মো. রিদওয়ান আল হাসানে
সকল মাযহাবের, সকল সময়ের এবং সকল দেশের প্রখ্যাত আলেম ও উলামাবৃন্দ আইন পেশাকে একটি পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ৪)। ইসলাম একটি বিজ্ঞানমনস্ক, শাশ্বত ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। মানবজীবনের এমন কোনো দিক নেই যা ইসলামী শরিয়তে আলোচিত হয়নি। পেশা হিসেবে আইন পেশার ধর্মীয় বৈধতা ও নৈতিক সীমারেখাও এর ব্যতিক্রম নয়।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই আদালতের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য। আইনজীবীগণ বিচারকার্যে বিচারককে সহায়তা করে থাকেন এবং সত্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সত্য প্রতিষ্ঠায় আদালতকে সহযোগিতা করা ইনসাফ কায়েমের সমতুল্য ইবাদত হিসেবে বিবেচিত হয় (কুরআন, সূরা নিসা ৪:১৩৫)। পক্ষান্তরে আদালতকে বিভ্রান্ত করা, মক্কেলের স্বার্থে অসত্যের আশ্রয় গ্রহণ করা বা অন্যায় কাজে সহায়তা করা কোনোভাবেই একজন আদর্শ আইনজীবীর বৈশিষ্ট্য হতে পারে না (বেহেশতী জেওর, খণ্ড ৫)।
বিচারককে আরবি পরিভাষায় হাকিম এবং আইনজীবীকে ওয়াকিল বলা হয়। আইন ও আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ পরিভাষা আরবি ভাষা থেকে আগত, যা ইসলামী সভ্যতায় বিচার ব্যবস্থার ঐতিহ্যকে নির্দেশ করে।
ইসলামী দুনিয়ার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইমামে আজম হযরত আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ এর ফিকহে হানাফির গ্রন্থসমূহে ওকালতের অধ্যায় বা বাবুল ওকালত সুস্পষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে। হেদায়া, শরহে বেকায়া, কানযুদ দাকায়েক, কুদুরী, মালাবুদ্দা ও মিনহুম প্রভৃতি কিতাবে ওকালতের শর্ত, দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে (হেদায়া, বাবুল ওকালত)। অতএব ওকালতকে অস্বীকার করা মানে হানাফি ফিকহের একটি মৌলিক অধ্যায় অস্বীকার করার শামিল।
বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ফতোয়ার গ্রন্থ ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ফাতহুল কাদির ও ফতোয়ায়ে শামীতে ওকালতের বৈধতা ও বিধিবিধান সুস্পষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে (ফতোয়ায়ে শামী, খণ্ড ৬)। হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহিমাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বেহেশতী জেওরে ওকালত ও উকিল নিয়োগ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।
বেহেশতী জেওরের পঞ্চম খণ্ডের ১৩৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে মানুষ যে কাজ নিজে করার অধিকার রাখে সে কাজ অন্যের মাধ্যমে করানোরও অধিকার রাখে। একেই শরিয়তের ভাষায় উকিল বানানো বলা হয়। এখানে উকিলকে আমানতদার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং আমানতের খেয়ানতকে কঠোরভাবে হারাম বলা হয়েছে। উকিল তার শ্রমের বিনিময়ে যে পারিশ্রমিক গ্রহণ করে তা তার জন্য হালাল (বেহেশতী জেওর, খণ্ড ৫, পৃ. ১৩৩)।
একই গ্রন্থের ১৩৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে যে উকিল কখনোই নিশ্চিতভাবে মামলা জিতিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে না এবং মিথ্যা সাক্ষ্য, ঘুষ বা অন্যায় পন্থা অবলম্বন করা কবিরা গুনাহ। তবে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আইনি দক্ষতার মাধ্যমে সত্যের সীমার ভেতরে থেকে যুক্তি উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং প্রশংসনীয় (বেহেশতী জেওর, খণ্ড ৫, পৃ. ১৩৫)।
মাসিক মদীনা পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা মুহিউদ্দিন খান স্পষ্টভাবে বলেন যে আইন পেশা নিঃসন্দেহে বৈধ এবং এর মাধ্যমে অর্জিত আয় হালাল (মাসিক মদীনা, এপ্রিল ১৯৯৭)।
ইসলামী আইনবিদদের সর্বসম্মত অভিমত হলো যে বিচার ব্যবস্থাকে সহজ ও কার্যকর করার লক্ষ্যে মামলা মোকদ্দমায় উকিল নিয়োগ বৈধ। বিশেষ করে দুর্বল, বোবা বা অধিকার আদায়ে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য ওকালত ইসলামী শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ন্যায়বিচারমূলক ব্যবস্থা (কুরআন, সূরা বাকারা ২:২৮২)।
আদালতে আইনজীবীরা সাক্ষ্যের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, আইনি ব্যাখ্যা ও যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে মানবাধিকার সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখেন। বিচারনীতির অন্যতম মূলনীতি হলো দশজন অপরাধী মুক্তি পেলেও যেন একজন নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি না পায়। এই নীতির বাস্তবায়নে আইনজীবীদের ভূমিকা অপরিসীম।
আইনজীবীর ভূমিকা ওপেন হার্ট সার্জারির মতো সূক্ষ্ম ও দায়িত্বপূর্ণ। তিনি কাউকে দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা করেন না। সত্য ও মিথ্যার চূড়ান্ত ফয়সালা প্রদান করেন বিজ্ঞ বিচারক। আইনজীবীর দায়িত্ব কেবল বিচারককে সঠিক তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা।
ইসলাম কখনোই বলে না যে অর্থ উপার্জনের জন্য সব পথ বৈধ। একজন পরকাল বিশ্বাসী আইনজীবী অসৎ উদ্দেশ্যে তার মেধা ও জ্ঞান ব্যবহার করতে পারেন না। কেউ যদি করে থাকেন তবে তার জবাবদিহিতা আল্লাহর দরবারে নিশ্চিত।
একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ বলেন যে ইসলাম শুধু কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্য নয় বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য। ওকালত বা আল ওয়াকালাহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অনুমোদিত একটি ব্যবস্থা (সহিহ বুখারি, কিতাবুল ওয়াকালাহ)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও বেচাকেনার ক্ষেত্রে সাহাবি বারাকাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে উকিল নিযুক্ত করেছিলেন। এটি ওকালতের শরঈ বৈধতার শক্ত প্রমাণ।
ইতিহাসে বহু প্রখ্যাত মুসলিম আইনবিদ ও আইনজীবী ইসলামী সভ্যতা ও রাষ্ট্রচিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আল্লামা ইকবাল রহিমাহুল্লাহ, ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ এবং উপমহাদেশের বরেণ্য মুসলিম আইনবিদরা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
অতএব বলা যায় যে আইন পেশা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য পেশা। তবে এর বৈধতা নির্ভর করে নৈতিকতা, সত্যবাদিতা ও শরিয়তের সীমারেখা মেনে চলার ওপর। নৈতিকভাবে উন্নত আইনজীবীরাই প্রকৃত অর্থে ইনসাফ ও মানবাধিকারের রক্ষক।
রেফারেন্স
কুরআনুল কারিম
সহিহ বুখারি, কিতাবুল ওয়াকালাহ
হেদায়া, বাবুল ওকালত
ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ৪
ফাতহুল কাদির
ফতোয়ায়ে শামী, খণ্ড ৬
আশরাফ আলী থানভী, বেহেশতী জেওর, খণ্ড ৫
মাসিক মদীনা, এপ্রিল ১৯৯৭
ইবনে আবিদীন, রদ্দুল মুহতার