ভালোবাসার সংজ্ঞা

জেহান আলী

“ভালবাসার সংজ্ঞা দাও” — কিছু মানুষ কথাটা এমনভাবে বলে, যেন ভালবাসা কোনো বিরল পাখি, যাকে শব্দের খাঁচায় বন্দী করা যায়। আর যতবারই এই প্রশ্নটা শুনি — মানুষের কোলাহল থেকে আরও একটু দূরে সরে যেতে থাকি আমি, শরণার্থীর মতো আশ্রয় খুঁজি নিজের আত্মার নীরব কোনো ঘরে, সাথে সাথে উঁকি দিয়ে যায় অদ্ভুত এক বিরক্তি, যার কারণ আমি নিজেও পুরোপুরি বুঝি না।

আচ্ছা তুমি-ই বলো, কোন কৃষককে কৃষিকাজের সংজ্ঞা দিতে বলা হয় — যখন কিনা তার হাত কাদা মাটির ভেতর ডুবে আছে? কোন শিল্পীকে ক্যানভাসের রঙ শুকানোর আগেই শিল্পের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করা হয়? প্রেমিকরা কি চাষা নয়? শিল্পী নয় তারা? অদৃশ্য ক্ষেতে আবাদ করে, আকাঙ্ক্ষার ঋতু থেকে মমতার শস্য ফলায় তারা; আনন্দ বেদনার এমন সব নতুন রং মিশিয়ে চলে, যার নাম কোনো অভিধান কখনো লিখে রাখতে পারেনি।
“আর তোমার কথা? তোমার সংজ্ঞাই বা ঠিক কেমন?” জিজ্ঞেস করে ওরা।

আমার কথা? আমার আবার কি কথা? আমার একটা অংশ ভরে থাকে গভীর কৃতজ্ঞতায়, ওই যে — আমি তোমাকে পেয়েছি, অথবা হয়ত তুমি পেয়েছ আমাকে — আর তোমার উপস্থিতি আমার জীবনে নেমে এসেছে — যেভাবে বৃষ্টি নেমে আসে তৃষ্ণার্ত মাটির বুকে। তখন থেকে তোমার আকর্ষণ আমার ভিতরে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে — আমি যে আর বুঝতে পারি না, কোথায় আমার চিন্তার শেষ আর কোথায় তোমার শুরু।

আর যে অংশটা বাকি রয়ে গেল — মাঝে মাঝে দেখি কেমন যেন ছোটাছুটি করে সে, যেন ভীষণ ব্যস্ত এক অদ্ভুত কাজে — কখনো দেখি সে আর আমি নেই — তুমি হয়ে গেছে। ধৈর্য ধরে আমার অন্তহীন বকর বকর শুনছ তুমি, এই তো যেমন এই কথা গুলো — যাদের কিনা আসলে কোনো ব্যাখ্যারই প্রয়োজন ছিল না। আবার মাঝে মাঝে দেখি ভালবাসা নিজেই আমাদের পাশে বসে কেমন যেন হাসে। ও আমার প্রিয়, ভালবাসা হয়ত ভাষা নয়, হয়ত সে বাতাসের মতো। সে না চায় কোনো সংজ্ঞা, না দাবী করে আত্মপক্ষ সমর্থন। সে শুধু চায় তাকে শ্বাসের মতো টেনে নেয়া হোক বুকের গহীনে। আর সেই গ্রহণের মধ্য দিয়েই, নীরবে, সে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে — আজ, কাল, অনন্তের তরে।
নবীনতর পূর্বতন