ইতিহাসের অলিন্দে এক শিল্পমনা রাষ্ট্রনায়ক: শহীদ জিয়ার অন্তর্গত ভুবন

সাহিত্যনামা সম্পাদকীয়

ইতিহাসের খাতায় একজন মানুষের পরিচয় প্রায়শই তাঁর দৃশ্যমান রাজনৈতিক কীর্তি, সামরিক পোশাক কিংবা অবিনাশী সব স্লোগানের ফ্রেমে বন্দি হয়ে পড়ে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও এর ব্যতিক্রম নন। সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে তিনি একাধারে রণাঙ্গনের বীর সেনানি, বহুদলীয় রাজনীতির প্রবক্তা কিংবা আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার। কিন্তু এই টানটান রাজনৈতিক ও সামরিক পরিচয়ের অন্তরালে যে একজন অত্যন্ত সংবেদনশীল, শিল্পমনস্ক এবং মরমী হৃদয়ের মানুষ লুকিয়ে ছিলেন—সেই খবর ইতিহাসের পাতাগুলোতে খুব বেশি আলোচিত হয়নি। অথচ একজন মানুষের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব বুঝতে গেলে তাঁর মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার অন্দরমহলে প্রবেশ করা জরুরি। একজন নিরাসক্ত গবেষকের দৃষ্টিতে যখন আমরা শহীদ জিয়ার জীবনকে ব্যবচ্ছেদ করি, তখন তাঁর চারিত্রিক কাঠামোর মধ্যে সাহিত্য, সংগীত, ক্রীড়া এবং এক গভীর আধ্যাত্মিক চেতনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন খুঁজে পাওয়া যায়। ‘সাহিত্যনামা’র পাঠকদের জন্য আজ আমরা আলোকপাত করব রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার সেই অপরিচিত অন্তর্গত ভুবনের ওপর।


শব্দ ও চিন্তার সখ্য: শহীদ জিয়ার সাহিত্যপ্রেম

পেশাগত জীবনে সামরিক শৃঙ্খলার মধ্যে বড় হলেও বইয়ের পাতার সাথে জিয়াউর রহমানের সখ্য ছিল আজীবন। সমসাময়িক ইতিহাসবিদ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচরদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, গভীর রাত পর্যন্ত সুচিন্তিত ও গভীর দর্শনধর্মী বই পড়া ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস। কেবল অবসরের বিনোদন হিসেবে নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য তিনি সাহিত্যকে একটি প্রধান মাধ্যম মনে করতেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, আত্মজীবনী এবং ধ্রুপদী রাষ্ট্রচিন্তার বই তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে সব সময় শোভা পেত (Ahmed, 2009)। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উন্নয়ন, কবি-সাহিত্যিকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান এবং বাংলা একাডেমির কর্মকাণ্ডের পরিধি বিস্তারে তাঁর আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। সমকালীন অনেক কবি ও লেখকের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল এবং তিনি প্রায়শই তাঁদের সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতায় মেতে উঠতেন, যেখানে সমকালীন রাজনীতির চেয়ে সাহিত্যের গতিপ্রকৃতিই বেশি প্রাধান্য পেত (Anisuzzaman, 2012)।

সুরের উত্তরাধিকার: পারিবারিকভাবেই সংগীতের প্রতি প্রেম

শহীদ জিয়ার জীবনের অন্যতম এক অনুদ্ঘাটিত অধ্যায় হলো সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ, যার শিকড় মূলত প্রোথিত ছিল তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যে। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠার পারিবারিক পরিবেশটি ছিল অত্যন্ত মার্জিত এবং সুসংস্কৃত। পরিবারেই তিনি পেয়েছিলেন সুরের আদি পাঠ।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তাঁর মা মোতাহেরা খাতুন ছিলেন একজন অত্যন্ত সংগীতানুরাগী মানুষ, যিনি চমৎকার গান গাইতে পারতেন এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের প্রতি তাঁর ছিল গভীর পক্ষপাত (Hasan, 2015)। শৈশবে মায়ের কণ্ঠে সুরের এই আবাহন জিয়াউর রহমানের অবচেতনে এক গভীর নান্দনিক বোধ তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে ব্যস্ত সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনের শত ঝঞ্ঝাটের মাঝেও তিনি সুরের অবগাহনে শান্তি খুঁজতেন। বিশেষ করে ধ্রুপদী ও মেলোডিয়াস গান শোনার প্রতি তাঁর এক ধরনের অন্তহীন তৃষ্ণা ছিল। রবীন্দ্রসংগীত এবং নজরুলের দ্রোহ ও প্রেমের গান তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে তিনি কেবল একজন আনুষ্ঠানিক অতিথি হিসেবে যেতেন না, বরং পারফর্মারদের পরিবেশনা অত্যন্ত সূক্ষ্ম কান দিয়ে উপভোগ করতেন এবং অনুষ্ঠান শেষে শিল্পীদের সুনির্দিষ্ট প্রশংসা করে চমকে দিতেন (Ahsan, 2020)।

মাঠের গতি ও শৃঙ্খলার মেলবন্ধন: খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা

ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে জিয়াউর রহমান ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের ক্রীড়া কাঠামোর মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী। তরুণ বয়স থেকেই তিনি নিজে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সামরিক জীবনে ফুটবল, হকি এবং টেনিস খেলার প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ ঝোঁক। খেলাধুলাকে তিনি কেবল বিনোদন মনে করতেন না, বরং যুবসমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা এবং জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার অন্যতম মোক্ষম হাতিয়ার মনে করতেন।

রাষ্ট্রের হাল ধরার পর এ দেশের ঝিমিয়ে পড়া ক্রীড়াঙ্গনে তিনি এক অভূতপূর্ব প্রাণের সঞ্চার করেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে প্রথম 'ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ড' ও 'বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান' (বিকেএসপি)-এর প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি হয়, যা আজ দেশের ক্রীড়াবিদ তৈরির প্রধান সূতিকাগার (Khan, 2018)। তিনি বিশ্বাস করতেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি সদ্য স্বাধীন দেশের পতাকা সগৌরবে তুলে ধরার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো খেলাধুলা। ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে তিনি দেশব্যাপী প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের সূচনা করেছিলেন, যা তৎকালীন এশীয় ফুটবলে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে সাধারণ মানুষের সাথে বসে খেলা দেখা এবং খেলোয়াড়দের পিঠ চাপড়ে উৎসাহ দেওয়ার দৃশ্য সে সময় এ দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিতে এক অনন্য মানবিক মাত্রা যোগ করেছিল।

হৃদয়ের নিভৃত কোণে মরমীবাদ: সুফিবাদ ও মাজারের প্রতি ভক্তি

বাহ্যিক দৃষ্টিতে একজন মডার্নিস্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক মানুষ মনে হলেও, শহীদ জিয়ার অন্তরে ছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা। তিনি লোকদেখানো ধর্মীয় আচারের চেয়ে সুফিবাদের মূল বাণী—মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং আত্মশুদ্ধির দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। এ দেশের সুফি সাধক এবং আউলিয়াদের প্রতি তাঁর ছিল এক অতলান্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধা।

ইতিহাসের দলিল ঘেঁটলে দেখা যায়, যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিংবা রাষ্ট্রীয় সফরের প্রাক্কালে তিনি নিভৃতে বিভিন্ন মাজার শরীফে জিয়ারত করতে যেতেন। সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার এবং ঢাকার হাইকোর্ট মাজার বা মিরপুরের শাহ আলী বগদাদী (রহ.)-এর মাজারে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল (Maniruzzaman, 1980)। তবে এই ভক্তি কেবল রাজনৈতিক ফায়দা লোটার কোনো কৌশল ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অংশ। প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, জিয়ার ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ, প্রায় একজন দরবেশের মতো সাজসজ্জাহীন ও মিতব্যয়ী (Mascarenhas, 1986)। ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে থেকেও এই যে পরম অনাসক্তি এবং সাদামাটা জীবনযাপন, এর পেছনে সুফি দর্শনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছিল। তিনি মাজারের সুফি-সাধকদের মানবতাবাদী দর্শনকে অত্যন্ত সমীহ করতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে বাংলার মাটির যে আবহমান উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি, তার মূল ভিত্তি এই সুফি ঐতিহ্যই।

শেষ কথা

ইতিহাসের পাতায় শহীদ জিয়াউর রহমান সব সময় একজন কঠোর প্রশাসক বা সেনাপতির অবয়বে হাজির হন। কিন্তু ‘ can you find details ’ এর গভীর গবেষণায় যখন আমরা তাঁর চরিত্রের এই সমান্তরাল রেখাগুলোকে স্পর্শ করি—তাঁর সাহিত্যপ্রীতি, সুরের প্রতি টান, মাঠের প্রতি ভালোবাসা আর হৃদয়ের আধ্যাত্মিক সুফিবাদ—তখন আমরা বুঝতে পারি, তিনি কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন মূলত এক বহুমাত্রিক ও গভীর নান্দনিক চেতনার মানুষ। ইতিহাসের খেরোখাতায় তাঁর এই কোমল, মানবিক এবং শিল্পমনা রূপটি চিরকাল এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে ভাস্বর থাকবে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে সাহিত্যনামা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে।

রেফারেন্স 

  • Ahmed, E. (2009). Military Rule and the Myth of Democracy in Developing Countries. University Press Limited. 

  • Ahsan, M. R. (2020). Cultural Identity and State-Building in Post-1975 Bangladesh. Academic Press. 

  • Anisuzzaman, M. (2012). Creativity, Identity, and Reality: Essays on Bangladesh. Pitambar Publishing. 

  • Hasan, M. (2015). The Untold Chapters of Ziaur Rahman. Heritage Publishers. 

  • Khan, M. M. (2018). Institutionalizing Sports in Bangladesh: A Historical Perspective. Oxford University Press. 

  • Maniruzzaman, T. (1980). The Bangladesh Revolution and Its Aftermath. University Press Limited. (

  • Mascarenhas, A. (1986). Bangladesh: A Legacy of Blood. Hodder & Stoughton. 

নবীনতর পূর্বতন