মৃত্যু এবং অন্যান্য ভাবনা

মৃত্যু এবং অন্যান্য ভাবনা 
জেহান আলীর দুটি লেখা একসাথে


১. যারা বলে আমরা সারাক্ষণ শুধু মৃত্যু নিয়েই কথা বলি, তাদের জন্য বলছি, পারলে ভালো করে শুনে রাখুন, সম্ভব হলে বুঝবার চেষ্টা করুন, যদিও বুঝবার মতো মন আর মানস বেশির ভাগ মানুষ অনেক কাল আগেই হারিয়ে ফেলেছে। 

জীবনের মূল্য পরিশোধ করতে হয় মৃত্যুর বিনিময়ে, আর সেটা শরীরের মৃত্যু নয় - অহংকারের মৃত্যু, লোভ লালসার মৃত্যু, দুনিয়ার জন্য প্রতিনিয়ত হাহাকারের মৃত্যু। বাগানের আগাছা সাফ করাটা এমন আহামরি কোনো কাজ নয় - যার জন্য সেই মালীকে পুরস্কৃত করতে হবে। নফস, দুনিয়া, হাওয়া (বাসনা), ইবলিস - আত্মার বাগানের জন্য এগুলো আগাছা মাত্র। আগাছা তুললেই ফুল ফুঁটতে শুরু করে না, সেজন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়। যে নশ্বর দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠার ফুল ফুটিয়ে খুশিতে মরে মরে যাচ্ছে - তাকে বাঁচতে দাও - অসুবিধা কি, যেভাবে সে বেঁচে থাকতে চায় - থাকুক না। যে নিজের আত্মায় আল্লাহ্‌র ভালবাসার ফুল ফোঁটাবে বলে মরিয়া হয়ে গেছে - সে সারাক্ষণ নিজের বাগান সাফ করতেই থাকে - আল্লাহ্‌র ঐশী আলো দিয়ে। সেই আলোর নামই নূর মুহাম্মাদি ﷺ, আর সেই বাগানটাই মুর্শিদের দরগা। আত্মার মাটি, ফুলের ফলের চারা, সার, আলো, পানি, বাতাস - সমস্তকিছুই সেই নূর দিয়ে তৈরি; যে আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করতে চায় - মুর্শিদ তাকে জানিয়ে দেন - কেমন করে সেই ফুল ফোঁটাতে হয় - আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জনের মওকায়; নূরনবীর ﷺ প্রতি অফুরন্ত সালাতু’সালাম প্রেরণের মাধ্যমে।   

আমাদের মৃত্যুচিন্তা তাই 'মরে যাব, মরে গেলাম, সবাইকেই তো মরতে হবে একদিন' - এরকম কোন ফালতু অয়াজ নয়; মৃত্যু আমাদের জন্য সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকার পুণ্যতম অবলম্বন, কারণ আমরা ভীষণ লোভী যে, তাই; ছোট্ট এই একটা জীবন আমাদের জন্য যথেষ্ট নয় মোটেও; আমরা বেঁচে থাকতে চাই অনন্তকাল - নিজের স্বার্থের জন্যে নয়, বেহেশতের বিলাশবহুল বাগানবাড়ি আর সত্তর হুরির লোভেও নয়; আমরা বেঁচে থাকতে চাই অনন্তকাল - আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জনের মওকায়; নূরনবীর ﷺ প্রতি অফুরন্ত সালাতু’সালাম প্রেরণের মাধ্যমে। 

নবীজি ﷺ, তাঁর পরিবার, তাঁর সাহাবা, তাঁর আওলিয়া ও সমগ্র উম্মতের উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

১৬ রমজান, ১৪৪৭, মিশিগান


২. মানুষ জন্মায়, মানুষ মারা যায় - কোন দুর্ঘটনা ছাড়াই; প্রতিদিন এরকম হতে থাকে, তোমার চারপাশে, হাসপাতালে, বাড়িতে, পাড়ায় মহল্লায়; সূর্যের আলো আর বৃষ্টির ফোঁটার মতো এগুলো আমাদের গায়ে লাগে, তবে পাহাড়ধ্বসের মতো ভেঙে দিয়ে যায় না, যতক্ষণ না সেই মানুষটা তোমার নিজের পরিবার, নয়ত পরিচিত কেউ, যাকে তুমি ভালবাসতে - বন্ধু, ক্লাসমেট, অফিসের কলিগ, শিক্ষক, প্রতিবেশি, যেই হোক না কেন। সমস্যাটা তাহলে কোথায়? সে মারা গেল বলে তোমার খারাপ লাগছে - সেটা? নাকি তুমি তাকে ভালবেসে ফেলেছিলে - তাই? হয়ত কোনদিন বুঝতেও পারনি - কেমন করে বুকের ভেতর ভরসার একটা ঘর বেঁধে ফেলেছিলে তার সাথে - এতটুকু সদ্ব্যবহার - সামান্য একটু হাসির বিনিময়ে? 

পাহাড়চূড়ায় বৃষ্টি নামলে তারাই ভিজে যায় - যারা পাহাড়ের বাসিন্দা, অথবা টুরিস্ট, কষ্ট করে চড়াই বেয়ে উঠেছে - চারপাশের মনোরম দৃশ্য দু’চোখ ভরে উপভোগ করবে বলে। নিজের ব্যথায় তো দানবেরও চোখ ভিজে যায়; অন্যের কষ্টে বুকের গহীনে রক্তক্ষরণ হয় যার - তারই নাম মানুষ। কষ্টের তীব্রতায় নিজে মরে যাচ্ছে - তবুও অন্যের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে হেসে বলে, “ও আমার প্রিয়, এসো, এই নাও, এক হাতে শান্তি, অন্য হাতে সুরক্ষা।” তুমি তাহলে কে? এই নীল গ্রহের স্থায়ী বাসিন্দা, নাকি অন্যের কষ্টের পাহাড় ভেঙে চলেছ সহমর্মিতার পরশে - রোজ দিন, একটু একটু করে?  

১২ শাবান, ১৪৪৭, মিশিগান
নবীনতর পূর্বতন