সিজন টু, এপিসোড ২০২৬

ছবি: Freerange Stock 

আমরা অজানাকে ভয় পাই, তবুও তাকে বুকে জড়িয়ে ধরি, নবজাত শিশুকে শিখাতে থাকি, কিভাবে এই নীল গ্রহটায় টিকে থাকতে হয়। সে বলতে গেলে সারাটা দিন কেবল ঘুমিয়েই থাকে, চোখ খুললেই কেঁদে ওঠে, আর সামান্য একটু আদর, একটুখানি মনোযোগ পেলে সে হেসে ওঠে, বেহেশত এসে তখন দুনিয়ার বুকে ধরা দেয়, আমরা ছবি তোলার জন্য ব্যস্ত হয়ে যাই। প্রথম দিন থেকেই সে আসলে আমাদেরকে মনে করিয়ে দিতে থাকে, পৃথিবীটা মূলত কান্না ঝরানোর জায়গা। যদি তুমি কাঁদতে না চাও, তাহলে একে অপরকে ভালবেসো, আদর কোরো, একটু মনোযোগ দিও, নিজের ক্ষুধা তৃষ্ণা আর অন্য সব চাহিদা কমিয়ে ফেলো। কে কোথায় কেন বিখ্যাত, কোথায় কি হচ্ছে, কেমনটা হওয়া উচিৎ ছিল, এসব নিয়ে বেশি ভেবে নিজেকে ভারাক্রান্ত কোরো না, লোভ লালসা থেকে যতোটা পারো ঘুমিয়ে নিও, আর কারণে অকারণে হাসতে থেক। এই দুনিয়ায় এমন কেউ নেই যাকে হাসলে সুন্দর লাগে না। 

মানুষ যেমন সঙ্গ চায়, পাপ আর পুণ্যও ঠিক সেরকম। একটা পাপ তার পরবর্তী পাপকে ডেকে বলে, 'জলদি আস, এতো দেরি কেন?' তবে একটা পুণ্য আরো দশটা পুণ্যকে হাত ধরে জোর করে টেনে নিয়ে আসে। যার সেটা দেখবার মতো চোখ আছে, সে তাকিয়ে দেখে, তাদের সাজসজ্জা কি অদ্ভুত সুন্দর, এক একজনের রং, রূপ, সুরভি, সুর, স্বাদ, এক এক রকম। ওই ছোট্ট শিশুটা যেমন হাঁটা শেখার সময় বারবার পড়ে যেতে থাকে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও তেমনি পাপের ভেতরে পড়ে যেতেই পারে। রাস্তায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে গর্তটা আসলে ঠিক কোথায়, সেটা যেমন দেখা যায় না, তার ওই পাপটাও সেরকম, অনিচ্ছাকৃত। তাই তাকে গাল মন্দ করবার কিছু নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত সে শিখে নেয়, কিভাবে পরের বার সেই পাপটাকে এড়িয়ে পথ চলা যায়। সেই মানুষটাকে অন্য কোথাও খুঁজতে যেও না, সে থাকে তোমার আয়নায়। এখানে কেউ নিখুঁত নয়, কেউ ১০০% ইবলিসও নয়। দোষ গুণ সব মিলিয়ে আমরা আমরাই, প্রত্যেকের বাতি-ই অভিনব, অথচ সবার আলো হূবহূ এক।

বাইসাইকেলটা আসলে নিজেই নিজেকে চালায়, তবুও সে চায় আমরা যাতে তাকে আদর করে তার হ্যান্ডেলটাকে দু'হাতে শক্ত করে ধরে থাকি। খুব বেশি বামেও না, খুব বেশি ডানেও নয়, চোখ থাকবে নাক বরাবর, পা থাকবে প্যাডেলে। তখন সাইকেল সোজা সামনের দিকে এগুতে থাকে, যতক্ষণ না সে তার গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে। আর যদি ডানে বামে মোড় নিতেই হয়, বেশি তাড়াহুড়ো কোরো না কিন্তু, চাকাটা বেকায়দায় ঘুরে গেলে তুমি পড়ে যাবে, আর সাইকেলটাও পড়ে যাবে তোমার সাথে সাথে। তাতেও কোন অসুবিধে নেই, আমরা আবার উঠে দাঁড়াই। আশেপাশে পরিচিত কেউ কি দেখে ফেলল? দেখলে দেখুক। যেই জখম তোমাকে জানে মেরে ফেলে না সে তোমার মনের শক্তি বাড়িয়ে দেয়। গায়ের ধূলো ঝেড়ে, ক্রিং ক্রিং বেল বাজিয়ে আবার আমরা নতুন করে চলতে শুরু করি এই পথে।

নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, হুলু, এসব থেকে আমরা এক নতুন সংস্কৃতির মাঝে এসে পড়েছি। এখানে নেশার মতো মানুষ পরপর বারো তেরোটা এপিসোড দেখতে থাকে, পুরো একটা সিজন একবারে শেষ করে ফেলে। সেটার একটা নামও আছে, বিঞ্জ অয়াচিং, অনিয়ন্ত্রিত ভাবে সব কাজ ফেলে দিয়ে স্ক্রিনের সাথে আঠার মতো লেগে থাকা। চলতি সিজনের পর্বগুলো যার ভালো লাগছে, সে কি হাঁপিয়ে ওঠে, না কি গরম চা, চানাচুর মাখা নিয়ে, বাতি কমিয়ে বসে যায়, ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দেয়, দয়া করে কেউ বিরক্ত করবেন না, আগামী দেড় দিন আমাকে পাওয়া যাবে না, আমি এখন লাগাতার সিজন টু দেখা শুরু করছি। 

এই জীবনটা তো কোন চাকরি নয় যে আমরা চাইলেই অব্যাহতি দেবো, সেরকম কোন বিকল্প পথ এখানে নেই। এই রেললাইনে কোন স্টেশন নেই, এই হাইওয়েতে কোন এক্সিট নেই, যেখানে লেখা আছে, "হ্যা, আপনি এখানেই আপনার পথটাকে একবারে শেষ করে দিতে পারবেন"। না, ভালবাসা জানেই না কিভাবে থামতে হয়, তার আলো এতটাই উজ্জ্বল, তাকে কোনভাবেই দমিয়ে দেয়া যায় না। আর যদি তুমি মনে করো চোখ দু’টো বন্ধ করার সাথে সাথে জীবনের বহতা নদী একেবারে শেষ হয়ে গেলো, তাহলে আরেক বার চিন্তা করে দেখো। মৃত্যু আর কিছুই নয়, জীবন নামের এই সিরিয়ালের পরবর্তী সিজনের প্রথম এপিসোড মাত্র।

সব্বাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা, আদর, দোওয়া, আর অনেক অনেক ভালবাসা। আমি যেন সভ্য হতে পারি, যাতে মানুষ হয়ে উঠতে শিখি, অনেক ভালো একটা মানুষ, সে যেন কোন একদিন পুণ্যের সেবাদাস হতে পারে, দূরে কোথায়, দূরে দূরে…
সিজন টু, এপিসোড ‘২০২৬’ 
~ জেহান আলী
নবীনতর পূর্বতন