সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা
![]() |
| মাওলানা শেখ হিশাম কাব্বানী |
আজ এখানে উপস্থিত হওয়া আমার জন্য বড় সম্মানের। আমি সম্মানিত রাষ্ট্রদূত গিয়েরমো অলিভেরির আমন্ত্রণে এখানে এসেছি। তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ধর্ম ও বহির্বিশ্ব সম্পর্কবিষয়ক সচিব।
এই দেশটির সঙ্গে আমাদের আগে থেকেই পরিচয় আছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সঙ্গে আমার বাবা-মার ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল (১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত)। আমরা লেবাননের মানুষ।
যদি না আমি ভুলকরি, আর্জেন্টিনা শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ আর্জঁ থেকে। যার অর্থ “অর্থ এবং রৌপ্য”। অর্থাৎ এটি দুনিয়ার অর্থ-সম্পদের দেশ। আবার আখিরাতের অর্থের দেশও।
এই দেশ অতিথিপরায়ণ। বহু অভিবাসীর জন্য এটি দরজা খুলে দিয়েছে। আমার পিতামাতাও তাদের একজন ছিলেন। আমি রাষ্ট্রদূতকে বলেছিলাম, আমার বাবা স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলতে পারতেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি পারি না।
আজ রাতে আমরা এখানে জড়ো হয়েছি শুধুমাত্র আল্লাহর ভালোবাসার জন্য। আমাদের স্মরণকে নবায়ন করার জন্য। মানবজাতির কাছে প্রেরিত বিভিন্ন বার্তাকে আরও পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য। এই বার্তাগুলো এসেছে রাসুল, নবী, এবং সৎ ও আন্তরিক মানুষদের মাধ্যমে। তারা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং আলোকিত করেছেন।
আমরা কখনো কোনো নবী, রাসুল, সৎ বা আন্তরিক মানুষকে সহিংস হতে দেখিনি। আমরা কখনো দেখিনি তারা সন্ত্রাস করেছেন বা কোনো ধরনের চরমপন্থায় জড়িয়েছেন। বরং, আমরা দেখি তারা সবাই আমাদের পিতা আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে নূহ আলাইহিস সালাম, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম, ঈসা আলাইহিস সালাম এবং সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত এক ধারায় এসেছেন। এবং অন্য সকল নবীগণও এসেছেন তাদের অনুসারীদের পথ দেখানোর জন্য একইরকম বার্তা নিয়ে।
আমরা যদি ইতিহাস পড়ি, বাইবেল পড়ি, তাওরাত পড়ি, পবিত্র কুরআন পড়ি, যবূর পড়ি, এবং আরও বহু কিতাব পড়ি যা এর আগেও এসেছে, আমরা একটি সার্বজনীন বার্তা দেখতে পাই। তা হলো রবের ইবাদত করা। রবকে ভালোবাসা। রবকে স্মরণ করা।
আমাদের রব ভালোবাসা চান। তিনি অন্য কিছু চান না। এখন প্রশ্ন হলো, “আমরা কীভাবে ভালোবাসবো?” কাউকে আপনি সহিংসতার মাধ্যমে বা লড়াই করে আপনাকে ভালোবাসতে বাধ্য করতে পারেন না।
ভালোবাসা প্রকাশ করা হয় লাল একটি ফুল দিয়ে। অথবা একটি সুন্দর উপহার দিয়ে। আমাদের ওপর দায়িত্ব হলো আমাদের রবের নিকটবর্তী হওয়া। সেই উপহারগুলোর মাধ্যমে, যা তিনি আমাদের দিয়েছেন। অর্থাৎ নবী ও রাসুলগণ। সবার জানা উচিত যে মূল বার্তা হলো সেই পবিত্র অনুভূতি। যে পবিত্রতা থাকে আপনার সবচেয়ে প্রিয় সত্তার সঙ্গে সম্পর্কের ভেতর।
আজ মানুষ ধর্ম নিয়ে কথা বলে। তারা বলে আমরা আমাদের রবকে ভালোবাসি। আমরা তাঁর রাসুলদের ভালোবাসি। এটি ভালো কথা। কিন্তু, এটি পরিপূর্ণ নয়।
আপনি যদি জানতে চান এটি পরিপূর্ণ কি না তাহলে একটি কথা ভালোভাবে ভাবুন। মনে করুন যে আপনার সন্তান অসুস্থ। আপনি কতটা যত্ন নেন! কত রাত জেগে থাকেন, যাতে সে নিরাপদ থাকে! আপনি কত কান্নাকাটি করেন! আপনার রবের কাছে দোয়া করেন যেন তিনি আপনার সন্তানকে সুস্থ করে দেন। আপনার পুরো দেহ এবং আত্মা সেই সন্তানের যত্নে নিবেদিত হয়ে যায়। আত্মা এবং দেহ একত্রে কাজ করে ভালোবাসা প্রকাশ করে।
একটি উদাহরণ দিই, কোনো মা বা বাবা নৌকায় সমুদ্রে আছেন। হঠাৎ বড় ঝড় আসে। নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। তখন সেই মা বা বাবা চেষ্টা করেন সন্তানকে বাঁচাতে। তারা সন্তানের জন্য নিজের জীবন দিয়ে দেবেন।
আল্লাহ তাঁর রাসুলদের পাঠিয়েছেন মানবতার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে। তিনি তাদের পাঠাননি মানবতাকে ধ্বংস করতে। তিনি তাদের পাঠিয়েছেন সেতুবন্ধন তৈরি করতে। এ কারণেই বিভিন্ন রাসুল এসেছেন। কারণ বিভিন্ন সম্প্রদায় রয়েছে। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের প্রয়োজন অন্যদের সঙ্গে সেতু গড়া।
মুসা আলাইহিস সালাম তাঁর সম্প্রদায়কে আমাদের রবের দিকে পরিচালিত করেছেন। ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর সম্প্রদায়কে আমাদের রবের দিকে পরিচালিত করেছেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সম্প্রদায়কে আমাদের রবের দিকে পরিচালিত করেছেন। নূহ ও ইবরাহিম আলাইহিমাস সালামও তাই করেছেন। তারা মানবতার মুক্তির জন্য নিজেদের জীবন দিয়েছেন।
أَطِيعُوا اللّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الأَمْرِ مِنكُمْ
সূরা আন নিসা, আয়াত ৫৯
“আল্লাহর আনুগত্য করো। রাসুলের আনুগত্য করো। এবং তোমাদের মধ্যকার কর্তৃত্বশীলদের আনুগত্য করো।”
আপনি রাসুলের আনুগত্য করতে পারেন না যদি আপনি কর্তৃপক্ষের অবাধ্য হন। তখন আপনি আল্লাহরই অবাধ্য হচ্ছেন। এটি সম্পর্কের একটি বার্তা।
আমাদের দায়িত্ব হলো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সেতু গড়া। যাতে আমরা যে দেশে বাস করছি সেখানে শান্তি ও প্রশান্তির সঙ্গে থাকতে পারি।
সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী বলেছেন?
حب الاوطان من الايمان
“দেশকে ভালোবাসা ঈমানের অংশ।”
আপনি যদি আপনার দেশকে অপছন্দ করেন, তাহলে আপনি আপনার ঈমানকেই অপছন্দ করছেন। আপনি আপনার ঘরকে অপছন্দ করতে পারেন না। করলে আপনি গৃহহীন হয়ে যাবেন। একইভাবে আপনি যদি আপনার দেশকে অপছন্দ করেন, তাহলে আপনি নির্বাসিত হবেন। কারণ আপনি একজন ভালো নাগরিক নন। আমাদের দায়িত্ব সবসময় সেতু গড়া। আমাদের জানা উচিত আমাদের দেশগুলোতে বিভিন্ন সম্প্রদায় রয়েছে। এই সম্প্রদায়গুলো একসঙ্গে কাজ করে সমগ্র মানবতার কল্যাণের জন্য।
আমরা আমাদের সমাজ গড়তে চাই। আপনারা অনেকেই এখানে তার প্রতিনিধিত্ব করছেন। আপনারা সংযম ও আনুগত্যের কূটনীতিক হিসেবে কাজ করছেন। আল্লাহর প্রতি। রাসুলের প্রতি। এবং কর্তৃপক্ষের প্রতি।
এ কারণেই যখন আমরা কোনো ভুল দেখি এবং নীরব থাকি। চোখ ফিরিয়ে নিই। তখন এটি আমাদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দাঁড়াতে হবে। কথা বলতে হবে। ভালো আচরণের সঙ্গে। সম্মানের সঙ্গে। গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে। যাতে সবাই উপকৃত হয়।
এটাই আমাদের দায়িত্ব। এটাই আমাদের বার্তা। যা আমরা সারা বিশ্বে বহন করি।অনেকে ভাবেন তাদের কথা পৌঁছায় না। কিন্তু এমন ভাববেন না। আমরা আমাদের ব্যবস্থার দিকে তাকাই। এটি কীভাবে কাজ করে তা দেখি। আমি রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলছি না। আমি প্রাকৃতিক ব্যবস্থার কথা বলছি।
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىَ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৯১
“যারা দাঁড়িয়ে বসে শুয়ে সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। তারা বলে, হে আমাদের রব। আপনি এগুলো অকারণে সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র। আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।”
যারা প্রতিটি মুহূর্তে তাদের রবকে স্মরণ করে তারা সেই হৃদয়ের মতো যা প্রতিটি মুহূর্তে রক্ত সঞ্চালন করে। হৃদয় থেমে গেলে মানুষ মারা যায়। তেমনি আত্মা যদি তার রবকে স্মরণ করা ও চিন্তা করা বন্ধ করে দেয়। তাহলে আত্মা মারা যায়।
আল্লাহ চান আমরা তাঁকে স্মরণ করি। দাঁড়িয়ে স্মরণ করা মানে কাজে যাওয়া। বসে স্মরণ করা মানে কাজের জায়গায় বা পরিবারের সঙ্গে থাকা। শুয়ে স্মরণ করা মানে ঘুমানো। সব অবস্থায় আমাদের রবকে স্মরণ করতে হবে।
আল্লাহ বলেন আমাকে প্রতিটি মুহূর্তে স্মরণ করো। এরপর আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করো। বলো, “হে আমার রব। এটা কী! এটি কল্পনার বাইরে!”
“হে আমাদের রব, আমাদের এই অন্ধকার থেকে উদ্ধার করুন। আমাদের আপনার ভালোবাসার দিকে নিয়ে যান। আপনি পবিত্র। আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।”
আল্লাহ আমাদেরকে মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তা করতে বলেছেন। গ্যালাক্সি ও তারকার তুলনায় আমরা কত ক্ষুদ্র! আমরা যদি কেবল দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটি, আমরা তুচ্ছ। কিন্তু, যদি আখিরাতের আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটি, তাহলে, আমরা মহান।
পৃথিবীর দিকে তাকান। আমি মাইনাস তাপমাত্রা এবং এক মিটার বরফ থেকে এসেছি। আবার এখানে তেতাল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রা। দক্ষিণ আর্জেন্টিনায় অ্যান্টার্কটিকায় আরও বেশি বরফ। কে এগুলো করেছে? কে এগুলো ধরে রেখেছে?
আল্লাহ মানুষকে চিন্তার জন্য বুদ্ধি দিয়েছেন । ভালোবাসার জন্য হৃদয়। কে এটি সৃষ্টি করেছেন?
একটি গাড়ির জ্বালানি লাগে। আলো জ্বালাতে বিদ্যুৎ লাগে। পৃথিবী কোন জ্বালানিতে ঘুরছে! কে এটি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ঘুরিয়ে রেখেছে!
পৃথিবী ঘুরছে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে। কে ঘুরাচ্ছে? চাঁদ কেন নিজের অক্ষে ঘুরছে না? কেন সে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে! সূর্য কেন স্থির? বিজ্ঞানীরাও এর উত্তর দিতে পারেন না।
পৃথিবীর ঘূর্ণনে দিন ও রাত হয়। চাঁদের কারণে মাসের সৃষ্টি করে। সূর্যের চারদিকে পৃথিবী ও চাঁদ মিলে বছর সৃষ্টি করে। কে এই ব্যবস্থা তৈরি করেছে?
আজ কেউ কিছু আবিষ্কার করলে নোবেল পুরস্কার পায়। আল্লাহর কোনো পুরস্কারের প্রয়োজন নেই। তিনি নিদর্শন দেখান যেন আমরা তাঁকে বিশ্বাস করি। তাঁকে গ্রহণ করি। তাঁকে ভালোবাসি।
গতি গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু চলমান। দুনিয়ায় এমন কিছু নেই যা চলমান নয়। সবকিছু ফিরে যায় তার মূলের দিকে। সবকিছু উপাদান দিয়ে তৈরি। পরমাণু দিয়ে তৈরি। পরমাণুর ভেতর ইলেকট্রন ঘুরছে।
পরমাণু ভর ও শক্তির সমন্বয়। মানুষও তাই। দেহ ও আত্মার সমন্বয়। একটি বাদ পড়লে অন্যটি পড়ে যায়।
এ কারণেই আল্লাহ তাঁর নবীর জবানিতে বলেন,
ما وسعني أرضي ولا سمائي ولكن وسعني قلب عبدي المؤمن
“আমার জমিন ও আকাশ আমাকে ধারণ করতে পারেনি। কিন্তু আমার মুমিন বান্দার হৃদয় আমাকে ধারণ করেছে।”
এ কারণেই মক্কায় কাবার তাওয়াফ ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে হয়। যেমন চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। আপনি আপনার রবের ঘরের চারদিকে ঘোরেন।
আপনি যদি আপনার দেহকে আল্লাহর ঘরের চারদিকে ঘোরান, যা আপনার হৃদয়। তাহলে আপনি সেই আয়াতের সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। যারা দাঁড়িয়ে বসে শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে। তারা তাঁর ভালোবাসা ও রহমত কামনা করে।
হে মুমিনগণ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন। সবচেয়ে সুন্দর সময় ছিল যখন আল্লাহ আমাকে ডাকলেন। হে আমার বান্দা।
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন,
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১
“বলুন। যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো। তবে আমাকে অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন। তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।”
এর অর্থ হলো-”দাসত্বে আমাকে অনুসরণ করো। সর্বদা সচল থাকো। উদাসীন হয়ে বসে থেকো না। মানুষের উপকার করার চেষ্টা করো। গৃহহীনদের দিকে তাকাও। অসুস্থদের সাহায্য করো। দাতব্য কাজে যুক্ত হও। মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ো না।“
এটাই আমাদের থেকে চাওয়া হয়েছে। এ কারণেই আন্তরিক ও সৎ মানুষরা সর্বদা এই ধ্যানেই থাকেন। তারা দেখেন কোথায় সাহায্য করা যায়। তারপর তারা সাহায্য করেন।
একবার আমি সিঙ্গাপুর যাচ্ছিলাম। হঠাৎ যেদিন আমি রওনা হচ্ছিলাম, সেদিন হল্যান্ড থেকে একজন ডাক্তার আমাকে ফোন করে বললেন, "আমাদের গুরু আপনার সাথে দেখা করতে চান। আপনার আসার জন্য আমরা টিকেট পাঠিয়ে দেব।" আমি বললাম, "আমি দুঃখিত কারণ আমি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে সিঙ্গাপুর যাচ্ছি।" তারা বললেন, "চিন্তা করবেন না আমরা আপনার টিকেট কিনে দেব। আপনি হল্যান্ডে আসুন এবং সেখান থেকে আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে গন্তব্যে যাবেন।"
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আমি কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি?" তারা বললেন, "মহর্ষি মহেশ যোগী, যিনি উচ্চবিত্ত ও সমাজে অত্যন্ত বিখ্যাত।" তাই আমি বললাম, "ঠিক আছে আমি আসব।"
আমি আমস্টারডাম বিমানবন্দরে পৌঁছালাম। আমস্টারডাম থেকে তার জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি বিশেষ বিমান সেখানে অপেক্ষা করছিল। সেই এলাকার সবকিছু কাঠ দিয়ে তৈরি ছিল এবং গাড়িগুলো সৌরশক্তিতে চলত। আমি সেখানে প্রবেশ করলাম এবং আমরা বিশ্রাম নিলাম। সন্ধ্যায় তারা আমাকে বৈঠকের জন্য ডাকল। আমি বসে ছিলাম। তিনি এলেন। আমাদের মাঝখানে একটি টেবিল ছিল। আমাদের জন্য যেসব পেয়ালা দেওয়া হয়েছিল সেগুলো সব রূপার তৈরি ছিল। অন্যদিকে তিনি তার লোকদের সাথে যেখানে বসেছিলেন সেখানকার সব পেয়ালা ছিল সোনার তৈরি। তিনি সত্যিই একজন শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তি ছিলেন এবং তিনি সাত বা আটজন লোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁর অনুসারীরা ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, যা আমাকে অবাক করেছিল।
তার পাশে একজন বৃদ্ধ লোক বসেছিলেন এবং তিনি তাকে কথা বলতে বললেন। তিনি যা বলেছিলেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বললেন, "ও শেখ! আমি একজন ডাক্তার এবং আমি দিনে দুই থেকে চারশ রোগী দেখি। ভারতে যখন আমি আমার ডাক্তারি পড়াশোনা শেষ করি তখন আমার বয়স ছিল পঁচিশ বছর। পড়াশোনা শেষ করার পর আমি নিজেকে বললাম, আমি মিশরে ছুটিতে যেতে চাই।" আমি কৌতুহলী হয়ে পড়লাম তিনি কীভাবে প্রতিদিন দুই থেকে চারশ রোগী দেখতে পারেন? আমেরিকায় যদি আপনি দিনে চল্লিশ জন রোগীর বেশি দেখেন তবে বীমা কোম্পানি আপনাকে কিছুই দেবে না কারণ একজন ডাক্তারের পক্ষে এত রোগী দেখা সম্ভব নয়। তাই, তিনি কী বলেন তা শোনার জন্য আমি আগ্রহী ছিলাম।
তিনি বলতে থাকলেন, "আমি মিশরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম এবং বিভিন্ন দরগাহ বা খানকাহ জিয়ারত করলাম যেখানে একজন ধর্মপ্রাণ শেখ থাকেন এবং মানুষ সেখানে বিনামূল্যে থাকতে ও খেতে পারে। আমি এক মাজার বা মসজিদ থেকে অন্যটিতে গেলাম যেখানে আমি নারী, শিশু এবং পুরুষদের দীর্ঘ লাইন দেখলাম। আমি ভাবলাম এই লাইনটি কিসের জন্য, তাই প্রথম মাজারে আমি পর্যবেক্ষণ করলাম তারা কী করছে।" সেই মাজারটি একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছিল। "আমি প্রথমটিতে গেলাম এবং সত্তর বছর বয়সী একজন চমৎকার বৃদ্ধ মানুষকে দেখলাম। সবাই তার কাছে আসছিল, তিনি তাদের জন্য দোয়া করছিলেন এবং কিছু একটা পাঠ করতে বলছিলেন যা তারা করছিল। তিনি দিনভর এবং রাতের কিছু অংশজুড়ে এটাই করছিলেন। পরদিন তিনি কী করছেন তা দেখার জন্য আমি আবার এলাম এবং একই দৃশ্য দেখলাম। আমি অন্য একটি মাজারে গেলাম এবং সেখানেও একই জিনিস দেখলাম, কিন্তু সেখানে অন্য একজন শেখ ছিলেন। আমি শেখকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এসব কী, আপনি কি আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন?' তিনি বললেন, 'এই লোকগুলো অসুস্থ, তারা প্রতিকার চাইছে। আমরা তাদের কিছু পাঠ করতে দিই এবং পানিতে ফুঁ দিই ফলে সেই পানি বরকতময় হয়ে যায়। এগুলো আমাদের প্রভুর নিরানব্বইটি পবিত্র নাম থেকে নেওয়া। এরপর মানুষ সুস্থ হয়ে ওঠে।'"
আমি বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি এই লোকগুলোর দিকে তাকালাম এবং বুঝলাম তারা অসুস্থ। এই ব্যক্তি ডাক্তার নন এবং তিনি তাদের 'ইয়া হালিম, ইয়া হাফিজ' পাঠ করতে বলছেন আর তারা সুস্থ হয়ে যাচ্ছে! তিনি কেমন ডাক্তার? তখন আমি বুঝতে পারলাম তিনি একজন আধ্যাত্মিক ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি, তাই তিনি যদি চান তবে মহান প্রভু তার ডাকে সাড়া দেবেন। তারপর আমি এদের একজনের কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম, "ভারতে আমাদের অনেক অসুস্থ মানুষ আছে, তাই আমাকে এটি শেখান এবং আমি তাদের সুস্থ করব।" তিনি বললেন, "আপনি একজন খাঁটি মানুষ, তাই আমার পরে বলুন, 'আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসুলুল্লাহ।' এখন আমি আপনাকে এই গোপন রহস্যগুলো দিতে পারি।"
"আমি ভারতে ফিরে গেলাম এবং রোগী দেখা শুরু করলাম। আমার বয়স যখন ছাব্বিশ বছর তখন থেকে আমি প্রতিদিন দুই থেকে চারশ রোগী দেখছি এবং তাদের আশি শতাংশই সুস্থ হয়ে যায়।"
এখন মহর্ষি বললেন, "আমরা চাই আপনি আমাদের শেখান কীভাবে বাকি বিশ শতাংশকে সুস্থ করা যায়।" আমি বললাম, "আমি?" তিনি বললেন, "হ্যাঁ। আমরা পুরো ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখেছি।" এটি ১৯৯৮ বা ১৯৯৭ সালের ঘটনা। "আমরা জানতে পেরেছি মাওলানা শেখ মুহাম্মদ নাজিম আল হাক্কানি নামে একজন আছেন এবং তিনি এর জন্য খুব বিখ্যাত। যেহেতু আমরা তার কাছে পৌঁছাতে পারছি না, আমরা জানি আপনি তার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং আমরা আপনার কাছে পৌঁছাতে পারব।" তারপর তারা ফ্রান্সের একটি বড় হাসপাতালে গবেষণার মাধ্যমে পাওয়া পরিসংখ্যান দেখাল। তারা ফরাসি এবং ডাচ ডাক্তারদের গবেষণাটি পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এবং তারা রোগীদের মন্ত্রপূত বা পড়া পানি দিয়েছিল। কয়েক সপ্তাহ পর তাদের ষাট থেকে সত্তর শতাংশ সুস্থ হয়ে উঠেছিল এবং তারা আমাদের সেই ফলাফলগুলো দেখাল।
মহর্ষি মহেশ যোগীর সাথে আরও অনেক ঘটনা ঘটেছিল যা ব্যক্তিগত, কিন্তু আমি এই গল্পটি বলছি এটা দেখানোর জন্য যে খোদাভীতি এবং আন্তরিকতা অলৌকিক কাজ করতে পারে! আপনারা ধার্মিক এবং আন্তরিক হোন। আপনার দেশ, আপনার জনগণ এবং আপনার প্রভুকে ভালোবাসুন, তাহলে আপনি সফল হবেন এবং বিশ্ব আপনার বার্তা শুনবে।
আমি দূরপ্রাচ্যের একটি দেশে রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করেছিলাম এবং তিনি অত্যন্ত বিনয়ী একজন মানুষ। আমি তাকে ভালোবাসি। তিনি বলেছিলেন, "আমার সমালোচনা করুন।" আমি বললাম, "আমি হয়তো নিরাপদ থাকব না!" তিনি বললেন, "চিন্তা করবেন না।" আমি বললাম, "উদ্ধত বা অহংকারী হবেন না। যিনি আপনাকে এই চেয়ার বা ক্ষমতা দিয়েছেন তিনি আবারও তা আপনাকে দিতে পারেন।" এরপর তিনি দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার মানুষের সামনে গেলেন, এবং স্বয়ং রাষ্ট্রপতি জনসমক্ষে বললেন, যা টিভি স্টেশনগুলোর মাধ্যমে পুরো দেশে প্রচার করা হলো, "শেখ হিশাম এবং তাঁর শিক্ষক আমারও শিক্ষক, এবং তিনি আমাকে যা উপদেশ দেন আমি তা মেনে চলি।" কে এমন কথা বলতে পারে? তিনি নিজেকে অনেক বিনয়ী করেছিলেন। দ্বিতীয় নির্বাচনের পর তিনি আবারও জয়ী হন।
ও ভাই ও বোনেরা! সমস্ত রাসূল এবং সমস্ত নবী আমাদের বিনয়ী করতে এসেছিলেন। যখন আমরা বিনয়ী হই তখন আমরা রাগান্বিত, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা বিষাদগ্রস্ত হই না, বরং আমরা আত্মসমর্পণের মহাসাগরে মাছের মতো হয়ে যাই; আমরা সুখী থাকি! যখন আপনি মহাসাগর থেকে বেরিয়ে আসতে চান, তখন এটি পানি থেকে মাছের লাফিয়ে ওঠার মতো হয়। তাই বিনয় সবকিছু সম্ভব করে তোলে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন, আমাদের সাহায্য করুন এবং আমাদের হৃদয়ে তাঁর প্রতি ভালোবাসা দান করুন! আমি এখানে মাননীয় রাষ্ট্রদূত এবং এই দেশের সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করছি। আমরা আশা করি অন্য কোনো সময়ে অতিথি হিসেবে আবার আপনাদের সাথে দেখা হবে এবং আমরা একে অপরের সাথে সুখ ও শান্তিতে মিলিত হব। আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
