প্রযুক্তির দম্ভ ও সাহিত্যের অনন্ত আবেদন: যন্ত্রের যুগে মানুষের আত্মার আখ্যান

একবিংশ শতাব্দীর এই চূড়ান্ত লগ্নে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, আর মহাকাশজয়ের মহোৎসবে মেতে উঠেছি, তখন একটি অতি পুরোনো অথচ প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন বারবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়—এই চরম উৎকর্ষের যুগে সাহিত্যের প্রয়োজন কী? বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে জাগতিক স্বাচ্ছন্দ্য, প্রযুক্তি দিয়েছে অকল্পনীয় গতি, আর চিকিৎসাশাস্ত্র দিয়েছে আয়ু। কিন্তু এই দীর্ঘায়ু আর গতির জীবনে মানুষ কি সত্যিই সুখী? যখন একটি স্মার্টফোন পৃথিবীর অপর প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়, তখন কি মানুষের মনের ভেতরের একাকীত্ব কমেছে? উত্তর হলো, না। আর ঠিক এই শূন্যতার জায়গাতেই সাহিত্যের অমোঘ প্রয়োজন দেখা দেয়। বিজ্ঞান আমাদের বাঁচার উপায় বাতলে দেয়, আর সাহিত্য শেখায় কেন বাঁচব। মানবিকতা, জীবনবোধ, আর নৈতিকতার এক অনন্ত পাঠশালা হিসেবে সাহিত্য তাই এই যান্ত্রিক যুগেও স্বমহিমায় প্রাসঙ্গিক।

মানবিকতার বিনির্মাণ ও অন্যের যন্ত্রণায় অবগাহন

প্রযুক্তি মানুষকে একটি বৈশ্বিক গ্রামে (Global Village) পরিণত করেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের মন থেকে আত্মকেন্দ্রিকতার দেয়াল ভাঙতে পারেনি। আমরা আমাদের স্ক্রিনে রোজ হাজারো মৃত্যুর খবর দেখি, কিন্তু তা আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে না, কারণ তা নিছকই কিছু ‘ডেটা’ বা তথ্য হিসেবে আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছায়। কিন্তু সাহিত্য তথ্য দেয় না, সাহিত্য দেয় অনুভূতি।

বিখ্যাত রুশ কথাসাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি বলেছিলেন,

"সাহিত্য হলো মানুষের হৃদয়ের ইতিহাস।"

সাহিত্য আমাদের 'সহমর্মিতা' বা Empathy শেখায়। একজন মানুষ তার নিজের জীবনে কেবল একটি জীবনই বাঁচে। কিন্তু একজন পাঠক তার জীবদ্দশায় হাজার হাজার জীবনযাপন করতে পারে। যখন আমরা কোনো উপন্যাস পড়ি, তখন আমরা কেবল অক্ষর পড়ি না, আমরা সেই চরিত্রের সত্তায় প্রবেশ করি।

সাহিত্য নোট: 'পথের পাঁচালী' ও মানবিকতার পাঠ

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পথের পাঁচালী' পড়ার সময় পাঠক কেবল নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের অপু-দুর্গার দারিদ্র্যের কথা জানেন না, পাঠক নিজেই অপু হয়ে ওঠেন। দুর্গার মৃত্যুতে পাঠকের চোখে যে জল আসে, তা কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া নয়, তা হলো মানবিকতার সর্বোচ্চ বিকাশ। বিজ্ঞান হয়তো দারিদ্র্য দূর করার অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করতে পারে, কিন্তু দরিদ্র মানুষের ভেতরের আনন্দ, তাদের ছোট ছোট স্বপ্নের যে মানবিক রূপ—তা কেবল সাহিত্যই ফুটিয়ে তুলতে পারে। সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো শিশুর কষ্ট, কিংবা আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের যন্ত্রণা যখন কবিতার পঙ্‌ক্তিতে বা গল্পের পাতায় উঠে আসে, তখন তা আমাদের ভেতরের ঘুমন্ত মানবতাকে জাগিয়ে তোলে।

জীবনবোধের অতলান্ত গভীরতা আবিষ্কার

জীবন কোনো সরলরেখা নয়। এটি হাসি-কান্না, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, আলো এবং অন্ধকারের এক জটিল সমীকরণ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জীবনের বাহ্যিক সমস্যার সমাধান করতে পারে, কিন্তু জীবনের ভেতরের যে শূন্যতা, যে হাহাকার, তার কোনো অ্যালগরিদম প্রযুক্তির কাছে নেই।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যের সংজ্ঞায় বলেছেন,

 "অন্তরের জিনিসকে বাহিরের, ভাবের জিনিসকে ভাষার, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানবের ও ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলাই সাহিত্যের কাজ।"

মানুষ কেন বাঁচে? জীবনের অর্থ কী? চরম সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও কেন মানুষের মনে বিষাদ আসে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিজ্ঞান দিতে পারে না। কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর 'আট বছর আগের একদিন' কবিতায় এমন এক মানুষের কথা বলেছেন, যার জীবনে কোনো কিছুর অভাব ছিল না—"নারী, প্রেম, শিশু, গৃহ—সবই তো ছিল", তবু সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, কারণ তার ভেতরে ছিল "বিপন্ন বিস্ময়"। এই বিপন্ন বিস্ময়কে অনুধাবন করার নামই জীবনবোধ।

আধুনিক প্রযুক্তি মানুষকে কেবল 'ভোক্তা' (Consumer) বানাতে চায়, যে কেবল পণ্য কিনবে আর ব্যবহার করবে। কিন্তু সাহিত্য মানুষকে উপলব্ধি করতে শেখায়। শেকসপিয়রের 'হ্যামলেট' যখন বলে, *"To be, or not to be: that is the question"*, তখন তা আর কেবল ডেনমার্কের রাজপুত্রের সংকট থাকে না, তা হয়ে ওঠে আধুনিক যুগের প্রতিটি মানুষের অস্তিত্বের সংকট। সাহিত্য আমাদের শেখায় যে, ব্যর্থতা বা দুঃখ জীবনের শেষ কথা নয়, বরং এগুলো জীবনেরই অপরিহার্য অংশ। এই জীবনবোধ ছাড়া মানুষ কেবল একটি যান্ত্রিক রোবটে পরিণত হয়।

নৈতিকতার চিরন্তন মানদণ্ড ও বিবেকের জাগরণ

বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি হলো সম্পূর্ণ 'নৈতিকতা-নিরপেক্ষ' (Amoral)। একটি পারমাণবিক প্রযুক্তি দিয়ে যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন করে লাখো মানুষের ঘর আলোকিত করা যায়, তেমনি সেই একই প্রযুক্তি দিয়ে হিরোশিমা-নাগাসাকির মতো শহর মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসও করে দেওয়া যায়। প্রযুক্তির নিজের কোনো বিবেক নেই যে সে সিদ্ধান্ত নেবে কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ। এখানেই সাহিত্যের কাজ শুরু হয়। সাহিত্য হলো সমাজের বিবেক।

রুশ ঔপন্যাসিক লিও তলস্তয় বিশ্বাস করতেন,

 "শিল্পের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে ভালোবাসতে শেখানো।"

সাহিত্য আমাদের নৈতিকতার এমন এক আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে আমরা আমাদের নিজেদের কলুষতা এবং মহত্ত্ব—দুটোই দেখতে পাই। সমাজের প্রতিষ্ঠিত আইন বা ধর্ম অনেক সময় অন্ধ হতে পারে, কিন্তু সাহিত্যের নৈতিকতা কখনোই অন্ধ নয়।

সাহিত্য নোট: 'মহেশ' ও সামাজিক ভণ্ডামির স্বরূপ

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'মহেশ' গল্পের কথা ধরা যাক। সমাজের চোখে গফুর মিয়া একজন দরিদ্র, অশিক্ষিত এবং 'পাপী' মানুষ, কারণ সে অভাবের তাড়নায় তার গরুকে হত্যা করেছে। কিন্তু সাহিত্য আমাদের দেখায় আসল পাপী গফুর নয়, আসল পাপী হলো সেই সমাজব্যবস্থা ও জমিদার, যারা গফুরকে এই অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। সাহিত্য সমাজের তথাকথিত নৈতিকতার মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলে এবং সত্যিকারের মানবিক নৈতিকতার উন্মেষ ঘটায়। ফিউদর দস্তয়েভস্কির 'ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট' উপন্যাসে রাসকোলনিকভ যখন খুন করে, তখন পাঠক কেবল একটি অপরাধ দেখে না, পাঠক দেখে একজন মানুষের বিবেকের দহন। এই দহন আমাদের শেখায় যে, আইন হয়তো মানুষকে শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারে, কিন্তু বিবেকের দংশন থেকে পালানোর কোনো পথ নেই।

 যান্ত্রিক বিচ্ছিন্নতার প্রতিষেধক হিসেবে সাহিত্য

বর্তমান যুগকে বলা হয় 'কানেক্টেড আইসোলেশন' বা সংযুক্ত বিচ্ছিন্নতার যুগ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আমাদের হাজার হাজার 'বন্ধু' আছে, কিন্তু গভীর রাতে মন খারাপ হলে কথা বলার মতো একজন মানুষও নেই। আমরা তথ্যের মহাসাগরে ভাসছি, কিন্তু জ্ঞানের পিপাসায় শুকিয়ে মরছি।

বিখ্যাত কবি **টি. এস. এলিয়ট** তাঁর 'The Rock' কবিতায় আধুনিক যুগের এই ট্র্যাজেডি নিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন,

"Where is the life we have lost in living? / Where is the wisdom we have lost in knowledge? / Where is the knowledge we have lost in information?"*

তথ্য আর জ্ঞানের ভিড়ে প্রজ্ঞা আজ কোথায়? বাঁচার তাগিদে আমরা যে জীবন হারিয়েছি, তা কোথায়?

এই বিচ্ছিন্নতার যুগে সাহিত্য হলো মানুষের এক পরম আশ্রয়। যখন আমরা কোনো প্রিয় বইয়ের পাতা উল্টাই, তখন আমরা লেখকের সঙ্গে এক আত্মিক কথোপকথনে লিপ্ত হই। সাহিত্য পাঠককে এই বার্তা দেয় যে—"তুমি একা নও। তোমার মনের ভেতরে যে কষ্ট, যে সংশয়, যে আনন্দ কাজ করছে, আজ থেকে শত বছর আগে অন্য কোনো মানুষের মনেও ঠিক একই অনুভূতির জন্ম হয়েছিল।" এই উপলব্ধি মানুষের একাকীত্ব দূর করে। সিলভিয়া প্লাথের কবিতা কিংবা ফ্রান্‌ৎস কাফকার গল্প আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও যন্ত্রণাকে যেভাবে ধারণ করেছে, তা পড়ে আমরা নিজেদের যন্ত্রণার উপশম খুঁজে পাই।

কল্পনা, উদ্ভাবন এবং বিজ্ঞানের পরিপূরক

অনেকে মনে করেন বিজ্ঞান এবং সাহিত্য একে অপরের শত্রু বা প্রতিযোগী। কিন্তু বাস্তবে তারা একে অপরের পরিপূরক। বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন উদ্ভাবনী চিন্তা, আর সেই উদ্ভাবনী চিন্তার খোরাক জোগায় সাহিত্য।

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন সাহিত্যের এই শক্তিতে প্রবলভাবে বিশ্বাস করতেন। তিনি বলেছিলেন,

"লজিক বা যুক্তি আপনাকে 'এ' থেকে 'বি' পর্যন্ত নিয়ে যাবে, কিন্তু কল্পনা আপনাকে সব জায়গায় নিয়ে যাবে।"


জুল ভার্ন বা এইচ. জি. ওয়েলসের বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনীগুলো (Science Fiction) একসময় নিছকই সাহিত্য ছিল, কিন্তু আজ তা বিজ্ঞানের বাস্তবে পরিণত হয়েছে। সাহিত্য মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, আর বিজ্ঞান সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়। যদি মানুষের কল্পনা করার ক্ষমতা না থাকে, তবে বিজ্ঞানের চাকাও থেমে যাবে। সাহিত্য মানুষের মস্তিষ্কের সেই কল্পনার জানালাটি সব সময় খোলা রয়ে যাবে। 


সাহিত্য হলো মানুষের এই আবেগ, দুর্বলতা, আর মহত্ত্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল। যতদিন পৃথিবীতে একজন মানুষও বেঁচে থাকবে, তার বুকে একটি স্পন্দিত হৃদয় থাকবে, ততদিন তার ভালোবাসার প্রয়োজন হবে, কান্নার প্রয়োজন হবে, নৈতিকতার সঙ্কটে পথ খোঁজার প্রয়োজন হবে। আর ঠিক ততদিন পর্যন্ত সাহিত্য প্রাসঙ্গিক থাকবে। বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে গতির পাখা, আর সাহিত্য আমাদের দিয়েছে উড়ার আকাশ। তাই জাগতিক উন্নতি বা প্রযুক্তির চূড়ান্ত উৎকর্ষের যুগেও সাহিত্য কোনো বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের মানবিকতা, জীবনবোধ এবং আত্মিক মুক্তির এক অনন্ত আশ্রয়।

নবীনতর পূর্বতন