শুভবোধ, নৈতিকতা আর চিন্তাশীলতার বাতিঘর আবুল কাসেম ফজলুল হকের বিদায়


ইন্তেকাল করেছেন সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আজ (৫ জুলাই) দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের এক বড় নাম অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তাঁর মৃত্যু দেশের জন্য একটি বড় ক্ষতি। তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন, গবেষণা করেছেন এবং লিখেছেন। সারা জীবন সত্য, ন্যায় ও মানুষের কল্যাণের কথা বলেছেন। ক্ষমতা কিংবা সুবিধার জন্য নিজের অবস্থান বদলানোর মানুষ তিনি ছিলেন না। তাঁর সততা ও নৈতিক দৃঢ়তার জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পাঠকের কাছে সমানভাবে সম্মানিত ছিলেন।

১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় তাঁর জন্ম। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ময়মনসিংহে। ১৯৫৯ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৬৫ সালে স্নাতক এবং ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, আহমদ শরীফ, নীলিমা ইব্রাহিম ও হুমায়ুন আজাদের সান্নিধ্য তাঁর চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে। মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সাহিত্যবোধ এবং সমাজ সম্পর্কে গভীর আগ্রহ সেই সময় থেকেই গড়ে ওঠে। পরে তিনি নিজের স্বতন্ত্র চিন্তার পথ তৈরি করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রায় চার দশক শিক্ষকতা করেছেন। বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। অসংখ্য শিক্ষার্থী তাঁর কাছে পাঠ নিয়েছেন। শ্রেণিকক্ষে সাহিত্য পড়ানোর পাশাপাশি তিনি সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস ও মানুষের জীবন নিয়েও আলোচনা করতেন। শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে উৎসাহ দিতেন।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মনে করতেন, মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে মানুষের বিশ্বাস ও বাস্তবতাকে বুঝতে হবে। দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মপ্রাণ। তাই তাদের বিশ্বাসকে আঘাত করে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। মানুষের শুভবোধ জাগিয়ে তোলাই তিনি বেশি জরুরি মনে করতেন। তাঁর লেখায় যুক্তি আছে, মানবিকতা আছে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ আছে।

১৯৮২ সাল থেকে তিনি 'লোকায়ত' নামে একটি মননশীল পত্রিকা সম্পাদনা করে আসছিলেন। তিনি একুশটির বেশি বই লিখেছেন। নজরুল রচনাবলীর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন। ২০০০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্বদেশ চিন্তা সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্র, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি, সাহিত্য, ইতিহাস ও সমাজ নিয়ে তাঁর গবেষণা এবং প্রবন্ধ পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়েছে।

২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরও তাঁর জীবনযাপনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি আগের মতোই সাদাসিধে জীবন কাটিয়েছেন। পদমর্যাদার চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি ছিল ছেলে ফয়সাল আরেফিন দীপনের হত্যাকাণ্ড। ২০১৫ সালে জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী দীপন উগ্রবাদীদের হাতে নিহত হন। সেই শোক তাঁকে সারাজীবন বহন করতে হয়েছে। তবু তিনি ঘৃণার ভাষা বেছে নেননি। জ্ঞানচর্চা, মানবিকতা এবং মুক্তচিন্তার পক্ষে তাঁর অবস্থান অটুট ছিল।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য একটি উদাহরণ। সততা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে একজন মানুষ কীভাবে সারাজীবন কাজ করে যেতে পারেন, তাঁর জীবন সেই শিক্ষাই দেয়। তাঁর লেখা, চিন্তা এবং আদর্শ বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে দীর্ঘদিন আলো ছড়াবে।

সাহিত্যনামা তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানায়।

নবীনতর পূর্বতন