষী ও উদ্যোক্তারা উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখায় আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন। বর্তমানের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কাঠামো আমরা দেখি, তার অনেক মৌলিক উপাদানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল মধ্যযুগীয় আরব্য ও ইসলামি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলোতে।
উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল এবং যুগান্তকারী ঘটনাটি ঘটেছিল মরক্কোর ফেস নগরীতে। ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে একজন দূরদর্শী মুসলিম নারী, ফাতিমা আল-ফিহরি, প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্ববিদ্যালয় আল-কারাওইন (University of Al-Qarawiyyin)। ইউনেস্কো (UNESCO) এবং গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি অনুযায়ী, এটিই বিশ্বের প্রাচীনতম এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়।
ফাতিমা আল-ফিহরি ছিলেন এক ধনী ব্যবসায়ীর কন্যা। পিতার মৃত্যুর পর প্রাপ্ত বিপুল সম্পত্তি তিনি কোনো ব্যক্তিগত বিলাসব্যসনে ব্যয় না করে একটি মসজিদ ও সংলগ্ন উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে উৎসর্গ করেন। আল-কারাওইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা शास्त्र, গণিত, রসায়ন এবং ব্যাকরণের মতো ধর্মনিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয় পড়াত। বর্তমান অ্যাকাডেমিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ যেমন—ডিগ্রি প্রদান, নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম (Curriculum) এবং অ্যাকাডেমিক গাউনের মতো ধারণার আদি উৎস এই আরব্য প্রাতিষ্ঠানিক মডেল।
পাশাপাশি নবম শতাব্দীতে বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত 'বায়তুল হিকমাহ' ছিল একাধারে একটি অনুবাদ কেন্দ্র, লাইব্রেরি ও অ্যাকাডেমি। ইবনে সিনা (Avicenna) চিকিৎসা বিজ্ঞানের দর্শন ও পদ্ধতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন, যার টেক্সটবুক ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শতাব্দীর পর শতাব্দী পড়ানো হয়েছে। আল-ফারাবি এবং ইবনে রুশদ (Averroes) এর হাত ধরে অ্যারিস্টটলের দর্শন পুনর্জন্ম লাভ করে, যা পরবর্তীতে থমাস অ্যাকুইনাসের মতো ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের প্রভাবিত করে উচ্চশিক্ষার তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তোলে।
হুমবোল্টীয় মডেল এবং আধুনিকায়ন
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে, ১৮১০ সালে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। ভিলহেল্ম ফন হুমবোল্টের নেতৃত্বে শিক্ষাদান এবং গবেষণাকে প্রথমবারের মতো একই ছাতার নিচে নিয়ে আসা হয়। এই মডেলটিই সারা বিশ্বে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এখানে বলা হয়, একজন অধ্যাপক পুরনো জ্ঞান বিতরণ করবেন না, তিনি গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবেন এবং শিক্ষার্থীরা সেই技术的 অংশীদার হবে।
ম্যাসফিকেশন ও বাণিজ্যিকীকরণ
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে উচ্চশিক্ষায় 'ম্যাসফিকেশন' বা গণতন্ত্রীকরণের যুগ শুরু হয়। উচ্চশিক্ষা আর সমাজের উচ্চবিত্তের একচেটিয়া অধিকার রইল না, সাধারণ মানুষের জন্য এর দুয়ার খুলে গেল। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে নব্য-уদারবাদী (Neo-liberal) অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রভাবে উচ্চশিক্ষার জগতে করপোরেট সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যা অনেক সময় এর মূল দার্শনিক চেতনাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।
উচ্চশিক্ষার তাত্ত্বিক কাঠামো: প্রধান চিন্তাবিদ ও তত্ত্বসমূহ
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য, কার্যাবলি এবং সামাজিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী ও শিক্ষাতাত্ত্বিক নানামুখী তত্ত্ব প্রদান করেছেন। সাহিত্যিক ও অ্যাকাডেমিক আলোচনার জন্য এই তত্ত্বগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:
১. পিয়ের বুর্দিউ (Pierre Bourdieu): সাংস্কৃতিক পুঁজি তত্ত্ব (Cultural Capital Theory)
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিউ উচ্চশিক্ষাকে সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষমতার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ নয়। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা ভাষা, আচরণ ও সংস্কৃতির যে বিশেষ রূপ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, তাকে বুর্দিউ 'সাংস্কৃতিক পুঁজি' বলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই নির্দিষ্ট সংস্কৃতিকেই বেশি মূল্যায়ন করে। ফলে উচ্চশিক্ষা সামাজিক রূপান্তরের বদলে বিদ্যমান শ্রেণীকাঠামোকে পুনরুৎপাদন (Social Reproduction) করে।
২. আলবার্টো মেলুচ্চি ও অ্যালাইন টুরেন: নিউ সোশ্যাল মুভমেন্ট থিওরি (New Social Movement Theory)
এই তাত্ত্বিকদের মতে, আধুনিক Research ও Teaching বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান বিতরণের জায়গা নয়, বরং এগুলো হলো সামাজিক আন্দোলনের সুতিকাগার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রগতিশীল চেতনা ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করে। পরিবেশ আন্দোলন, মানবাধিকার কিংবা নাগরিক অধিকারের মতো নতুন সামাজিক আন্দোলনগুলোর তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক নেতৃত্ব তৈরি হয় উচ্চশিক্ষার আঙিনা থেকেই।
৩. পাওলো ফ্রেইরি (Paulo Freire): মুক্তিকামী শিক্ষা ও ব্যাংকিং মডেল (Banking Model of Education)
ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি তাঁর পেডাগজি অব দ্য অপ্রেসড (Pedagogy of the Oppressed) গ্রন্থে প্রথাগত শিক্ষাদানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ফ্রেইরি প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিকে 'ব্যাংকিং মডেল' বলেছেন, যেখানে শিক্ষক শিক্ষার্থীর মাথায় তথ্য জমা করেন, যেন শিক্ষার্থী একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। এর বিপরীতে তিনি 'সমস্যা-উত্থাপনকারী শিক্ষা' (Problem-posing Education) ও সংলাপের (Dialogue) ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের চেতনাকে মুক্ত করা এবং তাকে চারপাশের শোষণমূলক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শেখানো।
৪. জন ডিউই (John Dewey): প্রগমাটিজম বা বাস্তবতাবাদ (Pragmatism)
আমেরিকান দার্শনিক জন ডিউই উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী ও অভিজ্ঞতার আলোয় দেখার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, শিক্ষা কোনো ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নয়, শিক্ষা নিজেই একটি জীবনপ্রক্রিয়া। উচ্চশিক্ষায় তত্ত্বের পাশাপাশি প্রায়োগিক বা লার্নিং বাই ডুয়িং (Learning by doing) পদ্ধতি থাকা আবশ্যক, যা একজন শিক্ষার্থীকে গণতান্ত্রিক সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।
গবেষণার প্রয়োজনীয়তা: নতুন জ্ঞানের জন্ম ও বৈশ্বিক অগ্রগতি
গবেষণা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুসফুস। গবেষণা ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় আর দশটি সাধারণ পাঠশালার চেয়ে আলাদা হতে পারে না। জ্ঞানের জগৎ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, আর এই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হলো মৌলিক ও ফলিত গবেষণা।
জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশ ও ক্রিটিক্যাল থিংকিং
গবেষণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্ধবিশ্বাসের বদলে যুক্তিবাদী মনস্তত্ত্ব তৈরি করে। এটি ডেটা বা তথ্যের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করতে শেখায়। ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স অ্যানালিসিস বা সমালোচনামূলক আলোচনা পদ্ধতির মাধ্যমে সমাজের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্য ও মিথস্ক্রিয়া উন্মোচন করা সম্ভব হয়, যা গবেষণার মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে।
জাতীয় ও বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান
জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান কোনো মুখস্থ বিদ্যা দিতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন গভীর অ্যাকাডেমিক অনুসন্ধান। একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে নিজস্ব প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকারভেদ: টিচিং বনাম রিসার্চ ইউনিভার্সিটি
উদ্দেশ্য, কার্যপদ্ধতি এবং কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রধানত দুটি ধারায় ভাগ করা যায়:
১. টিচিং ইউনিভার্সিটি (Teaching Universities)
এই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক ফোকাস বা মনোযোগ থাকে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদান, পাঠ্যক্রমের সফল সমাপ্তি এবং শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট পেশার জন্য প্রস্তুত করার ওপর। এখানে অধ্যাপকদের মূল মূল্যায়ন হয় তাঁদের শিক্ষাদান পদ্ধতির দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে।
বৈশিষ্ট্য: ক্লাস সাইজ সাধারণত ছোট হয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বেশি থাকে। স্নাতক পর্যায়ের পাঠ্যদানকে এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
উদাহরণ: যুক্তরাষ্ট্রের লিবারেল আর্টস কলেজগুলো (যেমন: উইলিয়ামস কলেজ বা অ্যামহার্স্ট কলেজ) এর চমৎকার উদাহরণ। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ এবং বেশ কিছু নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই ধারার কাছাকাছি, যেখানে গবেষণার চেয়ে একাডেমিক ডিগ্রি অর্জনের ওপর জোর বেশি থাকে।
২. রিসার্চ ইউনিভার্সিটি (Research Universities)
এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল লক্ষ্য হলো গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের সীমানাকে প্রসারিত করা। এখানে আন্ডারগ্রাজুয়েট বা স্নাতক শিক্ষার পাশাপাশি পোস্টগ্রাজুয়েট (মাস্টার্স, পিএইচডি) এবং পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণাকে ব্যাপক প্রাধান্য দেওয়া হয়।
বৈশিষ্ট্য: বিশাল ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, বড় অঙ্কের গবেষণা ফান্ড এবং বিশ্ববিখ্যাত জার্নালে নিয়মিত আর্টিকেল প্রকাশ এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান লক্ষণ। এখানকার শিক্ষকরা অ্যাকাডেমিক গবেষণায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন।
উদাহরণ: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে হার্ভارد বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT), অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা এশিয়ার মধ্যে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (NUS) এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমাদের ভূখণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহাসিকভাবে একটি উচ্চমানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেখানে প্রতিবছর অসংখ্য মৌলিক গবেষণা ও মনোগ্রাফ উৎপাদিত হয়।
সমাপনী ভাবনা
উচনাশিক্ষা কোনো স্থির বিষয় নয়, এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। বর্তমান যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ডিগ্রি দেওয়ার কারখানায় রূপান্তরিত করলে চলবে না। শিক্ষার আসল দর্শনকে ধারণ করে গবেষণার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যখন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তচিন্তা, বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা এবং নিরলস জ্ঞান অন্বেষণের মেলবন্ধন ঘটবে, তখনই উচ্চশিক্ষার আসল উদ্দেশ্য সফল হবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্র প্রগতির আলোয় উদ্ভাসিত হবে।
তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১. Newman, J. H. (1852). The Idea of a University. London: Longmans, Green, and Co.
২. Humboldt, W. von. (1970). On the Spirit and the Organisational Framework of Intellectual Institutions in Berlin. Minerva, 8(2), 242-267.
৩. Altbach, P. G. (2013). The International Imperative in Higher Education. Rotterdam: SensePublishers.
৪. Al-Hassani, S. T. S. (2012). 1001 Inventions: The Enduring Legacy of Muslim Civilization. Washington, D.C.: National Geographic.
৫. Bourdieu, P., & Passeron, J. C. (1990). Reproduction in Education, Society and Culture. London: Sage Publications.
৬. Freire, P. (1970). Pedagogy of the Oppressed. New York: Herder and Herder.
৭. Makdisi, G. (1981). The Rise of Colleges: Institutions of Learning in Islam and the West. Edinburgh University Press.
৮. ঢালী, হাসান আলী (২০১৪)। শিক্ষার দর্শন ও সমাজতত্ত্ব। ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।
