অভিশপ্ত মৃত্যু
মোস্তাকীম আহম্মেদ রাহুল
প্রতি পূর্ণিমায় কিংবা অমাবস্যায় আমার স্থিতি বিনাশ হয়,
আমি পিশাচ হয়ে যাই,
অথবা কোনো নেকড়ে মানব,
আমার উপর ভর করে জগতের সকল অন্ধকার।
সব কালো কালো অধ্যায়,
কালো কালো শক্তি,
আমায় গ্রাস করে।
গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে এক পাশবিক হুঙ্কার।
তা নয় হাসি, নয় কান্না, নয় অন্য কোনো আবেগের প্রতিফলন।
একদা সে শব্দ শুনেছিলো কেউ,
সে আমার নাম দিয়েছিলো পুনরুজ্জীবিত মৃতদেহ,
যার দেহটা জীবিত হলেও আত্মাটা বন্দি অন্য কারও খপ্পরে।
মুক্তির স্বাদ এজীবনে পাওয়া হলো না বিধায় আমি একটা মৃতদেহই রয়ে গেলাম।
যার ভেতরে একেক দিন একেকটা অস্তিত্ব ভর করে।
দিনের আলোয় আমি স্বাভাবিক মানুষ,
সুস্থ দেহে সুস্থ আত্মা ব্যতীত অন্য কিছু নয়।
অন্ধকারে কোনোদিন আমি নেকড়ে মানব,
কোনোদিন পুনরুজ্জীবিত মৃতদেহ,
কোনোদিন হয়তো শয়তানের ঘোড়সওয়ার,
কোনোদিন আবার স্বয়ং মৃত্যু।
তবে আমার এই রূপান্তর আমার হাত দিয়ে হত্যা ঘটায়নি কোনোদিন।
সত্যিই কি তাই?
হত্যা ঘটায়নি?
আত্মহত্যা কি হত্যা নয়?
আত্মহত্যার পর নিজের শবে একাধিক সত্তাকে ভর করবার স্বাধীনতা প্রদান কি নিজেকে বিক্রি করে দেওয়া নয়?
শয়তান আত্মা কেনে শুনেছিলাম,
কিন্তু দেহের ঠিকাদারি কার কাছে?
নিরুত্তর আমি উত্তর খুঁজতে বেরুলাম রাস্তায়,
আমার নেকড়ে রূপে প্রতিবাদী হয়ে তেড়ে এলো একদল জার্মান শেফার্ড।
শয়তান আমার জন্য ঘোড়া পাঠালো,
আমি দুরন্ত বেগে অগ্নিউচ্ছ্বাসিত সে ঘোড়া ছুটিয়ে চললাম,
পথে দেখলাম কতশত মহামারি,
কত শত মানুষ মরেছে,
কেউ জৈবিক, কেউ আত্মিক,
জলজ্যান্ত মানুষের বড্ড অভাব এখানে।
শয়তানের ঘোড়ার যে ডানা আছে সেটি আমার অজানা ছিলো।
আকাশপথে উড়তে উড়তে শয়তান বাস্তব শয়তানে রূপ নিলো,
আমি রূপান্তরিত হলাম পুনরুজ্জীবিত সে মৃতদেহে।
আকাশ থেকে পড়ে গিয়ে দেহের কত শত হাড় মাংস অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন হলো সে খেয়াল নেই।
মৃতদেহে কি ব্যথা হয়?
বোধশক্তি বলে ব্যথা হয় না।
এত উচ্চ পতনও আমায় ব্যথা দিলো না।
মানবশিশু হোক কিংবা তারুণ্যে উদ্দীপ্ত বীরপুরুষ,
সবাই আমায় দেখে অভিশপ্ত বলে পালাতে লাগলো।
আমার স্পর্শই নাকি মানুষের অকালমৃত্যুর অন্যতম কারণ!
আমি তাই আর এই অভিশপ্ত শরীর নিয়ে কাউকে ছুঁয়ে দেখিনি কোনোদিন।
একদল রাজসৈনিক এলো,
তীরধনুক বর্ষণ, কামান দাগা হলো আমায় লক্ষ্য করে।
আমার দেহের অবশিষ্টাংশগুলোকেও মিশিয়ে দিলো ওরা।
আমায় পুড়িয়ে আমার ভস্মীভূত অবশিষ্টাংশকে ঠাঁই দেওয়া হলো ভূগর্ভের কোনো গভীর স্থানে।
কিন্তু আমার কোনো ব্যথা হলো না।
আমি মৃত্যুবরণ করবার বদলে স্বয়ং হয়ে উঠলাম মৃত্যু।
আত্মমৃত্যু বলে কিছু আছে?
বোধ করি নেই।
তবে মৃত্যু আছে।
মৃত্যু হবার পর আমার পুনরুজ্জীবন হলো।
শয়তান যে শরীরের উপর কর্তৃত্ব পেয়েছে তা অবিনশ্বর না হলেও তার মুক্তি নেই।
অতএব আমিই হলাম মৃত্যু।
আমার দেহটা মরলো না।
কিন্তু আমি বন্দি হলাম মৃত্যুরূপেই।
আত্মমৃত্যু থেকে অপর মৃত্যুর কারণ হওয়া এড়াতে আমি বন্দি করলাম নিজের শরীরকে।
বন্দি অস্তিত্বটা হুঙ্কার ছাড়তে লাগলো।
"আমায় মুক্তি দাও!
নয়তো সবকিছু শেষ করে দেবো!"
বন্দিদশায় কাউকে না পেয়ে নিজেকেই শেষ করতে লাগলাম ধীরে ধীরে।
কোনো এক কবি বলেছিলেন ধ্বংসই মানবচেতনার সেরা ফসল।
আমিও তাই ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠলাম।
হিংস্রভাবে, পাশবিকভাবে,
নিজের ভেতরের জানোয়ারটাই আমাকে ধীরে ধীরে বিলীন করে দিলো।
কারণ আমার মুক্তিলাভের আর্তচিৎকার কেউ শোনেনি,
আমি কাঁদতে জানিনা, হাসতেও না।
শুধু চিৎকার করতে পারি, গর্জন করতে পারি, হুঙ্কার ছাড়তে পারি।
এখন আর মুক্তি চাইনা আমি;
দিনের আলোয় যে হাসিমাখা স্বাভাবিক মানুষটা হয়ে বেড়াই,
সেটিই হয়ে থাকতে চাই দিনের বেলা।
রাতের অন্ধকারের সেই পাশবিক জানোয়ারটা কেউ না দেখতে পেলেই আমার মানবজীবন সার্থক।
আমি আমার এই পশুত্বকে শুধু আমারই করে রাখতে চাই।
না চাইতেও অনেক পশুত্ব ভেতরে নিয়েই বাঁচতে হয় মানুষকে।
কেউই পুরোপুরি ভালো বা মন্দ হয় না।
তবে আমার এই দ্বিচারিতা মানতে কষ্ট হয় কেন?
আমার অন্ধকার কেন বার বার আমার আলোকিত চেহারাটাকে দেখে বিকট শব্দে হাসে?
হাসেও না, উপহাস করে যেন!
সে হাসির উপহাস বুঝতে তার বিকট শব্দই যথেষ্ট,
তাতে বৃথা বাক্যব্যয়ের প্রয়োজন নেই।
তবে এই আত্মদ্বন্দ্বের কারণ কী?
বারংবার রূপান্তর আমার স্থিতিশীল রূপকে করেছে বিকৃত।
আমি বিকৃত হাসি দেখে ভয় পেয়েছি,
নিজেও তার সাথে হাসবার চেষ্টা করেছি,
হেসেছি,
অন্ধকারে একটা মোমবাতির আলোয় দেখেছি,
ঐ সত্তাটা আসলে আমি না,
ও আসলে শয়তান, কিংবা মৃত্যু।
হয়তো আমিই সেই মৃত্যু,
অভিশপ্ত মৃত্যু।
যে অভিশাপ থেকে কেউ নিস্তার পাবে না,
স্বয়ং আমিও না!
১৫ই নভেম্বর, ২০২৫, শনিবার, রাত ১০টা, কোনো অচেনা কানাগলি, ঢাকা।