আমাদের প্রথম আশ্রয়, জীবনবোধ, সামাজিক মনস্তত্ত্ব থেকে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়: সবকিছুর কেন্দ্রেই যখন নারী

 মো. রিদওয়ান আল হাসান 

আমরা জানি যে, নবিজি ﷺ যখন পৃথিবীতে আগমন করেন, তৎকালীন আরব সমাজের একটা প্রথা ছিল শিশুদের বিশুদ্ধ ভাষা এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য মরুভূমির মুক্ত পরিবেশে ধাত্রী মায়ের কাছে পাঠানো। নবিজিকে ﷺ তাঁর শৈশবে দুধমা হালিমা আস সাদিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে পাঠানো হয়েছিল। এর একটি বড় কারণ ছিল বিশুদ্ধ এবং অলংকারপূর্ণ আরবি ভাষা আয়ত্ত করা। মাতৃসম ধাত্রীর সান্নিধ্যে নবিজি ﷺ যে ভাষাগত উৎকর্ষ এবং মরুভূমির অকৃত্রিম জীবনবোধ লাভ করেছিলেন, তা তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে গভীর প্রভাব ফেলেছিল (লিংস,১৯৮৩)। 


এছাড়া, ​নবিজির ﷺ মা আমেনাও এমন একটি অভিজাত পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন যেখানে ভাষার অলংকার এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। ইবনে ইসহাক এবং ইবনে হিশামের মতে, তৎকালীন আরবে নারীরা এবং বিশেষ করে অভিজাত পরিবারের নারীরা অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান এবং ভাষাগত দিক থেকে অসম্ভব দক্ষ হতেন। ​মা আমেনার কাব্যিক মেধা এবং ভাষাগত দক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর রচিত শোকগাথা বা মর্সিয়াগুলোতে। স্বামী আবদুল্লাহর ইন্তেকালের পর তিনি যে শোকগাথা রচনা করেছিলেন আরব্য সাহিত্যের মাপকাঠিতে তা অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের এবং হৃদয়গ্রাহী। এছাড়া ইবনে সাদের তাবাকাত আল কুবরা গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, মা আমেনা তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে শিশু নবিজিকে ﷺ উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত আবেগময় এবং অলংকারপূর্ণ কিছু পঙ্‌ক্তি রচনা করেছিলেন। একটি অসচেতন, পড়াশোনা না জানা মনের পক্ষে এমন গভীর দর্শন এবং নিখুঁত ছন্দোবদ্ধ কবিতা রচনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। 


উম্মুল মুমিনিন, নবিজির ﷺ স্ত্রী, আমাদের মা, খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ব্যবসার কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। তৎকালীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ, অর্থনৈতিক চুক্তি এবং বিশাল বাণিজ্যিক কাফেলা পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ বুদ্ধিমত্তা, হিসাবনিকাশের জ্ঞান এবং প্রশাসনিক দক্ষতা প্রয়োজন তা নিঃসন্দেহে একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষের পক্ষেই সম্ভব। মা খাদিজা খুবই দক্ষতার সাথে এসকল জ্ঞান, গুণ লালন এবং ধারণ করতেন।


আমাদের মা, নবিজির ﷺ স্ত্রী হযরত আয়েশা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহাও ছিলেন ইসলামের প্রাথমিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কলার, ফকিহ এবং শিক্ষক। তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য তৎকালীন অনেক বড় বড় সাহাবিদের জন্যও আইনি এবং ধর্মীয় নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করত। চিকিৎসাশাস্ত্র, ইতিহাস, আরব্য সাহিত্য, উত্তরাধিকার আইন এবং ইসলামী বিধানে তাঁর পারদর্শিতা ছিল অতুলনীয়। অনেক জ্যেষ্ঠ এবং প্রাজ্ঞ পুরুষ স্কলারও তাঁর কাছে এসে অত্যন্ত জটিল ফিকহি মাসআলার সমাধান খুঁজতেন (নাদভি, ২০০৭)। মা আয়েশা ছিলেন মদিনার বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।


নবিজির ﷺ কন্যা, আমাদের পরম শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং ভালোবাসার মানুষ, সায়্যিদিনা ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা এবং হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর দৈনন্দিন জীবনেও ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার প্রবাহ। মা ফাতেমা শুধু যে কুরআন শরিফের আয়াতের গূঢ়ার্থ, নাযিলের কারণ (আসবাব আল নুযুল) জানতেন তা নয়, তিনি তৎকালীন সমাজের আদ্যোপান্ত (এখনকার সেন্সে সমাজবিজ্ঞান), নীতি-নৈতিকতা, আইন, সাহিত্য সবকিছুর জ্ঞানেই আলোকিত ছিলেন। পাশাপাশি, নবিজি ﷺ কে নিয়ে মা ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাব্যিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার কথা অত্যন্ত সম্মানের সাথে স্মরণ করা প্রয়োজন। ইমাম আলী কর্রমল্লাহু ওয়াজহাহু এবং সায়্যিদিনা ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহু, দুজনেই ছিলেন অসাধারণ বাগ্মী এবং দার্শনিক চিন্তার অধিকারী। মা ফাতেমা তাঁর সন্তানদের, অর্থাৎ হযরত হাসান এবং হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমার চরিত্র গঠনে যে প্রগাঢ় শিক্ষা এবং দার্শনিক বোধ সঞ্চারিত করেছিলেন তা ইসলামের ইতিহাসকে চিরকালের জন্য মহিমান্বিত করেছে।


আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞানের আলোকে আমরা জানি যে মায়ের ভাষা বা মাতৃস্থানীয়া কারও কাছ থেকে লব্ধ ভাষা কেবল যোগাযোগের একটি সাধারণ মাধ্যম নয়, বরং এটি শিশুর চিন্তা কাঠামোর এবং মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের ভিত্তি গড়ে দেয়। মাতৃভাষা একটি শিশুর স্নায়বিক বা নিউরোলজিক্যাল বিকাশের প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করে। যে ভাষা এবং যে পরিবেশে শিশু বেড়ে ওঠে, সেই ভাষার রূপক এবং অন্তর্নিহিত দর্শন শিশুর বিশ্বদর্শনকে চিরস্থায়ী রূপ প্রদান করে। এক্ষেত্রে, শুধু মা না, বোন, খালা-ফুপু-চাচী-মামীসহ যারাই মাতৃস্থানীয় অবস্থায় থাকেন, তাদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


আধুনিক মনস্তত্ত্ব এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে যে সচেতন এবং শিক্ষিত মায়েদের সন্তানের আইকিউ হয় উন্নত। জীবনবোধে থাকে অনেক গভীরতা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা শিশুর স্নায়বিক বিকাশ, এক্সিকিউটিভ ফাংশন এবং ভাষাগত দক্ষতার উপর অত্যন্ত ইতিবাচক এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে (মোরালেজ এবং ফক্স, ২০১৯)। একজন শিক্ষিত মা তাঁর সন্তানের জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তার দিগন্তকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করে। মায়ের চিন্তাধারা সন্তানের অবচেতন মনে এমন একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক স্থাপত্য নির্মাণ করে যা তাকে জীবনের সব জটিল সমস্যাগুলো সাহসের সাথে সমাধান করতে সাহায্য করে। সন্তান ভাবতে শেখে, কাঠামোর বাইরে গিয়ে, বৈষম্য, অন্যায় বিবেচনা করতে শেখে। কথা বলতে শেখে। এমনকি প্রয়োজনে সেই শুভবোধ থেকে অনেক সময় নিজের পরিবার, গোত্র কিংবা সমাজের সাথেও বিনয়ের সাথে দ্বিমত করতে শেখে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একজন শিক্ষিত নারী তার চারপাশের পরিবেশে এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ইকোসিস্টেম তৈরি করেন যা গোটা পরিবারকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে রক্ষা করে। এই কারণেই নির্দ্বিধায় বলা যায় যে একটি শিশুর প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হলো তার মায়ের কোল এবং মায়ের দেয়া শিক্ষা।


মায়ের শিক্ষার এই গভীর এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাবের চমৎকার প্রমাণ হতে পারে আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের জীবন। আমাদের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং পরাবাস্তববাদী কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনবোধ এবং কাব্যিক চেতনার গভীরে তাঁর মা কবি কুসুমকুমারী দাশের গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব অনস্বীকার্য। ঔপনিবেশিক বাংলার সেই সময়ে নারীদের শিক্ষার সুযোগ যখন অত্যন্ত সীমিত ছিল, তখন কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন সমাজের একজন শিক্ষিত এবং সচেতন নারী যিনি নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করতেন এবং বিভিন্ন সাময়িকীতে লেখালেখি করতেন। তাঁর সেই অমর পঙ্‌ক্তি ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’ ছিল একটি জাতির জন্য রচিত মনস্তাত্ত্বিক ইশতেহার। এই দার্শনিক ইশতেহারের আলোকেই জীবনানন্দ দাশের মতো একজন কালজয়ী স্রষ্টার জন্ম হয়েছিল। যাঁর চেতনা এবং দর্শন আজ অবধি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। মায়ের এই বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচর্যা, উৎসাহ এবং বাড়িতে তৈরি করা সাহিত্যিক পরিবেশ না থাকলে আমরা রূপসী বাংলার কবিকে পেতাম না (বন্দোপাধ্যায়, ১৯৯৮)। মায়ের শিক্ষিত মনন কীভাবে একটি শিশুর মাঝে মহৎ জীবনবোধের জন্ম দেয় এবং তাকে বৃহত্তর ভাবনার জগৎ তৈরি করে এবং সামাজিক কাঠামোর সাথে যুক্ত হতে শেখায়, এটি তার একটি ধ্রুপদী এবং জীবন্ত উদাহরণ।



ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাসে ফিরে যাই একটু। অষ্টম শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কলার ছিলেন উমরাহ বিনতে আবদুর রহমান। তিনি ছিলেন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বর্ণিত হাদিসগুলোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং বড় অথরিটি। মদিনার বড় বড় পুরুষ বিচারকরাও বিভিন্ন আইনি জটিলতায় তাঁর শরণাপন্ন হতেন এবং তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন (সাঈদ, ২০১৩)। উম্মে আল দারদা (সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগ) ছিলেন দামেস্কের একজন বিখ্যাত ফকিহ বা আইনজ্ঞ এবং হাদিস বিশারদ। তাঁর মেধা এবং ধর্মীয় আইনে তাঁর অসামান্য দক্ষতার কারণে তিনি তৎকালীন সমাজে প্রবলভাবে সমাদৃত ছিলেন। এমনকি তৎকালীন খলিফারাও অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাঁর ক্লাসে বসে জ্ঞান অর্জন করতেন, যা প্রমাণ করে বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে জেন্ডার কোনো বাধা ছিল না। ‘'নারীশিক্ষার” প্রতি সমাজের নেতিবাচক কোনো দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। একই যুগের আরেকজন বিখ্যাত স্কলার ছিলেন হাফসা বিনতে সিরিন (অষ্টম শতাব্দীর প্রথমার্ধ), যিনি পবিত্র কুরআন মুখস্থ করেছিলেন এবং খুব সুন্দরভাবে কুরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যা করে সমাজে মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। দীর্ঘ সময় জনবিচ্ছিন্ন থেকে তিনি জ্ঞান সাধনা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষকে পরিণত হয়েছিলেন।


প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং প্রশাসনে নারীদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব

ইসলামী সমাজে জ্ঞানের পরিধি কেবল মুখস্থবিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং প্রশাসনিক, আইনি এবং ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও নারীরা সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। খলিফা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর শাসনামলে শিফা বিনতে আবদুল্লাহ নামক একজন বিদুষী এবং প্রাজ্ঞ নারীকে মদিনার বাজার পরিদর্শক বা মুহতাসিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন (আহমেদ, ১৯৯২)। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তিনি বাজারের ওজন ব্যবস্থা তদারকি করতেন, পণ্যের মান যাচাই করতেন এবং বাণিজ্যের আইনগুলো সুচারুরূপে বাস্তবায়নে কাজ করতেন। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কেন্দ্রস্থল নিয়ন্ত্রণের এই দায়িত্ব তাঁর প্রশাসনিক বুদ্ধিমত্তা এবং অর্থনৈতিক আইনের উপর তাঁর গভীর জ্ঞানের অকাট্য প্রমাণ বহন করে।


শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও নারীরা পথিকৃৎ হিসেবে কাজ করেছেন। ফাতিমা আল ফিহরি (ইন্তেকাল: ৮৮০ খ্রিস্টাব্দ) ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর ফেজ শহরে আল কারাওউইন মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তাঁর সম্পূর্ণ উত্তরাধিকার সম্পদ এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার কাজে দান করেছিলেন। যতদিন এই মসজিদ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ চলেছে, প্রতিটি দিন তিনি রোজা রাখতেন। আজকের এই সময়ে, আমাদের সমাজে বসে এটা ভাবা যায়! একজন নারী, একজন মুসলিম নারী বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা! ইউনেস্কোর স্বীকৃতি অনুযায়ী এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (ইউনেস্কো, ২০২১)। অর্থাৎ বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনন্য এবং চিরস্থায়ী গৌরব একজন নারীরই প্রাপ্য। 


এভাবে, আমরা স্পষ্ট প্রমাণ পাই যে ইসলামে নারীরা কেবল জ্ঞান অর্জনই করেননি, বরং জ্ঞান বিতরণের প্রাতিষ্ঠানিক এবং গাঠনিক রূপরেখাও তাঁরাই তৈরি করেছিলেন।


দ্বাদশ শতাব্দীর সিরিয়ার আলেপ্পো শহরের একজন বিখ্যাত স্কলার এবং ক্যালিগ্রাফার ছিলেন ফাতিমা আল সমরকান্দি। তিনি ইসলামী আইনের একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি তাঁর স্বামীর পাশাপাশি বসে সরাসরি ফতোয়া প্রদান করতেন। তাঁর পাণ্ডিত্য এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে অনেক সময় তাঁর স্বামী ফতোয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মতামতের উপর পুরোপুরি নির্ভর করতেন। তৎকালীন শাসক নুর আদ দিন জেনগিও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় এবং আইনি বিষয়ে তাঁর কাছে পরামর্শ চেয়ে পাঠাতেন (নাদভি, ২০০৭)।


উসমানীয় সাম্রাজ্য এবং সুলতানি আমল: রাজনীতি, যুদ্ধ এবং জনকল্যাণে নারী


ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে বিশেষ করে সুলতানি আমল এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যে নারীদের ভূমিকা আরও বেশি রাজনৈতিক, কাঠামোগত এবং কৌশলগত আকার ধারণ করে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি সুদীর্ঘ এবং উল্লেখযোগ্য সময়কালকে কাদিনলার সালতানাত বা নারীদের সালতানাত হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই সময়ে রাজপরিবারের শিক্ষিত নারীরা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বৈদেশিক কূটনীতি এবং বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনায় প্রবল প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। মালহুন হাতুন, হুররেম সুলতান, কোসেম সুলতান এবং মিহরিমাহ সুলতানের মতো নারীরা কেবল প্রাসাদ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তাঁরা বিশাল সব জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক ট্রাস্ট গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের সম্পদের মাধ্যমে বড় বড় ওয়াকফ গঠন করেছিলেন। জেরুজালেম এবং ইস্তাম্বুলে হাসপাতাল, বিশাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্যুপ কিচেন নির্মাণের মাধ্যমে তাঁরা সমাজ গঠনে এবং দরিদ্রদের অর্থনৈতিক সুরক্ষায় অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন (Peirce 1993)। কোসেম সুলতানের মতো নেতৃত্বস্থানীয় নারীরা সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষার জন্য সামরিক দুর্গ নির্মাণেও প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছিলেন। তাঁরা যুদ্ধও করতেন পুরুষের কাঁধে কাঁধ রেখে। 


আমাদের এই অঞ্চলেও গোত্র পরিচালনা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি অস্ত্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে ছিলেন না। আমরা যদি সুলতানি আমলের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাই যে, দিল্লির মসনদে বসে রাজিয়া সুলতানা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন। তিনি সৈন্যবাহিনীর অগ্রভাগে নেতৃত্ব দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতেন। ইসলামের একেবারে শুরুর দিকের ইতিহাসেও খাওয়ারিজম বা অন্যান্য গোত্রগুলোতে নারীদের ব্যাপক এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায়। খাওয়ারিজমের নারীরা অশ্বারোহণে এবং তরবারি চালনায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তাঁরা গোত্র পরিচালনা থেকে শুরু করে রণাঙ্গন পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে অসামান্য মেধা এবং সাহসের স্বাক্ষর রেখেছেন।


সমসাময়িক ইসলামী স্কলারগণও নারী শিক্ষার এই ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বারবার সামনে নিয়ে এসেছেন এবং এর পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেছেন। বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বিখ্যাত সুফি স্কলার মাওলানা শেখ নাজিম আল হাক্কানি এবং মওলানা শেখ মুহাম্মদ হিশাম কাব্বানি নারী শিক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত গঠনমূলক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং আধুনিক যুগের উপযোগী বয়ান ব্যক্ত করেছেন। শেখ হিশাম কাব্বানি তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতা এবং লেখায় নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতায়ন, সামাজিক ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রে নারীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অন্তর্ভুক্তির উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুসলিম নারী সংগঠন কামিলাত মুসলিম নারীদের অধিকার আদায় এবং শিক্ষায় অগ্রগতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শেখ হিশাম কাব্বানি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে সমাজের অর্ধেক অংশ, অর্থাৎ নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পেছনে ফেলে রেখে কোনো সুস্থ এবং প্রগতিশীল সমাজ বা রাষ্ট্র গঠন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় (হিশাম কাব্বানী, ২০০২)। ঐতিহাসিক সময় ধরে ঘরে ঘরে নারীদের সাথে হয়ে যাওয়া অন্যায়, অত্যাচার এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং নারীদের উপর যেকোনো ধরনের নির্যাতন নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে প্রথম ফরমাল ফতওয়া (ইসলাম ধর্মের আলোকে আইন/নিষেধাজ্ঞা) প্রণয়নের কৃতিত্বও মওলানা শেখ হিশামের। তিনি এবং ড. হুমায়রা জিয়াদ ২০১১ সালে এই ফতওয়া প্রদান করেন (The Prohibition of Domestic Violence in Islam, 2011). 


আধুনিক স্কলাররা বারবার মনে করিয়ে দেন যে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে এবং মেধার মূল্যায়নে নারী ও পুরুষের মাঝে কোনো ধরনের বৈষম্য করা ইসলামের মৌলিক এবং সর্বজনীন শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।


বিস্তারিত ঐতিহাসিক এবং মনস্তাত্ত্বিক এই তথ্যগুলোর আলোকে যদি আমরা বর্তমান সমাজের দিকে তাকাই, তবে বুঝতে পারব যে, নারীদের উচ্চশিক্ষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার যে কোনো প্রয়াস মূলত সভ্যতার আত্মহত্যার শামিল। সমাজবিজ্ঞানের সমালোচনামূলক আলোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয় যে একটি সমাজ তখনই কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে পড়ে যখন সে তার অর্ধেক জনসংখ্যার মেধা এবং সম্ভাবনাকে দমন করে। একজন মা যখন শিক্ষিত হন, তখন তিনি একটি নতুন প্রজন্মের চিন্তার স্থপতিতে পরিণত হন। যে মা নিজে সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সাহিত্যের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সচেতন, তিনি অত্যন্ত অনায়াসে তাঁর সন্তানের মাঝে সেই বৃহত্তর বোধের বীজ বপন করতে সক্ষম হন। আমরা বর্তমান সময়ে গণমাধ্যম, সমাজতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং রাষ্ট্রকাঠামোর যে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ করি, তার মূল ভিত্তি প্রোথিত রয়েছে মানবীয় মনস্তত্ত্বের অন্তর্নিহিত সত্তায়। আর এই মনস্তত্ত্বের প্রধান রূপকার হলেন আমাদের শিক্ষিত এবং সচেতন মায়েরা।


ইসলামের ইতিহাসে নারীরা শুধু মা হিসেবেই তাঁদের দায়িত্ব পালন করেননি, তাঁরা ফকিহ হিসেবে ফতোয়া দিয়েছেন, বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন, মুহতাসিব হিসেবে বাজার এবং অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সভ্যতার জন্য জ্ঞানের চিরস্থায়ী বাতিঘর নির্মাণ করেছেন। জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার আলোয় আলোকিত একজন নারী শুধু একটি পরিবারের জন্যই নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষা এবং দর্শনের যে সুবিশাল উত্তরাধিকার মনীষিণীরা আমাদের জন্য রেখে গেছেন, তা পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি এবং অনুসরণ করার মাধ্যমেই আমরা একটি উন্নত, সহনশীল এবং মননশীল বিশ্ব বিনির্মাণ করতে সক্ষম হবো।


মো. রিদওয়ান আল হাসান

৪ মে, ২০২৬


রেফারেন্স

বন্দ্যোপাধ্যায়, পি. (১৯৯৮)। জীবনানন্দ দাশ: বিকাশ ও প্রকাশ। আনন্দ পাবলিশার্স।

Ahmed, L. (1992). Women and Gender in Islam: Historical Roots of a Modern Debate. Yale University Press.

Kabbani, M. H. (2002). Liberating the Soul: A Guide for Spiritual Growth. Islamic Supreme Council of America.

Kabbani, M. H., & Ziad, H. (2011). Fatwa against domestic violence in Islam. Islamic Supreme Council of America.

Lings, M. (1983). Muhammad: His Life Based on the Earliest Sources. Islamic Texts Society.

Morales, Y. and Fox, N. (2019). Maternal education prospectively predicts child neurocognitive function. Developmental Psychology.

Nadwi, M. A. (2007). Al Muhaddithat: The Women Scholars in Islam. Interface Publications.

Peirce, L. P. (1993). The Imperial Harem: Women and Sovereignty in the Ottoman Empire. Oxford University Press.

Sayeed, A. (2013). Women and the Transmission of Religious Knowledge in Islam. Cambridge University Press.

UNESCO (2021). Medina of Fez. World Heritage Centre.

নবীনতর পূর্বতন