১১ জ্যৈষ্ঠ (২৪ মে) বাঙালি সত্তার এক অবিচ্ছেদ্য দিন। ১৩০৬ বঙ্গাব্দের এই দিনে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক ধূমকেতু, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে ‘সাহিত্যনামা’র পক্ষ থেকে এই মহান স্রষ্টার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
নজরুল বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন এক প্রচণ্ড ঝড়ের মতো, যাঁর কলমের আঘাতে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল জীর্ণ সমাজব্যবস্থা আর পরাধীনতার শৃঙ্খল। আসুন, তাঁর জন্মজয়ন্তীতে ফিরে তাকাই তাঁর সুবিশাল ও বহুমুখী সৃষ্টির দিকে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ
নজরুল কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক জ্বলন্ত অগ্নিশিখা। পরাধীনতার গ্লানি মুছতে তিনি কলম ধরেছিলেন শাণিত তলোয়ারের মতো। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিতই কাঁপিয়ে দেয়নি, বরং যুগ যুগ ধরে শোষিত, নিপীড়িত মানুষের হৃদয়ে অসীম সাহসের সঞ্চার করেছে।
"বল বীর— বল উন্নত মম শির!"
এই একটি বজ্রকঠিন পঙ্ক্তি ঘুমন্ত বাঙালি জাতিকে আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হতে শিখিয়েছে। তিনি কারাবরণ করেছেন, কিন্তু অন্যায়ের কাছে কখনও মাথা নত করেননি।
সাম্যবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা
নজরুল ছিলেন মানবতার একনিষ্ঠ পূজারি। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি এবং নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিয়ে তাঁর যে অটল ও স্পষ্ট অবস্থান, তা আজকের সমাজেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও শিক্ষণীয়। তিনি নির্দ্বিধায় গেয়েছেন সাম্যের গান:
"গাহি সাম্যের গান— মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।"
ধর্ম, জাত, বর্ণ বা লিঙ্গের ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে কেবল মানুষ হিসেবে দেখার এই উদার শিক্ষা নজরুলের সাহিত্যদর্শনের অন্যতম মূলভিত্তি।
প্রেম ও সুরের ইন্দ্রজাল
যিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন রণতূর্য, তাঁর হাতেই আবার বেজে উঠেছে প্রেমের মোহন বাঁশরি। নজরুলের বহুমুখী প্রতিভা সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়েছে সংগীতে। তাঁর রচিত গজল, শ্যামাসংগীত, ইসলামি গান, কীর্তন এবং রাগপ্রধান সুর বাংলা সংগীতে এক অভাবনীয় দিগন্তের উন্মোচন করেছিল। তাঁর বিরহ ও প্রেমের কবিতাগুলো আজও পাঠকের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। রুক্ষ বিদ্রোহী সত্তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক কোমল, অভিমানী ও প্রেমিক নজরুল আমাদের চিরকালের বিস্ময়।
বর্তমান সময়ে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা
আজকের বিশ্ব যখন নানাভাবে বিভক্ত—যুদ্ধ, হানাহানি, বৈষম্য এবং ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন, তখন কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শ আমাদের জন্য এক আলোকবর্তিকা হতে পারে। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব এবং বিশ্বমানবতার প্রতি প্রেম—এগুলো কেবল সাহিত্যপাঠের বিষয়বস্তু নয়, বরং যাপিত জীবনে ধারণ করার মতো এক কালজয়ী দর্শন।
কাজী নজরুল ইসলাম মৃত্যুহীন, তিনি চিরঞ্জীব। তাঁর সৃষ্টি, তাঁর সুর, তাঁর দ্রোহী সত্তা বাঙালির অস্থিমজ্জায় মিশে আছে। জন্মজয়ন্তীর এই পুণ্যলগ্নে ‘সাহিত্যনামা’ পরিবার প্রত্যাশা করে, নজরুলের সাম্য, প্রেম ও মানবতার বাণী নতুন প্রজন্মের চিন্তায় ও মননে আরও গভীরভাবে প্রোথিত হোক।
জয় হোক মানবতার, জয় হোক বিদ্রোহী কবির।