তুমি আর আমি, আমাদের জীবনটা কাটিয়ে দিলাম একটা ছাদের নিচে। আমরা দু’জন আলাদা মানুষ, চিন্তা ভাবনা সিনেমা গান সিরিয়াল জীবনের দর্শন পছন্দ অপছন্দ স্বভাব – সব কিছুই ভিন্ন আমাদের। তোমার গ্যাস হয় মানুষের সাথে মিশতে না পারলে। আমার? নিজের সাথে নিজে একা থাকতে না পারলে। তুমি কথা বলো যেভাবে তুমি বেঁচে থাকো – প্রাণের উচ্ছাসে, যেভাবে পাহাড় ভেঙে ছিটকে বেড়িয়ে আসে ঝর্না। আমি বাঁচি ধীর মৃদুমন্দ ক্ষীণ জলধারার মতো, যে জানে সামনে সমুদ্র, তবুও বিস্ময় শ্রদ্ধা ভালবাসা আর কৃতজ্ঞতায় সে এতটাই বিহ্বল যে ছুটে যাবার মতো সাহস বা অবস্থা কোনটাই তার নেই। তুমি আত্মবিশ্বাসী; তুমি খুঁজে বেড়াও কিভাবে প্রতিটা মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভালোটাকে নিজের ভেতরে ধারণ করা যায়, তাদের থেকে মূল্যবান কিছু শিখে নেয়া যায়। আমি ভীরু; ব্যস্ত হয়ে যাই কিভাবে তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মন্দ এনার্জি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। তুমি খুশি হও ছোট ছোট জিনিসে। আমি খুশি হই কিভাবে ওই ছোট জিনিসগুলো এত বড় আনন্দ বয়ে নিয়ে আসে সেই প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণে। তুমি ফুলের সাথে ছবি তোলো, আমি তাকিয়ে দেখি তুমি নিজেই তো একটা ফুল।
দু’জন ত্রুটিযুক্ত মানুষ একে অপরকে ভালবেসে পাথর আর নদীর স্রোত হয়ে গেল। তুমিও থেমে যাও না, আমিও নিজেকে ভাঙতে চাই না। যার নামে শপথ করে একদিন আমরা এই ঘর বেঁধেছিলাম, এই সংসার সেই অমোঘ গন্তব্যেই এগিয়ে চলেছে, প্রতিদিন, একটু একটু করে। যা কিছু তুমি করো, যেরকম আন্তরিকতার সাথে করো, এই সংসারের জন্য, আমার জন্য, পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের জন্য, আমি তার কানাকড়ি কিছুই পারি না।
যেদিন আমাদের একজন এখানে আর থাকবে না, সে যেই হোক, তাকে শিখে নিতে হবে কতো কিছু। না তুমি পারবে আমার মতো করে, না আমি পারব তোমার প্রাণের শক্তি দিয়ে এই জীবনের হাল ধরতে। তবে আমি জানি আমরা দু’জনেই পারব। এমন কি-ই বা আছে যা ভালবাসার শক্তি দিয়ে অর্জন করা যায় না? ঠিক যেভাবে আমরা একে অপরকে ধরে রেখেছি এতটা বছর ধরে, নিজের অহংকারের টুঁটি চেপে, ভালবাসার অনির্বাণ শিখাকে উদযাপন করে, সম্মান শ্রদ্ধা বিনয়ের মালা বদল করে করে।
দু’দিনের এই মানবজীবন অনন্তকে ছুঁতে পারে, যদি মানুষ বুঝতে শেখে, এই চায়ের কাপের সবচাইতে দামী উপকরণ আর কিছুই নয়, ভালবাসার জীবনসাথীর সঙ্গ – যার হাতে আমার জীবনের ভালো মন্দ সে আমার ভেতর আর বাহির সবটাই সাজিয়ে দিতে পারে শুধুমাত্র কোমল মায়ার এতটুকুন পরশ দিয়ে। যার সাথে অনন্তকাল কাটাব বলে তিনি নিজেই বেছে দিয়েছেন, নরম মাটির সাড়ে তিন হাত ঘর তাকে আমার কাছ থেকে দূরে নেবে কেমন করে? আমাদের সেই ঘরটাকে যে তিনি সাজিয়ে দিয়েছেন – তাঁর প্রেমের জ্বলজ্বলা উপস্থিতি সেই ঘরের দেয়ালে কি মনোরম রঙ ঢেলে দিয়েছে।
আর ওপাশটাতে? আমাদের অনন্তের ওই সংসারে? তোমার ভীষণ পছন্দের সোয়ারভস্কি ক্রিস্টালের চাইতেও দামী মণি মুক্তা খচিত ঝাড়বাতিগুলো ঝুলে আছে। আমাকে যে সেই প্রাসাদটা দেখিয়ে দেয়া হয়েছে এপাশ থেকেই। তার প্রবেশপথে তোমার নাম হীরা দিয়ে খোদাই করা, ভেতরে দেয়ালে তোমার হাসিমাখা ছবি। মুন্সিগঞ্জের পঞ্চাশ পদের ভর্তা, ছিত রুটি আর হাসের মাংস, নানির হাতের হাড়ি কাবাব, ব্রেইন মাসালা, শীতের ভোরে গরম গরম ভাপা পিঠা, বিকেলের চায়ে ডুবিয়ে কেক বিস্কুট, চানাচুর মাখা, দৈ ফুচকা, মেঝমামার ইলিশ পোলাউ, মোমেনা বুয়ার লুচি আলুর দম – এগুলো তো সেখানে চিন্তা করলেই সামনে চলে আসবে। তুমি বলবে, “দেখেছ? আল্লাহজী ঠিক কতটা দয়ালু? কি সাংঘাতিক ভালবাসেন তিনি আমাকে! তোমার মতো আমাকে এতটুকুও কষ্ট দিলেন না তিনি! রান্নাঘরে পর্যন্ত ঢুকতে হলো না আমাকে। হুম, দ্যাখো, দ্যাখো, এবার আমার পাশে বসো আর বিসমিল্লাহ বলে আসুদা করে খাও”। আরও কত গোপন রহস্য সেখানে অপেক্ষা করে আছে তোমার জন্য। সব কি আর একবারে বলে দেওয়া যায়? নাহ্, কখনোই না।
আমাদের চির অনন্ত যৌবন কাটতে থাকবে সেখানে, ক্লান্তিবিহীন, জরাবিহীন, নিশ্ছিদ্র সেই সুখ। পছন্দের বাহারি কাপড়গুলো গায়ে দিয়ে তুমি বেড়াতে যাবে এঘর থেকে ওঘর, এই দেশ থেকে সেই দেশে, তোমার প্রিয় মানুষগুলোকে সাথে নিয়ে, যেন প্রতিদিনই তোমার ঈদ। ‘সাবধানে যেও কিন্তু’ – এই কথা আমাকে আর বলতে হবে না, এতটুকুও বারণ করব না আমি তোমার কোন কিছুতেই। বসে বসে দেখব, তোমার সুখে সুখি হব। বিশ্বাসীরা একসাথে বসে এই জীবনের সুখকর মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণ করতে থাকবে।
তোমার আনন্দ যেমন শেষ হবে না, আমার ভাবনার তালাশও চলতে থাকবে নিরন্তর। যাকে, যাদেরকে আমি এখানে খুঁজে বেড়াই তারা সবাই তো ওখানে ভীষণ কাছেই থাকবেন। এই দেহের তালা খুলে কত সহজেই না আমি তাদের ছুঁতে পারব পরম শ্রদ্ধাভরে। দু’জনে পাশাপাশি বসে বিস্ময়ে হা করে গিলতে থাকব সেই অনাবিল আনন্দলোক। রোজ সন্ধ্যায় সেখানে ফায়ারওয়ার্কস হয় নতুন নতুন সাজে, এই তারা থেকে ওই তারায়, অথচ সেই আওয়াজে ভয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে না কেউ, এতটুকুও।
আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেব
~ জেহান আলী, ২০২৩
