আর্তনাদ

মো. লতিফুর রহমান খান

উৎসর্গ: ​"রাতের নিস্তব্ধতায় হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আর অব্যক্ত কথাগুলোকে..."

লেখক মো. লতিফুর রহমান খান

সন্ধ্যা ৭টা। নীল কোচিংয়ের ক্লাস শেষ করিয়ে বাসায় ফিরছে। চেনা শহরের চেনা রাস্তায় একলা হাঁটার সময় হঠাৎ করেই তার ফোনে একটা মেসেজ ভেসে উঠল—
'প্রিয় জয়ী, কেমন আছো? আগামীকাল কি সময় হবে দেখা করার মতো?'
নীল খুবই শান্ত প্রকৃতির মেয়ে। মেসেজটি দেখে বুকের ভেতরটা চট করে কেঁপে উঠলেও সে কোনো উত্তর দিল না। নানান কথা ভাবতে ভাবতে একরকম উদাস মনেই বাসায় চলে আসলো সে। অবশেষে রুমে গিয়ে, নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ফিরতি মেসেজে লিখল, 'আসবো, তবে মাত্র ২০ মিনিটের জন্য!'
পরদিন ঠিক সময়মতো সেই চিরচেনা জায়গায় প্লাবন দাঁড়িয়ে ছিল তার অপেক্ষায়। নীলকে দেখেই প্লাবনের চোখেমুখে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা আর বিষাদ খেলা করে গেল। সে মৃদু হেসে বলল, "আমার জয়ীকে ঠিক আগের মতোই লাগছে!"

নীল চোখে চোখ মেলালো না, কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বলল, "তুমিই তো বলেছিলে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, অতীতের জন্য ভেঙে পড়া যাবে না। তোমার কথা মানবো না, তা কি কখনো হয়েছে?"

প্লাবন অবাক চোখে এক পলকে তাকিয়ে রইল তার দিকে। বুকের ভেতর জমানো দীর্ঘশ্বাসটা চেপে রেখে শুধাল, "কেমন আছো তুমি, নীল?"

"জীবনের বর্তমান কথা চিন্তা করলে ভালোই আছি বলতে পারো। কারণ দৃষ্টি নিবদ্ধ, সময় সীমিত; গন্তব্য এখনো দূর—বহুদূর!"

"তুমি কি এখনো সে স্বপ্নকে লালন করেই আছো?"

"হ্যাঁ, স্বপ্ন ছাড়া কি লক্ষ্য অর্জন হয়?" নীলের গলায় এবার কিছুটা অভিমানী সুর ফুটে উঠল, "আর যে স্বপ্নের জন্য তুমি আমাকে ছেড়ে গেছো, সে স্বপ্নটাও তো একা। আমি না হয় সেই একা স্বপ্নকে নিয়েই থাকি। অবশ্যই আমি সফল হবো একদিন।"

প্লাবন নীলকে খুব ভালো করে চেনে, তাই তার ভেতরের লুকানো কষ্টটা বুঝতে পেরে বলল, "আশীর্বাদ করি তুমি সফল হও, তোমার স্বপ্নের চেয়েও বড় হও।"

নীল এবার নিজের কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে সরাসরি মূল কথায় এলো, "বলো, কেন হঠাৎ আমাকে দেখা করতে বললে?"

"তোমাকে ডেকেছি আমার দেশের বাইরে চলে যাওয়ার কথা জানাতে।" প্লাবন একটু থামল, যেন নিজের কণ্ঠটাকে শক্ত করার চেষ্টা করল, "স্কলারশিপ নিয়ে স্পেন চলে যাচ্ছি পড়াশোনা করার জন্য।"

কথাটা শোনামাত্রই নীলের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। চারপাশের চেনা পৃথিবীটা এক নিমেষে অচেনা লাগল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, প্লাবনের ডাক উপেক্ষা করেই দ্রুত স্থান ত্যাগ করে চলে গেল।

সে মনের গভীরে কত শত আশা নিয়ে এসেছিল, হয়তো প্লাবন তার অভিমান ভেঙে আবারও তাকে আগলে নিতে চাইবে। এই আশাটুকু তার মনে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনেছিল, কিন্তু তা আর হলো কই! প্লাবন নিজেও তো নীলকে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের মাঝের ভুল বোঝাবুঝি আর প্রকৃতির নীরব প্রতিরোধ দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বাসায় ফিরে নীল জানালার গ্রিল ধরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আজ চার বছরের পুরনো প্রতিটা স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। দীর্ঘ ৪ বছরের এত সুন্দর একটা সম্পর্ক এক মুহূর্তে বিচ্ছেদে রূপ নিয়েছিল। লোকে হয়তো ভাবত, প্লাবন নীলের স্বপ্নকে শ্রদ্ধা করেনি বলেই বিচ্ছেদ হয়েছে, কিন্তু সত্যিটা নীল জানত। নীল কখনো প্লাবনের ছোট ছোট মুহূর্ত, তার দেওয়া নিঃস্বার্থ ত্যাগ বা উপহারগুলোকে মনে মনে সম্মান করলেও, নিজের অজান্তেই সেগুলোকে অবহেলা করে ফেলত। একটা মানুষের ভালোবাসাকে অনবরত অবহেলা করতে করতে যে তীব্র বিষাদের জন্ম হয়, নীল তা কোনোদিন বুঝতেও পারেনি, আর তা কাটানোর চেষ্টাও করেনি। প্লাবন একসময় বুঝতে পেরেছিল—শুধু একপাক্ষিক ভালোবাসা দিয়ে সম্পর্ক বাঁচে না, যদি না সেখানে জীবনসঙ্গীর থেকে সমান সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধটুকু পাওয়া যায়। তাই বাধ্য হয়েই সে বিচ্ছেদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

নীল এখন নিজের ভুলগুলো প্রতিটা সেকেন্ডে অনুভব করতে পারে, কিন্তু প্রকৃতি তো ততদিনে ফেরার সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে! একাকিত্ব আর তীব্র অনুশোচনার নিঃসঙ্গতা তাকে চারপাশ থেকে ক্রমশ শ্বাসরোধ করে ধরছে।

ঠিক তিন দিন পর, প্লাবনের বন্ধু বায়েজিদের কল এলো নীলের ফোনে। নীল কিছুটা অবাক হয়ে কাঁপতে থাকা হাতে কলটি রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক বুকফাটা আর্তনাদ। প্লাবন আর নেই! মস্তিষ্কে তীব্র রক্তক্ষরণ হয়ে সে এই পৃথিবীর সব মায়া কাটিয়ে চলে গেছে!


তাকে যখন হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখন তার টেবিলের ডায়েরিতে একটা শেষ চিরকুট লেখা ছিল নীলের নামে—

‘প্রিয় জয়ী, তোমার প্রতি আমার কোনো রাগ বা ক্ষোভ নেই। তবে তোমাকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে আগলে রাখতে না পারায় নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। তাই আজ তোমাকে চিরতরে আমার থেকে মুক্ত করে দিয়ে চলে যাচ্ছি, তুমি অনেক ভালো থেকো।’

চিঠির প্রতিটা অক্ষর নীলের চোখের জলে লেপ্টে একাকার হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা যেন কেউ জীবন্ত দুমড়ে-মুচড়ে দিল, অথচ পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে থাকা গলা দিয়ে একটা তীব্র চিৎকারও বের হলো না। শূন্য ঘরের এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে সে আজ বুকের সমস্ত হাহাকার দিয়ে উপলব্ধি করছে—

"মানুষ বেঁচে থাকা পর্যন্ত আসলে কাউকে ভুলে যেতে পারে না। সময়ের স্রোতে স্মৃতির আঙিনায় হয়তো ধুলোর আস্তরণ জমে, কিন্তু মনের গভীরে খোদাই করা নামটা কখনো মুছে যায় না!"
নবীনতর পূর্বতন