মো. রিদওয়ান আল হাসান
২০২৪ সালে ‘বৃত্ত প্রকাশন’ থেকে প্রকাশিত শেখ ফাহিম ফয়সালের ২৩১ পৃষ্ঠার 'সুফি সংস্কৃতি' বইটি বাংলা ভাষায় সুফি ঐতিহ্য এবং মতবাদ বিষয়ক একটি তথ্যবহুল কাজ। বইটিতে সুফিবাদ এবং সুফি সংস্কৃতিকে অত্যন্ত সহজ ভাষায় পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বইটির ভূমিকায় লেখকের একটি নিজস্ব সংজ্ঞা পাওয়া যায়। লেখক বলেছেন, "Sufism is the transition from answer to quiet"। অর্থাৎ, সুফিবাদ হলো উত্তর দেয়া থেকে নীরবতায় উত্তরণ। প্রশ্নকারী থেকে নীরবতায় পৌঁছানোর এই আর্থ-সামাজিক চর্চাকেই লেখক সুফি সংস্কৃতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
পাশাপাশি, বইটির পেছনের প্রচ্ছদে লেখা উক্তিটি মনোযোগী পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করবে। যেখানে লেখক বলেছেন,
"স্রষ্টাকে একবার দেখার পর কেউ বেঁচে থাকেনি, এটি যেমন সত্য, তেমনই তাঁর দর্শন পাওয়ার পর কেউ মৃত্যুবরণ করেনি, এটিও সত্য।"
লেখক পরিচিতি অনুযায়ী, পারিবারিকভাবে তাসাউয়্যুফ চর্চিত হওয়ায় ধীরে ধীরে এই বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি, শিল্প সাহিত্য, স্থাপত্যকলা, মনস্তত্ত্ব এবং সঙ্গীতের প্রতি তার গভীর আগ্রহ এই বইয়ের পাতায় পাতায় প্রতিফলিত হয়েছে।
বইটিতে 'সুফি' শব্দের উৎপত্তি নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে যে কীভাবে 'সুফ' বা পশম এবং 'সাফা' বা পবিত্রতা থেকে সুফি শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। আধ্যাত্মিকতার বিভিন্ন স্তর যেমন ফানা, বাকা, জিকির এবং ধ্যান বা মোরাকাবার মতো বিষয়গুলো প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বইটির একটি বড় অংশ জুড়ে মাজার, খানক্বাহ এবং ওরস আয়োজনের বহুমুখী বিশ্লেষণ রয়েছে। গণযোগাযোগ তাত্ত্বিক জেমস ডব্লিউ. ক্যারের রিচুয়াল ভিউ অব কমিউনিকেশন তত্ত্বের আলোকে এই অধ্যায়গুলো পাঠ করা যেতে পারে। ক্যারের মতে, যোগাযোগ কেবল তথ্য আদান প্রদান নয়। এটি হলো বিশ্বাস এবং সংস্কৃতির একটি যৌথ উদ্যাপন। বইটিতে ওরস, মোমবাতি, আগরবাতি, গোলাপজল, শিরনি এবং গিলাফের ব্যবহারকে একটি সাংস্কৃতিক রূপ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই আচারগুলো অনুসারীদের মধ্যে একটি সামষ্টিক পরিচয় বা কালেক্টিভ আইডেন্টিটি তৈরি করে। বইটিতে চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া এবং মুজাদ্দেদিয়া তরিকার মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে।
আমাদের সমাজে মাজার এবং দরবারগুলোর ভূমিকাকে সমাজবিজ্ঞানী জার্গেন হ্যাবারমাসের পাবলিক স্ফিয়ার বা জনপরিসর তত্ত্ব দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়। উপমহাদেশে দরবারগুলো যুগ যুগ ধরে একটি বিকল্প জনপরিসর হিসেবে কাজ করেছে। যেখানে সমাজের প্রান্তিক মানুষ একত্র হওয়ার সুযোগ পায়। রবার্ট পুটন্যামের সোশ্যাল ক্যাপিটাল বা সামাজিক পুঁজি তত্ত্বের ধারণাও এখানে প্রাসঙ্গিক। দরবারগুলো মানুষের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করে। সেখানে পারস্পরিক আস্থার একটি বিশাল সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। বইতে থাকা তথ্যগুলোর সাথে এসকল তত্ত্ব মিলিয়ে পড়তে পারলে একটি সামগ্রিক বোঝাপড়ায় পৌঁছানো সম্ভব।
সুফিবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সমাজসেবামূলক রূপটির সাথে বাংলাদেশের দরবারগুলোর ভূমিকার একটি তুলনামূলক আলোচনা টানা যায়। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ পল ল্যাজার্সফেল্ডের টু স্টেপ ফ্লো তত্ত্ব অনুযায়ী সমাজের ওপিনিয়ন লিডার বা মতাদর্শিক নেতারা যেকোনো বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন খানকাহ এবং দরবারের পীর বা আধ্যাত্মিক নেতারা এই অপিনিয়ন লিডার হিসেবে কাজ করেন বা ঐতিহাসিকভাবে একটা সময় পর্যন্ত করেছেন। তাঁরা ধর্মের জটিল তাত্ত্বিক ভাষাকে রূপক এবং লোকায়ত সংস্কৃতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
আমরা জানি, সমকালীন বিশ্বে সুফিবাদের সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকার চমৎকার বৈশ্বিক উদাহরণ হলেন মওলানা শেখ নাজিম আল হাক্কানী এবং মওলানা শেখ হিশাম কাব্বানী। নকশবন্দিয়া তরিকার এই প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক নেতারা শুধু ধর্মীয় বয়ানে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তাঁরা বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে বিশাল অবদান রেখেছেন। তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিচরণ এবং লেখালেখি পশ্চিমা জগতেও সুফিবাদের একটি ইতিবাচক এবং যৌক্তিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছে। বইয়ের তথ্যের সাথে আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বা বাস্তব উদাহরন একত্রে সুফি সংস্কৃতির একটি বৃহত্তর রূপ বুঝতে সাহায্য করবে। ইমাম গাজ্জালী, হাল্লাজ, ইবনুল আরাবি, সারমাদ এবং জালালুদ্দিন রুমির মতো সাধকদের যে কাহিনীগুলো স্থান পেয়েছে, সেগুলো সুফিবাদের আদর্শ এবং চিন্তাশীলতার আবেদন এবং রাজনৈতিক অর্থনীতিতে সুফিদের অবস্থান বুঝতে সহায়তা করবে। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে লেখক দারা শেকোকে গুরুত্বপুর্ণ একজন সাধক হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন, যেখানে আওরঙ্গজেবের ভূমিকার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণও চোখে পড়ার মতো।
বাংলাদেশে সুফি ঐতিহ্যের প্রচার এবং প্রসার নিয়ে বইটিতে একটি বিশাল অধ্যায় বরাদ্দ রয়েছে। মুসলমানদের বাংলাদেশ বিজয়, ইবনে বতুতার বর্ণনায় বাংলাদেশ এবং সুহেল ই ইয়ামনের মতো ঐতিহাসিক বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন মাজার এবং দরবারগুলো লঙ্গরখানা পরিচালনার মাধ্যমে দরিদ্রদের মুখে খাবার তুলে দেয়। সাধারণ মানুষের বিপদে আপদে পাশে দাঁড়ায়। এটি মূলত সুফিদের সেই চিরায়ত সমাজসেবামূলক দর্শনেরই স্থানীয় রূপ। বিশ্বজুড়ে শেখ নাজিম আল হাক্কানী এবং শেখ হিশাম কাব্বানী যে বৈশ্বিক মানবতার বার্তা দিয়েছেন, বাংলাদেশের স্থানীয় দরবারগুলোও শেকড় পর্যায়ে সেই একই কাজ করে যাচ্ছে।
বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো মাজার এবং সুফি সংস্কৃতি কেন্দ্রিক অর্থনীতির বিশ্লেষণ। ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতা কীভাবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করে তা এখানে স্পষ্ট। ওরস এবং মানত কেন্দ্রিক অর্থপ্রবাহের সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক কীভাবে গড়ে ওঠে তা সমাজবিজ্ঞানের পলিটিক্যাল ইকোনমি বা রাজনৈতিক অর্থনীতি তত্ত্বের চমৎকার উদাহরণ। শামস তাবরিজের মতো বিখ্যাত সুফি সাধকের উক্তি এবং নানা শিক্ষণীয় সুফি কাহিনী এই বইয়ের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।
মন, সত্তা, জীবন, প্রজ্ঞা, ফকিরি এবং যমুনার পানির মতো রূপক কাহিনীর মাধ্যমে সুফিবাদের গূঢ় রহস্য তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে আন্তোনিও গ্রামসির কালচারাল হেজেমনি বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য তত্ত্বের মাধ্যমে ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। বইটিতে বাংলার ইতিহাসে সুফি এবং রাজা বাদশাহদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা রয়েছে। দারা শিকোহ এবং জাহানারার মতো রাজকীয় ব্যক্তিত্বের সুফিবাদের প্রতি অনুরাগ এবং ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজি, সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওজ, ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ কিংবা পরবর্তী সুলতানদের সাথে সুফিদের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রমাণ করে যে ক্ষমতার রাজনীতিতে সুফি মতবাদ একটি বড় সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করেছে। শাসকরা সুফিদের পৃষ্ঠপোষকতা করে সমাজের বৃহত্তর অংশের সম্মতি বা কনসেন্ট আদায় করতেন। স্থাপত্য, সাহিত্য এবং সংগীতের প্রসারে তাদের এই অবদান মূলত সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারেরই একটি অংশ ছিল।
বইয়ের শেষের দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত কিছু বিখ্যাত মাজার এবং খানক্বাহের ছবি যুক্ত করা হয়েছে। এটি পাঠকের জন্য একটি দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা তৈরি করে। বইটির শেষ অংশে ২৮৩টি সূত্রের উল্লেখ সম্বলিত একটি বিশাল গ্রন্থপুঞ্জি যুক্ত করা হয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক রেফারেন্সের ব্যবহার লেখকের গবেষণার প্রামাণিক দলিল হিসেবে কাজ করে।
তবে, সমালোচনামূলক পর্যালোচনা করলে বইটির কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাও চোখে পড়ে। বিপুল তথ্যের সমাহার ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা বিক্ষিপ্ত রূপ ধারণ করেছে। একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর অভাব থাকায় তথ্যগুলো অনেক সময় বিবরণমূলক হয়ে গেছে। তথ্যগুলো বিশ্লেষণী রূপ পায়নি। এছাড়া অনুবাদজনিত আড়ষ্টতার কারণে প্রবন্ধগুলোর কিছু কিছু অংশের ভাষাগত সাবলীলতা ব্যাহত হয়েছে। কিছুক্ষেত্রে তথ্যের কিংবা বর্ণনার বাহুল্য পাঠকের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এই কলেবরে বিষয়গুলো আরেকটু সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো গেলে পড়ার প্রবাহ আরও মসৃণ হতো।
বইটিতে তথ্য কিংবা বর্ণনার পুনরুল্লেখ বা একাধিকবার একই বর্ণনা চলে আসার ঘটনাও দেখা যায়। ইন টেক্সট সাইটেশন কিংবা ফুটনোট অনুপস্থিত। তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিতে পাঠকের সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। লেখক অবশ্য কোনো অ্যাকাডেমিক বই হিসেবে এটি লিখেন নি। লেখক বইটিকে ‘বাংলা ভাষায় সুফি সংস্কৃতি নিয়ে লিখিত সর্বপ্রথম একক একটি গ্রন্থ’ হিসেবে দাবি করেছেন এবং বইটিকে কেবল প্রবেশদ্বার হিসেবেই বিবেচনার করার আহ্বান জানিয়েছেন। গ্রন্থপঞ্জি থেকে বিস্তারিত জেনে-বুঝে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে।
তথ্য সরবরাহের দিক থেকে এই বইটি একটি অনবদ্য প্রয়াস। যারা সুফিবাদ, সংস্কৃতি এবং সমাজের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা পেতে চান কিংবা গবেষণা করতে চান তাদের জন্য এটি একটি অবশ্য পাঠ্য গ্রন্থ। লোকসংস্কৃতি এবং জনযোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সুফিবাদ কীভাবে কাজ করেছে তা বোঝার জন্য বাংলা ভাষায় এটি একটি মূল্যবান সংযোজন। ইতিহাস, ধর্ম এবং সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য বইটি একটি চমৎকার রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
লেখক,
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সাহিত্যনামা
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

