স্মরণে বন্দে আলী মিয়া: বাংলার মাটি ও মানুষের কবি

সাহিত্যনামা সম্পাদকীয়

গতকাল ২৭ জুন ছিল বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি, কথাসাহিত্যিক, শিশুসাহিত্যিক ও শিল্পী বন্দে আলী মিয়ার জন্মদিন। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান বহুমাত্রিক হলেও আজকের প্রজন্মের কাছে তিনি যতটা পরিচিত হওয়ার কথা ছিল, ততটা হয়ে ওঠেননি। অথচ গ্রামবাংলার প্রকৃতি, মানুষের জীবন, লোকজ সংস্কৃতি এবং শিশুদের কল্পনার জগৎকে তিনি যে আন্তরিকতা ও মমতায় সাহিত্যরূপ দিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যের এক মূল্যবান সম্পদ।

১৯০৬ সালের ২৭ জুন পাবনা জেলার রাধানগরে বন্দে আলী মিয়ার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্য ও চিত্রকলার প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি লেখালেখির পাশাপাশি চিত্রশিল্পী হিসেবেও কাজ করেন। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি কবিতা, উপন্যাস, গল্প, নাটক, জীবনী, স্মৃতিকথা এবং শিশুসাহিত্য মিলিয়ে দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। সহজ ভাষা, দেশজ উপাদান এবং মানবিক অনুভূতি তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বন্দে আলী মিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ময়নামতীর চর। এই গ্রন্থে পদ্মা নদী তীরের মানুষের জীবন, প্রকৃতি এবং সংগ্রাম এক অনন্য শিল্পরূপ পেয়েছে। এছাড়া অনুরাগ, কাহিনী ও কথিকা, কলমিলতা, বনের ফুল, চোর জামাই, বোকা জামাই, টোটো কোম্পানির ম্যানেজার, সোনার হরিণ এবং শিশুদের জন্য লেখা অসংখ্য ছড়া ও গল্প তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন দিয়েছে। বিশেষ করে শিশুসাহিত্যে তাঁর অবদান আজও সমানভাবে মূল্যবান।

বাংলা সাহিত্য যখন নগরকেন্দ্রিক হয়ে উঠছিল, তখন বন্দে আলী মিয়া গ্রামবাংলার মানুষ, প্রকৃতি এবং লোকজ ঐতিহ্যকে সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর লেখায় নদী, চর, মাঠ, কৃষক, জেলে, গৃহস্থ এবং সাধারণ মানুষের জীবন অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উঠে এসেছে। এই কারণেই তাঁর সাহিত্য আজও বাংলার মাটির গন্ধ বহন করে।

তাঁর একটি পরিচিত কবিতার অংশ আমাদের সেই গ্রামীণ অনুভূতির কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

আমাদের ছোট গ্রাম
আমাদের ছোট গ্রাম, ছোট ছোট ঘর।
থাকি সেথা সবে মিলে, নাহি কেহ পর।
পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই।
একসাথে খেলি আর পাঠশালাতে যাই।

আজকের দিনে যখন প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে, তখন বন্দে আলী মিয়ার সাহিত্য আমাদের শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর রচনায় যে মানবিকতা, সরলতা এবং প্রকৃতিপ্রেম রয়েছে, তা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। সাহিত্যচর্চা শুধু নতুন লেখক সৃষ্টি করে না, বরং অতীতের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদেরও নতুনভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরে।

বন্দে আলী মিয়ার জন্মদিনে সাহিত্যনামা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে এই বহুমুখী সাহিত্যিককে। তাঁর সাহিত্য আরও বেশি পাঠ হোক, নতুন প্রজন্ম তাঁর বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হোক এবং বাংলা ভাষার এই গুরুত্বপূর্ণ লেখক তাঁর প্রাপ্য সম্মান ফিরে পান, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

নবীনতর পূর্বতন