অর্থের রূপান্তর

জেহান আলী

কোনো কিছুরই মালিকানা দাবি করি না আমি — কেমন করেই বা করব বলো, যখন কিনা আমি নিজে আমার রবের অযুত লক্ষ বান্দার একজন মাত্র? যদি কোনো চিন্তা আমার অন্তরের আকাশে জেগেও ওঠে, আমার জেনে রাখা প্রয়োজন যে, হৃদয় যা প্রত্যক্ষ করেছে সেই তুলনায় ওই চিন্তা একটা ক্ষীণ ছায়া মাত্র। কারণ হৃদয়ের গোপন কক্ষে অর্থ আর চিন্তায় রূপ নেওয়ার অনেক আগেই — সত্য অনুভুত হয় আত্মার লুকানো ঘরের দেয়ালে — জীবন্ত কম্পনের মতো।

আর যখন সেই চিন্তা ভাষার পোশাক পরতে চায়, তখনই দারিদ্র্যের শুরু। শব্দগুলো যেন চিন্তার মাথাকে ঢেকে দিতে চাইছে, ওদিকে তার পা থেকে কাপড় সরে যাচ্ছে, আর সে যেন চিৎকার করে বলছে, “আমার কী হবে? অ্যাই, কি আশ্চর্য, তুমি কি দেখছ না, আমিও যে এই কাহিনীর অংশ?” ভাষা তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, কিন্তু হৃদয় যা স্পর্শ করেছে, তাকে ধারণ করার মতো ক্ষমতার বিস্তার তার কখনোই ছিল না।

এর চেয়েও অনেক বেশি দরিদ্র হলো উপলব্ধি। সে এসে দাঁড়ায় ঝাঁপি ভরা শব্দের সামনে, যেন বিশাল কোনো প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ভিক্ষুক, আর মনে করছে ভেতরে রাখা ধনসম্পদের পুরোটাই তার বুঝে এসে গেছে। “নিশ্চয়ই এর অর্থ এটাই,” সে বলতে থাকে আত্মতুষ্টির হাসি মুখে ধরে। অথচ হৃদয় নীরব থাকে, মন দৃষ্টি নামিয়ে নেয়, ইন্দ্রিয়গুলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে, একে একে মুখ ফিরিয়ে নেয় ওরা সবাই — কারণ তারা যে জানে, ব্যাখ্যা আর বাস্তবতা - অনেক অনেক ভিন্ন।

আর সবার শেষে আসে পাঠক — যে কিনা সবচাইতে বেশি অসহায়। পর্দার আড়াল থেকে সত্যকে এক ঝলক দেখার সুযোগ পেয়ে কোথায় কৃতজ্ঞ হবে, অথচ সে কিনা জানালাটাকেই বিচার করতে বসে যায়। “এর চাইতে ঢের ভালো লেখা আমি আগে কতো পড়েছি,” এই কথা বলে মুখ ভেংচি কাটে সে। অথচ বুঝতে পারে না, শব্দের যতটুকু সীমাবদ্ধতা ছিল, যা কিছু দারিদ্র ছিল অর্থের, তার চাইতে অনেক বেশি গরীব সেই চোখ, যা কিনা সত্যের মহাসমুদ্রকে বরাবর নিজের ছোট্ট কুঠরি দিয়ে মেপে নিতে চায়।

اللهم صل على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه وسلم

নবীনতর পূর্বতন