সৃজনশীলতা আর মানবিকতার ফেরিওয়ালা মতিউর রহমান সুমন

সাহিত্যনামা সম্পাদকীয়

মতিউর রহমান সুমন (এম. আর. সুমন)

নিজ গ্রামের স্কুলে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে পথশিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা, মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের পরিচর্যা কিংবা বৃক্ষরোপণ ও রক্তদান কার্যক্রম, সমাজসেবার নানা ক্ষেত্রে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন মতিউর রহমান সুমন। নিয়মিত লেখালেখি তো আছেই! কৃষিবিদ, ব্যাংকার ও লেখক পরিচয়ের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্যও তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন মানুষের কাছে।

গ্রামের স্কুলে বই পড়ার আগ্রহ বাড়াতে শৈশবের সেই বিদ্যালয়েই নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘মাহতাব উদ্দিন স্মৃতি পাঠাগার’। বিদ্যালয়ের প্রয়াত শিক্ষক মাহতাব উদ্দিনের স্মৃতিকে ধরে রাখতেই পাঠাগারটির নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে।

মানবিকতার আরেকটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদীন পার্ক এলাকায় চা বিক্রি করা এক শিশুর জীবনে। সবাই তাকে ‘বুলেট’ নামে চিনলেও সুমন তার প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরেন মো. সুলাইমান হিসেবে। পরবর্তীতে নিজ উদ্যোগে তাকে ১২৪ নং পুলিশ লাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করান।
এ বিষয়ে সুমন বলেন, “সামান্য সহযোগিতার অভাবে অনেক শিশু পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। পরে তারা টোকাই বা পথশিশু হিসেবে পরিচিত হয়। এদের অনেকেই একসময় বিপথগামী হয়ে নেশা, চুরি বা ছিনতাইয়ের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। সময়মতো সহযোগিতা পেলে তাদের জীবন বদলে যেতে পারে।”

ময়মনসিংহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানো মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের প্রতিও রয়েছে তার বিশেষ নজর। শহরের পরিচিত এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি মিরাজকে চুল-দাড়ি কেটে, গোসল করিয়ে ও নতুন পোশাক পরিয়ে নতুন জীবনযাপনের সুযোগ করে দেন তিনি। একইভাবে সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকায় অবস্থান করা আরেক ব্যক্তিকেও পরিচ্ছন্ন করে নতুন পোশাক পরিয়ে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
এছাড়াও বৃক্ষরোপণ, রক্তদান, শীতবস্ত্র বিতরণ, ঈদ উপহার প্রদান এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে তার জীবনে।

মতিউর রহমান সুমনের জন্ম হালুয়াঘাটে হলেও বেড়ে ওঠা গফরগাঁওয়ে। বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহ শহরে বসবাস করছেন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি পথশিশুদের উন্নয়ন, রক্তদান কর্মসূচি ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বাঁধন ও রোভার স্কাউটের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন।

বর্তমানে তিনি জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত। কৃষিবিদ হয়েও ব্যাংকিং পেশায় আসার বিষয়ে তিনি বলেন, “জীবন বৈচিত্র্যময়। সুযোগ থাকলে যে কেউ যেকোনো পেশায় যেতে পারে। তবে আমি চাই না একজন কৃষিবিদ ব্যাংকার হোক। কৃষি খাতে যত পদ রয়েছে, তা কৃষিবিদ দিয়েই পূরণ হয়, বাকি কৃষিবিদরা কী করবে, অন্যরা কোথায় যাবে? আমাদের কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।”

চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের পেশা পরিবর্তনের বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, দেশের চাহিদা ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতা বিবেচনা করে উচ্চশিক্ষার আসনসংখ্যা নির্ধারণ করা উচিত।

সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি লেখালেখিতেও সক্রিয় মতিউর রহমান সুমন। তার লেখায় উঠে আসে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সমাজজীবনের নানা অনুষঙ্গ। তিনি গফরগাঁওয়ের প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে ‘এক মলাটে গফরগাঁও’ প্রথম খণ্ড প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

২০২৫ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার গল্পগ্রন্থ ‘অন্তর্দাহ’। বইটিতে মোট আটটি গল্প স্থান পেয়েছে, যেখানে জীবনের উত্থান-পতন, মানবিক অনুভূতি ও সামাজিক বাস্তবতা উঠে এসেছে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সুমন জীবনের নানা সংগ্রাম কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। হতাশাগ্রস্ত বেকার তরুণদের অনুপ্রেরণা দিতে ইউটিউব চ্যানেলে নিয়মিত কর্মসংস্থান ও ব্যাংকিংবিষয়ক শিক্ষামূলক কনটেন্ট প্রকাশ করেন।

অবসরে কী করেন জিজ্ঞেস করলে একটু মুচকি হেসে বলেন, সময়ের সমুদ্রে থেকেও আমাদের সময় নেই অবসরের, লেখালেখি করি, বই পড়ি, ভ্রমণ করি অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে। মাঝে মধ্যে শখ করে ফুটবল খেলি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, মানুষের পাশে থেকে সমাজের জন্য কাজ করে যেতে চান। তার বিশ্বাস, জীবনে উত্থান-পতন থাকবেই, তবে হতাশ হলে চলবে না। মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
নবীনতর পূর্বতন