"আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে
দেখতে আমি পাই নি তোমায় দেখতে আমি পাই নি।
বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয়-পানে চাই নি—
আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে।"
আজ ২৫শে বৈশাখ (৭ মে), বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী। সাহিত্যনামার সকল পাঠক, লেখক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীকে জানাই রবীন্দ্রজয়ন্তীর আন্তরিক শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যক্তিজীবনে ছিলেন এক বিশাল এবং সংবেদনশীল হৃদয়ের অধিকারী। তাঁর মহানুভবতার অজস্র দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় ছড়ানো আছে। আজ এই বিশেষ দিনে কবির জীবনের এমন একটি ঘটনার কথা স্মরণ করব, যা প্রমাণ করে বাংলার খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর দরদ ও ভালোবাসা কতটা গভীর ছিল।
নোবেল পুরস্কারের অর্থ ও পতিসরের কৃষিব্যাংক
১৯১৩ সালে 'গীতাঞ্জলি' (Song Offerings)-এর জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন রবীন্দ্রনাথ। পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা। সেই যুগে এটি ছিল বিপুল এক ধনরাশি। অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, কবি এই অর্থ নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, বিশ্বভ্রমণ বা পারিবারিক আভিজাত্যের প্রসারে ব্যয় করবেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
জমিদারি তদারকি করতে গিয়ে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বাংলার কৃষকদের অবর্ণনীয় দারিদ্র্য ও দুর্দশা। মহাজনদের চড়া সুদের (প্রায় ৫০-১০০%) যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল সাধারণ কৃষকের জীবন। ফসল ফলিয়েও ঋণের দায়ে তাদের মুখে অন্ন জুটত না।
কৃষকদের এই মহাজনি ঋণের হাত থেকে চিরতরে মুক্তি দিতে কবি এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর নোবেল পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ অর্থ দিয়ে পতিসরে একটি **'কৃষি ব্যাংক'** স্থাপন করেন। এই ব্যাংক থেকে দরিদ্র কৃষকদের অত্যন্ত নামমাত্র সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের স্বীকৃতিকে তিনি অবলীলায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন হতদরিদ্র কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।
তথ্যসূত্র (Reference):
রবীন্দ্র-গবেষক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ 'রবীন্দ্রজীবনী' এবং অমিতাভ চৌধুরী রচিত 'জমিদার রবীন্দ্রনাথ' গ্রন্থে পতিসরে এই কৃষি ব্যাংক স্থাপন ও নোবেল পুরস্কারের অর্থ সম্পূর্ণভাবে জনকল্যাণে ব্যয়ের বিস্তারিত ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায়।
যিনি নিজের সর্বোচ্চ প্রাপ্তিকে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করতে পারেন, তিনি কেবল বিশ্বকবি নন—তিনি এক মহামানব। আক্ষরিক অর্থেই তিনি আমাদের অন্তরের গভীরে, আমাদের ‘হিয়ার মাঝে’ লুকিয়ে আছেন। বাঙালির মনন, সুখ-দুঃখ আর যাপনের প্রতিটি স্তরে তাঁর উপস্থিতি তাই চিরন্তন।
শুভ রবীন্দ্রজয়ন্তী! আপনাদের জীবনে রবীন্দ্রনাথের কোন কবিতা বা গানটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে, মন্তব্যের ঘরে জানাতে পারেন।
